অখিল তালুকদার
জামালগঞ্জ উপজেলার বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব ইউসুফ আল আজাদ গতকাল ৯ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকাল সাড়ে ১১ টায় সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার পর সকালে সিলেট বিমানবন্দরে নেওয়ার রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি….রাজিউন)। দীর্ঘ ৩২ বছর আমি তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে ছিলাম বলেই তাঁর সম্পর্কে আমার জানা তথ্য দিয়েই এই লেখা ।
প্রায় অর্ধশতাব্দীর জনপ্রতিনিধি ইউসুফ আল আজাদ জামালগঞ্জের মানুষের অন্তরের মানুষ ছিলেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ৬ জুন জামালগঞ্জ উপজেলার অদূরবর্তী কালিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ৫ ভাই ২ বোন। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুর রহমান সাহেব জামালগঞ্জের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাচনা বাজারে এক জনসভা করার পর জনাব রহমান সাহেবের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং পরদিন জনাব রহমান সাহেব তাঁর শাহজালাল নেভিগেশন কোম্পানীর লঞ্চযোগে বিভিন্ন স্থানে জনসভা করে করে ভৈরব পর্যন্ত নিজে বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর সাথে জনাব রহমান সাহেবের ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
বাল্যকালে জামালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করে জামালগঞ্জ হাইস্কুলে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর কুমিল্লা রেলওয়ে স্কুলে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ইউসুফ আল আজাদ পড়াশোনা করেন। কিন্তু বিত্তভৈববের মধ্যে জন্মগ্রহণ এবং তাঁর প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ সন্তান হওয়ায় অতি আদরের কারণে তিনি লেখাপড়ায় আর এগুতে পারেননি। সরলতা, নিঃস্বার্থ পরায়ণতা, বন্ধুবাৎসল্য, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধ, বিদ্যানুরাগ, বাউল মতাদর্শ তাকে এক উঁচু মাপের মানুষে পরিণত করেছিল। ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর পিতা স্বপরিবারে ভারতের বালাটে শরণার্থী হয়ে চলে যান। পিতার অনুমতি নিয়ে সেখান থেকেই জনাব ইউসুফ মহান মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কয়েক স্থানে পাক-বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করেন। এ কারণে সাচনা বাজারে তার পিতার বাসস্থান এবং কালিপুর গ্রামের বসতবাড়ি সে সময় পাক হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে বীরের বেশে নিজ বাড়িতে এসে প্রথম ইউপি নির্বাচনে সদস্য পদে নির্বাচন করে ফেল করলেও ১৯৭৭ সনের ইউপি নির্বাচনে প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান পদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর তার মৃত্যু পর্যন্ত একবার ইউপি ভাইস চেয়ারম্যান, পাঁচবার ইউপি চেয়ারম্যান এবং তিনবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে চার দশককাল জনপ্রতিনিধি হিসাবে মানুষের মাঝে বিচরণ করেছেন। তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সরলতার কারণে মানুষ তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন। নির্বাচনে ব্যয় করার জন্য তার নিজের অর্থসংস্থানের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তার পিতামহ হাজী কালাগাজী তালুকদার এবং তার বান্ধব সমাজ এই ব্যয় নির্বাহ করতেন। উল্লেখ্য, তাঁর পিতামহের জীবিতাবস্থায় তাঁর পিতার মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তাঁর পিতামহ সম্পত্তি থেকে তাঁকেও বঞ্চিত করেন নি। তার সরলতার জন্যও তিনি হাটে, মাঠে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের সাথে কথা বলতেন এবং মানুষের আবদার পূরণে কাউকে আশাহত করেননি।
তার পিতা জনাব আব্দুর রহমান সাহেব ১৯৬৭ সনে সাচনা বাজারে হাজী কালাগাজী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ফলাফলের দিক থেকে বর্তমানে জামালগঞ্জের শীর্ষস্থানীয়। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি তাঁর পিতার নামে আব্দুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যানুরাগী হওয়া সত্বেও তার দুই ছেলে দুই মেয়ে কাউকেই ভালো লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। কিন্তু জামালগঞ্জ কলেজ, জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য ভূমিকা ছিল। জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি দীর্ঘসময় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে মরহুম ইউসুফ আল আজাদ প্রথম জীবনে পিতার পদানুসরণ করলেও এরশাদ আমলে অভিমান করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদের চেষ্টায় তিনি অভিমান ভেঙ্গে আবার স্বস্থানে ফিরে আসেন এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি জামালগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চার বারের কমা-ার, একবার সুনামগঞ্জ জেলার ডেপুটি কমা-ার এবং ৩০ বছর সাচনা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ছিলেন।
ব্যক্তি জীবনের ধর্মাচরণে তিনি মারফতি তরিকার অনুসারী ছিলেন। তিনি বারহাট্টা উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের মরহুম পীরজাদা অধ্যাপক মঈনউদ্দিন চিশতী এর শিষ্য ছিলেন। বাউল মতে তার চরম আসক্তি ছিল। সে জন্য লালন, হাসন রাজা, দুরবিনশাহ, আব্দুল করিম ছিলেন তার পরম আদর্শ। তাদের মত অনুসরণ করে তিনি প্রায় ৫শ’র উপরে বাউল গান রচনা করে গেছেন। তাই জীবন নির্বাহে তিনি তার পিতার বিত্তবৈভব ধরে রাখতে পারেননি। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সব উজাড় করে দিয়েছেন। দীর্ঘ জীবন জনমানুষের প্রতিনিধি হয়ে মানুষ অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত- তিনি পিতা-পিতামহের দেওয়াটুকুও হারিয়েছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে যে সম্মানী ভাতা পেতেন তাই ছিল তার জীবন নির্বাহের একমাত্র উৎস এবং যখন তা থাকত না তখন সাচনা বাজারের ব্যবসায়ীমহল, বন্ধুমহল স্বপ্রণোদিত হয়ে তার জীবন নির্বাহের রসদ যোগাত। দেশে এরকম বিরল আর মহৎ চরিত্রের মানুষের দুর্ভিক্ষ চলছে। ইউসুফ যেন জামালগঞ্জের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস হয়ে হঠাৎ করেই তিরোহিত হলেন। তার আত্মার জান্নাতবাসী হওয়ার জন্য যার যার ধর্মমতে তার তার পরম ¯্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করার আবেদন জানাচ্ছি।
লেখক : প্রভাষক, জামালগঞ্জ সরকারি কলেজ।


