এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
হানাদাররা (আমি এদের হানাদারই বলবো কারণ বিনা কারণে যারা হানা দেয় আর জীবন নেয় তাদেরই হানাদার বলে।) কিভাবে আব্বা আর সিতারাকে খুন করেছে তা পাশের বাড়ীর লোকজন দেখেছে। সিতারা এক দৌঁড়ে এক চিলতে খাল পার হয়ে তাদের বাড়ীর কাছে চলে গেছিলো, তখনই সে পিছন ফেরে। আব্বাকে গুলি করতে দেখে। আবার দৌঁড়ে আমার আব্বাকে মেরে ফেল্লো বলে জড়িয়ে ধরতে যায়। আর একই ব্যক্তি আমার বোনের ঘাড়ে গুলি করে। আমার বাবার গুলি লেগেছিলো গলায় আর সিতারার ঘারে, একটাই গুলি। আজ আমার মনে হয় ওরা কি খালিক মিয়াকে মারতে এসেছিলো, না দুপুরে আব্বার সেই চাঁদা তোলা বেআইনী, মুক্তিযুদ্ধকে কলুষিত করবে এই জ্ঞান প্রদানের জন্য প্রতিশোধ নিতে এসেছিলো। কারণ তারা টার্গেট করে গুলি চালিয়েছে । আর ছোট্ট মেয়েটা বাপকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার অপরাধে তার ঘারেও গুলি চালাতে দ্বিধা করেনি। দু’জনকে গুলি করে হত্যা করে তারা অন্যদের পথ করে দিয়েছে বেরিয়ে যাওয়ার। শুধু তাই নয়, দু’জনকে আলাদা করার সময় আব্বার হাতের আংটি আর ঘড়ি নিয়ে যায়। তারপর ঘরে আগুন দেয়। খালিক মিয়ার ঘরে খালিক মিয়া না থাকলেও অনেক পুরুষ মানুষ ছিলো। তাদের টার্গেট করে নাই। বের করে ঐ খালের রাস্তা দেখিয়ে দেয়। খালিক মিয়ার বাড়ীতে আগুন দেয় নাই। দিয়েছে কদও মিয়ার পাকের ঘরে। মূল ঘরে নয়। এই ঘরের ছন পুড়ে আমার আব্বার লাশে পড়ে আর উনার চুল পুড়ে যায়। হানাদাররা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসীম সাহসী হেলেন নানা কয়েকজন লোক নিয়ে এই আগুন না নিভালে আমার আব্বার লাশটাও পুড়ে যেতো। তখন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং শুরু হয়নি। শান্তি কমিটিও তৈরী হয় নাই। কারা পাকিস্তানের পক্ষে যাচ্ছে তা নির্ধারন হয় নাই। মাত্র মুজিবনগর সরকার গঠন হয়েছে। আর জেনারেল ওসমানী সর্বাধিনায়ক হয়েছেন। গ্রামে-গঞ্জে প্রতিরোধ গড়ার জন্য লাঠি বাঁশ দিয়ে মানুষ প্রস্তত হচ্ছে।
পাশের বাড়ীর লোকজনও খালিক নানার আত্মীয়। সেখানে গিয়ে পাথর হয়ে বসে থাকা আমদের নানা ভাইকে দেখতে পাই। আর খালিক মিয়ার বাড়ীর সবাই জড়ো হন। সবাই বলাবলি করছিলো এই হানাদাররা আবার আসবে। তা নাকি যাওয়ার সময় বলে গেছে। শ্যামারচর গ্রাম খালি হতে শুরু করে। আম্মা বারবার আমাদের বাড়ীতে আব্বার ভাইদের খবর দেয়ার জন্য পাগল হয়ে যান। কিন্তু না কেউ এই খবর নিয়ে যেতে রাজী নয়। সবার কথা লঞ্চ নিয়ে হানাদাররা নদী পথেই আছে। যাওয়া সম্ভব নয়। গ্রাম খালি হয়ে যাচ্ছে। হেলেন নানা আব্বা আর সিতারাকে দাফন করার কথা বলেন। দেরী করলে লোক পাওয়া যাবে না। আম্মা সবার পায়ে ধরতে থাকেন লাশটা উজানীগাঁয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু কোন সাহসী লোক পাওয়া যায় না। হেলেন নানা দাফনের ব্যবস্থা করেন। আম্মার কাছে কোন টাকা নাই। আমরা যখন সুনামগঞ্জ থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম তখন আমরা প্রায় কপর্দক শূন্য ছিলাম। প্রায় তিন মাস ধরে কোর্ট চলে নাই। আব্বার কাছে কোন টাকা পয়সা ছিলো না। নানা ভাইর উপর নির্ভর করে আমরা বেরিয়েছি। এখন দাফনের খরচও নানা ভাই দিবেন। আম্মা বাধা দেন। আমার বাবার খুব আত্মসম্মান বোধ ছিলো। তার দাফন পরের টাকায় হবে উনি মেনে নিতে পারছিলেন না। আর এ সময়ই আপা দৌঁড়ে কদও নানা ভাইর বাড়ীতে ঢুকে। তার প্রিয় ব্যাংক যা সে কোলে করে বাসা থেকে আসার সময় নিয়ে এসেছিলো আর আমরা সবাই হাসাহাসি করছিলাম সেই ব্যাংক হেলেন নানার হাতে তুলে দেয়। হেলেন নানা নাকি সেই ব্যাংক ভেঙ্গে ৫৮ টাকা পেয়েছিলেন সেই টাকা দিয়ে দাফন করার ব্যবস্থা নেয়া হয়।
এরপর আমি যখন আমর পিতা আর বোনকে দেখি তখন তাদেও কাফন পরিয়ে কদর আলী নানার বাড়ীর সামনে এক ডালিম গাছের নীচে রাখা হয়েছে। শহীদের লাশের নাকি গোসল দিতে হয় না। আম্মাসহ অমরা সবাই দেখি প্রিয় পিতার আর বোনের মুখ। ডালিম গাছের নীচে অজ¯্র লাল ডালিম ফুলের নীচে রক্ত লাল লাশ। আম্মা সেন্সলেস হয়ে যান লোকজন ধরাধরি কওে সরিয়ে নেয়। হেলেননানা, কদর নানা লোকজন নিয়ে তাদের বাজারের কাছে আমার বাবা আর বোনের লাশ দাফন করেন। দূর থেকে দাঁড়িয়ে তা প্রত্যক্ষ্য করি। কি করুন মৃত্যু। পাঁচ ভাই জীবিত থাকা সত্বেও নিজ আত্মীয় স্বজন ছাড়া অচেনা দেশে দাফন হচ্ছে আমার বাবার। আমরা মেয়েরা কবরে নামার অনুমতি নেই। অনেক প্রতীক্ষার পর যে ছেলে পেয়েছেন সে শিশু। পিতার দাফন হচ্ছে সে তা বুঝতেই পারছেনা। দাফন করছে শ^শুর, মামা শ^শুর অনাত্মীয় মানুষ। একেই যুদ্ধ বলে। যুদ্ধাবস্থা বলে।
বহু চেষ্টাকরেও কেউ যে খবর নিয়ে আমাদের বাড়ীতে যেতে চায়নি। বা খবর পাঠানো সম্ভব হয়নি, সেই খবর আমার চাচাদের কাছে ঠিকই পৌঁছে যায়। লোকে বলে এসব খবর বাতাসের আগে চলে। কে যে আমাদের বাড়ীতে এই দু:সংবাদ দিয়েছে জানি না। আমার বড় চাচা দেরী না করে, নিজের প্রাণের মায়া না করে, পথে যেখানে হানাদাররা আবার আসবে বলেছে সেই পথে রওয়ানা হন। সাথে তার আরও দুই ভাই। সন্ধ্যার মাঝে চলে আসেন শ্যামারচর কেমন করে কে জানে। কিন্তু না ভাইয়ের লাশ নিয়ে যাওয়ার তৌফিক তাদের হয়নি। দুপুরের পরপরই কবর দেয়া হয়ে গেছে। তারা নাকি নৌকা থেকে উঠতে চাননি। শেষে উঠে কবর জিয়ারত করে রাতেই ফিরে যান। না আমাদের কারও সংগে দেখা হয়নি। আমরা বিকালেই প্রাণ বাঁচানোর জন্য পথে নেমেছি।
গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরা
৩/৪টার দিকে আমরা আবার পথে নামি। এ গাঁয়ে থাকা যাবে না। যেতেই হবে। গ্রাম খালি হয়ে যাচ্ছে। আবার যদি এরা আসে। স্বামী আর সন্তান হারিয়ে আমার মা পথে নামেন। নানা ভাই আমাদের সনে। তিনি আম্মার কছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। প্রায় চার বছরের ছেলে কোলে তিনি হাঁটতে থাকেন অজানার পথে। আমরাচারবোনউনারশাড়ীধরেচলতেথাকি । মুরগী যেভাবে বাাচ্চা আগলে চলে, আম্মা সেভাবে আমদের কাউকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছেন না। সারা রাস্তা আম্মাকে হাতে ধরে শাড়ী ধরে আমরা চলতে থাকি। রাস্তায় কত মানুষ বেরিয়ে আমাদের দেখতে থাকে। কত গুজব কানে আসতে থাকে। আমরা শুধু চলতেই থাকি। পথ শেষ হয় না।
কত হেঁটেছি মনে নাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আবার রাত নামে। ৬ই রবিউল আউয়ালের এক চিলতে চাঁদের আলোয় আমরা পথ চলি। (৬ই রবিউল আউয়াল কথাটা মনে আছে। কারণ অনেকেই আম্মাকে সান্তনা দিতে গিয়ে বারবার বলছিলো আহা! শহীদের দরজা পেয়েছেন। ছয় দিন পরেই নবীজির মৃত্যু তারিখ।) এক সময় এক গ্রামে থামি। গ্রামের নাম কৃষ্টপুর। কিশোরগঞ্জের বর্ডার নাকি এই গ্রাম। এক বাড়ীতে আমাদের আশ্রয় হয়। ৬/৭ দিন ওখানে থাকি। নানাভাই আবার একটা বড় নৌকা ভাড়া করেন। এবার ফেরার পালা । মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে দু’দুজন মানুষ হারিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে অনন্ত যাত্রা। এক/দুই ঘন্টা নৌকা চলার পর পথে শ্যামারচর পড়ে। নানা ভাই নৌকা থামান। বাজারের কাছে আব্বার কবর। জিয়ারত করতে নামেন। খালিক নানা ভাই খবর পেয়ে গেছেন। তিনি কোত্থেকে তার দুই ভাই সহ আসেন। তাদের বাড়ীতে নাকি তাদের মারা ছাড়া কাজের লোক ছাড়াকে উনাই। তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের বাড়ী উঠতে বলেন। নানা ভাই রাজী হন না। আব্বার অসুখের আগে উনাকে দেখেছিলাম আর দেখি নাই। ঘটনার দিন তো তিনি বাড়ীতেই ছিলেন না। আব্বার দাফনের সময়ও দেখি নাই। উনাকে দেখে বুকের কষ্ট উথাল পাতাল করে। এ কয়দিন মানুষের মুখে যা শুনেছি তা হলো উনার অমুক শত্রু, তমুক শত্রু উনাকে মারার জন্য হানাদারদের ভাড়া করে পাঠিয়েছিলো। যার বলি আমার বাবা বোন। পাথরচাপাকান্নাকাঁদতেথাকি। তিনিআমাদেরমাথায়হাতদেন, বলেন, আমাকে মারার জন্য কারা লোক পাঠাতে পারে আমি জানি। বেঁচে থাকলে তোমাদের আমি দেখবো। নানা ভাই কোন কথা বলেন নানী নৌকায় উঠেন। আর আমার মা পাথর হয়ে বসে থাকেন।
নৌকা চলতে থাকে। আসার সময় ছইয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে কত শত প্রশ্নে আব্বাকে ব্যাতিব্যস্ত করেছিলাম, কিন্তু যাওয়ার সময় নীরবে ছইয়ের নীচে গুটলি পাকিয়ে সব ভাই বোন বসে আছি। পৃথিবীর কোন কিছুতেই আমাদের আগ্রহ নেই। আছে শুধু জান বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা। তাই এই ছুটে চলা। দুপুরের দিকে ঘটে আরেক বিপত্তি। ছোট মামা সাব্বির আহমেদ সুয়েল বয়স তার ১৪/১৫ হঠৎ প্রচন্ড পেটের ব্যথায় নৌকার মাঝেই চিৎকার করতে থাকেন। যে সেই চিৎকার না, তার স্বরে চিৎকার। উনাকে কোনমতে থামানো যাচ্ছে না। একেকবার চিৎকার দিয়ে বসা থেকে উঠে পড়েন মনে হয় নৌকার ছৈ ফুরে বেরিয়ে যাবে। সবাই দোয় দুরুদ পড়তে থাকে। নানাভাই কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে যান। কান্নার রোল পড়ে। নানা ভাই পাথরের মতো দু’পা ভাজ করে বসে পড়েন। সব মনোযোগ দিয়ে দোয়া পড়তে থাকেন তার দু’চোখ বেয়ে পড়তে থাকে অবিরল জলধারা। নানা ভাইকে এক সন্ন্যাসীর মতো মনে হয়। আমরা অবাক বিস্ময়ে আতঙ্কে তাকিয়ে থাকি। ছোট মামার চিৎকার থামে না। একটু থিতুনেয় আবার একইরকম। নানাভাই বলেন মাঝি নৌকা ভিড়াও। একটু লোকালয় দেখে ভিড়াইও। কিছুক্ষণের মাঝেই নৌকা ভিড়ে। সামনে তাকিয়ে দেখি কিছু দোকানপাট দেখা যায়। তখন দুপুর চলে গেছে। কিছু মানুষ ভিড় করে। নানাভাই নৌকার বাইরে বের হন। কোথা থেকে বিভিন্ন ধরনের মানুষ চলে আসে। নানাভাইকে চিনতে পারে। আমাদের নৌকা থেকে তুলে নিযে যায়। এই গ্রামের নাম নাকি গইচ্ছা। কার বাড়ী উঠি জানি না তবে তারা বড় মামাকেও চিনে। ছোট মামার জন্য হোমিওপ্যাথি এলোপ্যাথি দুই ধরনের ডাক্তারই নিয়ে আসা হয়। এরাও আমাদের আদর করে রাতে এখানেই থাকি। সকালে ছোট মামা অনেকটাই সুস্থ্য । আমরা আবার নৌকায় উঠি গন্তব্য জানি না।
প্রায় বিকালের দিকে আমাদের নৌকা এক জায়গায় নোঙর করে আমাদের নামতে বলা হয়। আমরা নামি। সামনে দাঁড়ানো দেখি বড় ভাই আজির উদ্দীন নাজির সাহেব। আম্মার বড় ফুফা। আর বড় মামা বদিউর রহমান। শুরু হয় কান্না। ঘরে গিয়ে দেখি আম্মার দুই ফুফু। যারা আম্মাকে মা মারা যাওয়ার পর লালন পালন করেছেন। গ্রামের নাম রামনগড়। (চলবে)