একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে

বছর শেষ হওয়ার এক দিন আগেই বহুল প্রত্যাশিত সুখবরটি মিলল। সুনামগঞ্জের উন্নয়নের রূপকার সজ্জন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের হাত ধরেই এই খবরটি সুনামগঞ্জবাসীকে আনন্দে উদ্বেলিত করল। ২০১৯ সনের ৩০ ডিসেম্বর তারিখটি হাওর-ভাটির সুনামগঞ্জবাসীর জন্য অনন্যসাধারণ একটি দিন হয়ে থাকবে। এই দিনই যে সুনামগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করল। মন্ত্রীপরিষদ সভায় সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের খসড়া অনুমোদন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী ধাপ হলো, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়ে খসড়া আইনটি একটি স্বতন্ত্র আইনে পরিণত হওয়া। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, তিনি সংসদের আগামী অধিবেশনেই আইনটি উত্থাপনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন। অভিনন্দন প্রধানমন্ত্রী, অভিনন্দন পরিকল্পনামন্ত্রী, অভিনন্দন শিক্ষামন্ত্রী।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের অবস্থান ৬৪ জেলার মধ্যে একেবারে নীচের দিকে। তাই এই জেলার শিক্ষার উন্নয়নকল্পে বিশেষ কিছু উদ্যোগ অত্যাবশকীয় হয়ে পড়েছিল। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করা হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে এটি পূর্ণতা পেল। এলাকা বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা দানই করে না বরং নতুন নতুন জ্ঞান তৈরি করে। হাওর, লোকশিল্প, ধান, মাছ আর বৈচিত্রময় সংস্কৃতির কারণে হাওরাঞ্চল অনন্য বৈশিষ্টম-িত। হাওরাঞ্চলের ঐশ্বর্যের অনেক কিছুই এখনও অবিকশিত, অজানা, অপাঙক্তেয়। এই অঞ্চল নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা আর বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্র অনেক। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের শুরুতেই অনেকে এ নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা শুরু করেছেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরেই লোক-গবেষক সুমনকুমার দাশ তাঁর মন্তব্য প্রতিবেদনে হাওরের ঐশ্বর্যম-িত লোকশিল্প ও হাওর নিয়ে নতুন নতুন বিভাগ খোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই আগ্রহগুলো সুনামগঞ্জ তথা হাওর এলাকার উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা-চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ। এইসব মতামত অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য।
দেশ বা অঞ্চলের সত্যিকার বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে তার বিকাশে ভূমিকা রাখাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দায়িত্ব। গতানুগতিক শিক্ষা দান করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয়। তাই শুরু থেকেই সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি যাতে সঠিক পথে ধাবিত হয় তাও সুনিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করব, শিক্ষার ক্ষেত্রে যাঁরা চিন্তক তাঁরা নিশ্চয়ই নিজেদের ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে এর ভিত্তি মজবুত করতে উপযুক্ত ভূমিকা রাখবেন। হাওরাঞ্চল অফুরন্ত সম্ভাবনার খনি। হাওরের যত সামর্থ্য তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। এই বিশাল সম্ভাবনাময় জায়গাটির সদ্ব্যবহারে নতুন প্রযুক্তি, নতুন কৌশল, নতুন চিন্তা, নতুন জ্ঞানের বিশেষ প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। আর এরকম কাজের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে উঠতে পারে অনেকের মধ্যে বিশেষ একটি। আমরা চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরু থেকেই সকলকে পথ দেখানো শুরু করুক।
অনেকেই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কিছু অগ্রাধিকার সংরক্ষণের। এই বিষয়টিও বিবেচনাযোগ্য। সুনামগঞ্জে শিক্ষাক্ষেত্রে এখন যে করুণ অবস্থা বিরাজমান সেজন্য এই অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের জন্য, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত, প্রাধিকার না দিলে উত্তরণ ঘটানো অসম্ভব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল কলেজ ঘিরে জেলাবাসীর যে উচ্ছ্বাস তা সত্যি হয়ে উঠবে তখনই, যখন এইসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এলাকার প্রচুর ছেলে মেয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। আইনেই সেই ধরনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে যদি কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হয় জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত তা সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। এই কথা ধ্রুব সত্য। শিক্ষার বিস্তারে যেকোনো কাজ তাই মূলত জাতিকে সমৃদ্ধ করারই প্রয়াস। একজন এমএ মান্নান সুনামগঞ্জকে সমৃদ্ধ করতে যে শুভকর্মগুলো করে যাচ্ছেন সেগুলো তাঁকে অমরত্ব দান করবে। আমরা তাঁর চিরমঙ্গলময় মানসলোকের দীর্ঘজীবিতা কামনা করি।