এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
১লা মে ১৯৭১ পিতা ও বোন হারানোর স্মৃতি
মূহুর্তের মধ্যে উঠানে কর্মরত লোকজন হুরোহুরি শুরু করে। নানাভাই সরওয়ার নানারাও লাফ দিয়ে উঠেন। আমি আব্বাকে তুলে দাঁড় করাতে চেষ্টা করি। কিন্তু না ততক্ষণে খাকি পোষাক পড়া প্রায় ছয় ফুট লম্বা অস্ত্র কাঁধে ৫/৬ জন লোক তাদের এই বাংলা ঘরে ঢুকে পড়ে। উর্দুতে প্রথম কথা বলে ”উসকা খালিক মিয়ার মোকাম হাঁ ? আব্বা দাঁড়ানো থেকে বসে পড়েন। নানা ভাই স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। আমি আব্বার পাশে উনাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। মানুষের দৌঁড়া দৌঁড়ি বন্ধ হয়ে যায়। আব্বাই প্রথম উত্তর দেন। বসতে বলেন। জিজ্ঞেস করেন ওরা কোথা থেকে এসেছে? বাঙালি কি না? কারণ এদের কেউ কেউ শ্যামলা কেউ কেউ ফর্সা। পাক আর্র্মির ড্রেস। তারা স্বীকার করে তারা বাঙালি। সবার প্রাণে পানি আসে। আব্বা তখন তাদের জানান এখানে সবাই খালিক মিয়ার মেহমান। তারা বাঙালি হয়েও উর্দুতে কথা বলছে কেন প্রশ্ন করেন। কোথা থেকে এসেছে? কেন এসেছে জানতে চান। তাদের একজন বলে তারাই পিআর এর সদস্য পালিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে এদিকে এসেছে। উর্দুতে কমান্ড শুনতে শুনতে তারা নাকি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এজন্য উর্দু কথা বলছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য চাাঁদা কালেকশনে বেড়িয়েছে। খালিক মিয়া ধনাঢ্য ব্যাক্তি তারা তার কাছে যুদ্ধের জন্য ত্রিশ হাজার টাকা চায়। আব্বা তখন তাদের বলেন যে, মাত্র মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়েছে। যুদ্ধের স্ট্যাটেজি এখনও ঠিক হয় নাই। চাঁদা তারা কার নির্দেশে তুলতে আসছে? এভাবে চাাঁদা তুল্লে দেশের মানুষ ক্ষেপে যাবে। মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। তারা ভুল কাজ করছে। তারাই পিআর জান বাঁচিয়ে যখন আসতে পেরেছে, তাহলে দেশের কাজে লাগা উচিত। তাদের কোথায় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং হবে তা ঠিক হওয়ার পর ওখানে গিয়ে যোগ দেয়া উচিৎ। তিনি বলেন মাত্র সেনাবাহিনী প্রধান যোগ দিয়েছেন তার নির্দেশে তাদেও চলা উচি। গ্রামে গ্রামে চাঁদা তুলে নয়। এ নিয়ে একটু তকর্ বিতর্ক ও হয়। নানা ভাই এদের হাতে অস্ত্র থাকায় আব্বাকে থামান। উনার কথা আমরা মেহমান বাড়ীর মালিকের সাথে তারা কথা বলুক। আর আব্বা বারবার বলতে থাকেন এভাবে তো চাঁদা তুললে জনগনের সাপোর্ট পাওয়া যাবে না। তারা একটু রাগ দেখায় আর বলে আমরা লঞ্চ নিয়ে এসেছি। খালিক মিয়াকে টাকাসহ লঞ্চে পাঠাইয়া দেন। উনার সঙ্গে আমরা আলাপ করবো। নানা ভাই জোর করেই আব্বাকে তুলে নিয়ে আসেন। তারা লঞ্চে চলে যায়। সারা বাড়ী জুড়ে নানান ধরনের গুজব চলতে থাকে। আব্বা ঘরে আসলে সব শুনে আম্মা রাগ করেন। এ সময় কেনো আব্বা এসব তর্ক করতে গেলেন। তার জন্য গজগজ করতে থাকেন। আব্বার এক কথা, ইপিআর এর এখানে কি কাজ? এরা সীমান্তে যাবে। এখানে আসছে কেনো ? তিনি নাকি সব বুঝিয়ে বলেছেন তারা বুঝেছে। ওরা আসে ১২টার দিকে। দুপুরে খাবে। লঞ্চে নাকি আরও কয়েকজন আছে। তাদের জন্য খাসী জবাই হয়। রান্নার তোড়জোড় চলে। বিকালে হেলেন নানা আর খালিক মিয়ার ভাই মুকিত নানা খাবার আর বিশ হাজার টাকা নিয়ে যান। খালিক মিয়া বাড়ী ছিলেন না। এ খবর পাওয়ার পর আর আসেন নাই। খাবার নিয়ে যাওয়ার পর তারা নাকি হেলেন নানাদের খুব বকাবকি করছে যে, বাড়ীর মালিক নিজে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করলো না! তাদেরকে ভাত খাওয়াচ্ছে না ঘাস খাওয়াচ্ছে? কিন্তু তারা খায় ঠিকই। আর টাকাটাও নেয় এবং খালিক মিয়ার এই অসভ্যতা তারা মেনে নিবে না জানিয়ে খেয়েদেয়ে বিকালে লঞ্চ ছেড়ে চলে যায়।
এদের চলে যাওয়ার খবর হেলেন নানাই নিয়ে আসেন। আর লঞ্চ ছাড়ার শব্দ আমরা সবাই শুনতে পাই। সবার জানে পানি আসে। আব্বার দু:শ্চিন্তা শেষ হয় না। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের নামে টাকা তুললে বদনাম হয়ে যাবে। বারবার এই কথাই বলতে থাকেন। লঞ্চ থেকে এসে হেলেন নানার বর্ননা এরা সবাই ইপিআর নয়। আধা পাকিস্তানীও আছে আর এরা কখনও মুক্তিযদ্ধের পক্ষের লোক না এরা ¯্রফে ডাকাত। যুদ্ধের সময়, অস্ত্র আছে তাই ডাকাতি করতে বেড়িয়েছে। তিনি খবর পেয়েছেন চরনারচরের জমিদার গোষ্ঠি এদের ভাড়া করেছে, খালিক মিয়াকে মারার জন্য। খালিক মিয়া গেলে আজকে শেষ হয়ে যেতো। ওরা চলে যাওয়াতে সবাই নিশ্চিন্ত। বিকালে কি একটা কাজ করতে গিয়ে আম্মার হাতের কাচের চুরি ভেঙ্গে যায়। আম্মা কতক্ষণ পরপর সফিনানীকে বলেন মঈজী আমার কয়েকটা চুড়ি দাও ভেঙ্গে গেছে। উনি এ কাজ ঐ কাজে ব্যস্ত থেকে আর চুরি আম্মাকে দেন নাই। আম্মা সারা জীবন এই চুরি ভাঙ্গার দু:খ নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। জানি এটা কুসংস্কার কিন্তু এই কুসংস্কার আমার মায়ের জীবনে সত্য হয়েছে।
দুপুরে এসব চিন্তায় কারও খাওয়া দাওয়া ভালো হয় নাই আমাদের দিকে তারা নজরও দিতে পারে নাই। রাত্রে তাদের পাকের ঘরে আমাদের ছোটদের খাওয়ার ডাক পড়ে। কদর নানা ভাইদের পাকের ঘর তাদের মূল ঘরের পিছনে এক উঠান পরে। মূল ঘর তিন ইঞ্চি ওয়াল দেয়া তিনটা রুম। বাইরে ছনের পাকের ঘর বেশ বড়। বাইরে চুলা। তারপরে লম্বা কয়েকটা রুম। একটায় তারা সবাই বসে খাওয়া দাওয়া করেন, পাটি বিছিয়ে। আব্বাকে ঘরে খাবার দেয়া হয়। তিনি নীচে বসে খেতে পারেন না। আম্মা আব্বার খাবার তদারকিতে ব্যস্ত। আমরা পাঁচ বোন জামশেদ মামা নাজমা খালাদের সাথে খেতে বসেছি। আমার বোন সিতারা কান্না জুড়ে দেয় সে খাবে না। সিতারাকে খাওয়ানো আর গোসল করানো ছিলো আম্মার সবচেয়ে ঝক্কিও কাজ। এর জন্য আম্মার হাতে মারও সে খেতো প্রায় প্রতিদিন। তার মূল সমস্যা সে কোন সব্জি খেতো না। আলু আর মাংস খেতো। আর খেতো দুধ ভাত। দুধ ভাত হলে তার আলু মাংস ও লাগতো না। তাদের বাড়ীতে দুধ-দৈ আছে। আম্মা তাদের বলে দুধ নিয়ে ওকে খাওয়াতেন। তারাও নিজ থেকে দিতেন। ঐ দিন সবাই অন্যমনষ্ক। শুধু খাওয়ার জন্য খাওয়া হচ্ছে। আম্মা খাওয়ার ঘরে আসেন নাই। তাই তার দুধের ব্যবস্থা হয় নাই। আমি আর আপা তাকে যা আছে তা খেতে বলি। সে খাবে না। গাইগুই করতে থাকে। আমাদের তাদের কাছে দুধ চাইতে প্রেস্টিজে লাগে। কারণ খাবার পরিবেশন করছেন জামশেদ মামাদের দাদী। আপা আমাকে ইশারা দেয়, না খেলে না খাক চাইবি না। আমারও রাগ উঠে, পরের বাড়ী আসছি যা দেবে তাই খাবো। এটা খাবো না ওটা খাবো না! আহ্লাদী! সিতারা আমাদের দিকে করুন চোখে তাকায়। তার জন্যে দুধের কথা বলার জন্য। আমরা নির্বিকার খেতে থাকি। জামশেদ মামারা কিছু বুঝতে পারে না। সে না খেয়ে কেঁদে কেঁদে চলে আসে। আম্মার কাছে এসে কাঁদে। আম্মা বলেন কি হয়েছে? আমি আর আপা এসে বলি, দুধ নাই দেখে সে খায় নাই আম্মাও রাগ করেন, পরের বাড়ীত এসেছি, এতো বড় মেয়ে বুঝে না! তারা যখন দুধ দেয় তখন তো খেতে পারিস। ঠিক আছে না খেলে না খাক। ঘুমা। রাত্রে না খেয়ে আমার বোনটা ঘুমিয়ে যায়। আমরা যে ঘরে থাকি সেখানে মিটসেফে ডেগচিতে দুধ রাখা। আম্মা আবেদীনকে ঘুমপাড়াতে পাড়াতে একবার বলেন, ঐখান থেকে একটু দুধ নিয়ে ওকে দিয়ে দে। আপা আর আমি বলি আম্মা মানুষের জিনিষ না কইয়া নিতাম? আম্মার আর কিছু বলার থাকে না। হেচকি তুলতে তুলতে আমার বোন ঘুমায়। আর বহু বছর আমার মা দুধ খান নাই। অসুখের সময় জোর করে খাওয়াতে গেলে চিৎকার করতেন।
রাত ২/৩ টার দিকে হেলেন নানা আসেন। আব্বাকে ঘুম থেকে তুলেন। এ বাসায় থাকার কারনে খালিক নানার বাসার কথাবার্তা আমরা জানতে পারি না। হেলেন নানা এসে বলেন, সবাই খুব ভয়ে আছে, এরা না আবার ফিরে আসে? উনার দুলাভাই বাড়ীতে আসেন নাই পুরুষ লোকদের বাড়ীতে রাখা হচ্ছে না। নানা ভাইকে তিনি পাশের বাড়ীতে রেখে আসছেন। নানা ভাই পাঠিয়েছেন আব্বাকে নিয়ে যেতে। আব্বা বলেন, ওরা চলে গেছে। আবার আসবে কেনো? টাকা চাইতে এসেছিলো টাকা তো নিয়ে গেছে। আর আমাকে মারবে কেনো ? হেলেন নানা বলেন, আপনি তো ওদের সঙ্গে তর্ক করেছেন তাই যদি আসে, আপনাকে নিয়ে ভয়। আব্বার সাফ কথা ওরা আসবে না। আর আসলেও বাচ্চা কাচ্চা রেখে তিনি যেতে পারবেন না। উনার বাচ্চাদের বিপদের মুখে রেখে যাওয়াতো প্রশ্নই আসে না। সকাল হলে এখান থেকে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা নিবেন। আম্মা আব্বাকে উনার সাথে যেতে জোর করেন। কিন্তু আব্বা আমাদের ফেলে যাবেন না। হেলেন নানা অনেকক্ষণ কথা বলে চলে যান। আমরা আবার ঘুমিয়ে যাই। ঘুম ভাঙ্গে আব্বার আতঙ্কিত ডাকে। আব্বা তাহাজ্জুদের নামাজ সবসময় পড়েন। গ্রাম দেশ ওজু পড়তে বাইরে যেতে হয়। ওজু পড়ার জন্য দরজা খুলে ওজু পড়তে বসতে গিযে দেখেন আর্মি বাড়ী ঘেরাও করে রাইফেল করে তাক করে আছে। তিনি দৌঁড়ে ঘরে ঢুকেন আর বলতে থাকেন, “শাহানার মা উঠো উঠো ওরা এসে গেছে। ”
আম্মা ধড় মরিয়ে উঠে আমাদেও তুলতে চেষ্টা করেন। আবেদীনকে কোলে নেন লাকী হাতে। সিতারা গভীর ঘুমে। তাকে টেনে তুলেন। সে যথারীতি বিছানা ভিজিয়েছে। উঠে সে মনে করে তার অপরাধ হয়ে গেছে। সে নিজেই জামাটা খুলে ফেলে। আমি দড়ি থেকে একটা জামা নিয়ে পড়িয়ে দিই। এর মাঝে এ ঘরের বাসিন্দারা কান্নাকাটি শুরু করে। জামশেদ মামার দাদা দাদী সফিনানী, উনাদের বাচ্চারা সবাই একযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। ততক্ষণে গুলি শুরু করে দিয়েছে। আব্বা ঘরে ঢুকার পর থেকেই এলাপাথারি গুলি তারা শুরু করে। বাইওে এসে চারিদিকের এতো গুলির মাঝে আমরা সবাই দিশেহারা হয়ে যাই। কে যে কোন দিকে দৌঁড় দিয়েছে কোন ঠিক থাকে না। জামাটা আমি পরানো শেষ করতে পারি না, সিতারা আমার হাত ছাড়িয়ে জানের তরাসে এক দৌঁড় দেয়। তার হাত আমার হাত থেকে ছুটে যায়। বাইরে এসে এতো গুলির মধ্যে প্রাণ ভয়ে সবাই দৌঁড়াতে থাকে। এদের এই গুলি বর্ষণে আম্মা দশভূজার মতো আমাদের হাত দিয়ে আগলাতে চেষ্টা করেন। আপা ও আমাকে ধাক্কা দিয়ে তাদের ছনের পাক ঘরে ঢুকান। আবেদীন কোলে, লাকী হাতে নিজেও পাক ঘওে ঢুকে যান। দেখি আম্মার খালা সফিনানীও তার বাচ্চাদেও নিয়ে এই পাক ঘরে ঢুকছেন। পাকের ঘরের দরজা টেনে কাঁপতে থাকে সবাই। চারিদিকে গুলি বৃষ্টি হতে থাকে। যেমন শব্দ তেমন বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো গুলি বৃষ্টি। আম্মা আপাকে নিয়ে টেনশন করতে থাকেন আর বারবার উড়না দিয়ে মুখ ঢাকতে বলেন। গুলি বৃষ্টির মাঝে আমি আম্মা আব্বা কৈ বলে চিৎকার করছি। আর কি করছিলাম মনে নাই। শুধু বিকট শব্দ আর আগুনের ফুলকির মাঝে আমরা কাঁপতে থাকি। কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না যায়, তার জন্য কে যেনো মুখ চাপ দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নাই। একজন হানাদার টর্চ মারে। পাকের ঘরের জানালায়, আর বলতে থাকে নিকাল যাও। নিকাল যাও। তারপর জানালা দিয়ে রাইফেল তাক করে। সবাই বেরিয়ে আসি মৃত্যু অবধারিত সবাই বুঝে যাই। বেরিয়েই দেখি আমার ৪ নম্বর বোন শাম্মী অফুরান গুলির মাঝে এদিক থেকে ওদিকে প্রাণপণে দৌঁড়াচ্ছে। যেদিকেই যাচ্ছে গুলি। আমি দৌড় মেরে ওরে ধরে আমাদের কাছে নিয়ে আসি সে আম্মার শাড়ীতে মাথা গুজে দেয়। আমার মা তখন সাহসী হয়ে যান। তাদের বলেন আমাদের মেরে তোমাদের লাভ কি বাবা। আমরা সুনামগঞ্জ থেকে জান বাঁচাতে এখানে এসেছি। আর কি কি বলেন মনে নাই। হানাদাররা রাইফেল নামায়। তার চেহারা এখনও আমার চোখে ভাসে। অনেক লম্বা ফর্সা অনেক বড় মোচ। সে আমাদেও এই বাড়ীর সাইডে একচিলতে খালের মতো আছে তারপরই অন্য বাড়ী সেই রাস্তা দেখিয়ে দেয় যাওয়ার জন্য। আমরা তার কথামতো আগাই, আর তখনি দেখি আব্বা মাটিতে পড়ে, তার উপরে সিতারা। আম্মা দৌঁড়ে কাছে যেতে চান। আবারও রাইফেল তাক করে। আম্মা পিছন ফিরে দাঁড়ান। গুলি লাগলে যেনো তার ছেলে বেঁচে যায়। আমাদেরও পিছন ফিরতে ইশারা করেন। অপেক্ষা করি গুলির। কোন দোয়া মুখ দিয়ে আসছে না। সামনে এলোপাথারি গুলি হচ্ছে। তখন আর কোন ভয়ডর কোন কিছুই বুঝতে পারি না। রাইফেল দিয়ে আম্মাসহ আমাদের গুতাতে গুতাতে ঐ খালের কাছে নিয়ে পথ দেখিয়ে দেয় চলে যাওয়ার জন্যে। পিছন ফিরে দেখি আব্বা আর সিতারাকে আালাদা করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তখনও বুঝিনি তিনি মারা গেছেন, মনে হয়েছে পড়ে গেছেন। আম্মা আবার অব্বার কাছে যেতে চান। আমরাও দৌঁড়ে আব্বার কাছে যেতে চেষ্টা করি। না আবার রাইফেল তাক করে। আর এলোপাথারি গুলি করতে থাকে। আমার কাধ ছুঁয়ে একটা গুলি চলে যায়। শাম্মীর কানের কাছ দিয়ে। গুলির হলকা কাধে অনুভব করি। মনে করি মরে যাচ্ছি। কিন্তু না মরি না। এতো প্রিয় বাবাকে রেখে জান বাঁচাই। আম্মাকে সফিনানীর শ^াশুরী জোর করে ধরে পাশের বাড়ীতে নিয়ে যান। ঐ সব বাড়ীর সব লোকও কাঁপছে একত্র হয়ে। ভোর হয়ে আসছে। হানাদাররা যে পাকের ঘওে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম সেখানে আগুন দেয়। আর গুলি করতে করতে চলে যায়। এরপর আর কিছু জানি না। খালি মানুষের মুখে শুনতে পারি আমার চোখের মনি আব্বা আর রাতে যাকে খেতে দিই নাই, সেই বোনটা না কি আর এ পৃথিবীতে নাই। (চলবে)