মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
চলে গেলেন আমার প্রিয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোঃ গোলাম মোস্তফা কামাল স্যার [সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজী), বিশ্বম্ভরপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়]। আজ বাদ জুমা হাজারো জনতার অশ্রম্নজলে সিক্ত করে চির বিদায় জানিয়ে রেখে এলাম তার বাড়ির পাশেই সাড়ে তিন হাতের মাটির ঘরে। আমার মনে হয় না সেখানে থাকতে তাঁর কোন অসুবিধা হবে। কেননা প্রায় ৬০ বছরের জীবনে তিনি কোনো অট্টালিকার স্বপ্ন দেখেন নি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। আদর্শিক রাজনীতিও করতেন। দলের সুদিনে দুর্দিনে দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতিকে ব্যবসা বানাননি কখনোই। বাইসাইকেলে চড়ে সারা উপজেলা চষে বেড়িয়েছেন আজীবন। কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা। ক্লান্তি দেখিনি কোনোদিন। যৌবনের শুরুতে অবৈতনিক শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছেন রতারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ সময়ই আমি উনার ছাত্র। ছাত্রদের কী ভাবে ভালোবাসতে হয় স্যারের কাছ থেকেই শেখা। আমাদের সময়তো স্কুল মানেই কড়া শাসন। বাঁশের কঞ্চি বা জালি বেত। কিন্তু মোস্তফা স্যার বেত দিতে গেলে যেন ব্যাথাটা আগে তিনি নিজেই পেতেন। ইউনিয়ন পরিষদ সচিব পদে চাকুরি পেয়েছিলেন। দু’মাস কাজও করে ছিলেন। কিন্তু শিক্ষকতা যার রক্তে মজ্জাগত তিনি কী আর কোথাও থিতু হতে পারেন! ফিরে এলেন শিক্ষকতায়।
সারা জীবন সততা, কর্মনিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা আর সময়ানুবর্তিতার এক নজিরবিহীন ইতিহাস রেখে গেছেন তিনি। আজ স্মৃতি চারণে তার সহকর্মীগণ ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের বক্তব্যে সেটিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দেশপ্রেমটা ছিলো তার মজ্জাগত। হবেইবা না কেন? তার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলী ছিলেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার। দেশপ্রেমিক পিতার সুযোগ্য সন্তান ছিলেন তিনি। সংগীতানুরাগীও ছিলেন যথেষ্ট। কোথাও সুযোগ হলেই গেয়ে উঠতেন –
‘ছোটদের বড়দের সকলের
গরিবের নিঃস্বের ফকিরের
আমার এ দেশ সব মানুষের, সব মানুষের।।
নেই ভেদাভেদ হেথা চাষা আর চামারে,
নেই ভেদাভেদ হেথা কুলি আর কামারে।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, দেশ মাতা এক সকলের।’
দু’বছর আগে একটা প্রশিক্ষণে স্যারকে পেয়েছিলাম প্রশিক্ষণার্থী হিসাবে। এ বয়সেও তাঁর নিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা, স্বতঃস্ফূর্ততা যা দেখেছি অতুলনীয়। স্যার আমার কাজের প্রশংসা করেছিলেন। সাথী সহকর্মীগণে নিকট গর্ব প্রকাশ করে ছিলেন। আমাকে দোয়া করেছিলেন। বাসায় এসেছিলেন আমার সন্তানদের দোয়া করতে।
সুন্দর ব্যবহার এর অপূর্ব উপমা বলা যায় আমার গোলাম মোস্তফা স্যারকে। সব সময় একটা মৃদু হাসি লেগে থাকতো ঠুটের কোনায়। যার জুড়ি মেলা ভার। মৃত্যু শয্যাশায়ী তথাপি সেই মুচকি হাসি টুকু বিসর্জন দেননি। ক’দিন আগে স্যারের অসুস্থতার খবরে দেখতে গেলাম। সাথে ছিলেন উনার আরেক ছাত্র ও রাজনৈতিক সহযাত্রী আব্দুল কুদ্দুছ মাস্টার। কথা বলা নিষেধ। কথা বলতে কষ্টও হচ্ছিল উনার। কিন্তু তিনি তার অবস্থাটা বললেন। কিভাবে কি হলো তাও বললেন। বললেন, তোমাদের কাছে না বলে তো পারি না। আজ না হয় কাল তো আমাদের যেতে হবেই।’ তিনি বললেন, ‘আমার আল্লাহর উপর পুরোপুরি বিশ্বাস আছে। তিনি চাইলে আরোগ্য দান করতে পারেন।’ সে জন্য তিনি স্বল্প ব্যয়ের একটি চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছিলেন। মূলত খুব আত্মমর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার সীমিত সামর্থ্যের বাইরে কারো করূণা প্রত্যাশা করেননি জীবনের শেষ সায়ান্নেও। কষ্ট হয় সমাজের অজস্র জনের চিন্তায় যার কেটেছে প্রতিটি ক্ষণ, তার প্রতিদানে আমরা কি দায়িত্ব পালন করলাম? আজ জানাজার পূর্বক্ষণে সবাই উনার মোহনীয় ব্যাক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন। শুনেছি সুন্দর ব্যবহার মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী হবে। ইমাম সাহেব বলেছেন, হাদিস শরিফে আছে- কেও যদি একদিন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কষ্ট করে তাহলে তার দশ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এভাবে তার জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবার পর জান্নাতি হিসাবে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ ছাড়া মহামারী সহ আরও কিছু রোগব্যাধি আছে যে সমস্ত রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে মাইয়াত শহিদী মর্যাদা লাভ করে। আমার পরম প্রিয় শিক্ষক দীর্ঘদিন রোগাক্রান্ত হয়ে কষ্ট করেছেন। মাহে রামাদানের দ্বিতীয় দশক মাগফেরাতের প্রথম দিনে তিনি মাবুদে আলার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। দয়াময় আল্লাহ যেন উনাকে শহিদী দরওয়াজা দান করেন। মাগফিরাত নসিব করেন। রহমতে চাদরে আবৃত করে জান্নাতে সু-উচ্চ মাকাম প্রদান করেন এই ফরিয়াদ করি। একই সাথে তার পরিজনদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। আল্লাহ তাদের সবরে জামিল দান করুন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।


