Deprecated: Required parameter $month follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $day follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $year follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $display_count follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292

Deprecated: Required parameter $total_shares follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292
এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক

এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
হোসেন বক্ত মামা এদের কে নিজে গিয়ে বাসায় দিয়ে আসেন। সারা শহরে পাহাড়া বসান। পরে জানতে পারি, এটা নাকি দাঙ্গা লাগানোর পায়তারা। কোথায় কোথায় দাঙ্গা লাগছে এগুলো ছিলো তখন আলোচনার বিষয়। আমাদের সুনামগঞ্জ সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যরে চারন ভূমি, চেষ্টা করেও হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা লাগানো সম্ভব ছিলো না। কারণ সুনামগঞ্জের মুরব্বীরা বড়ই উদার আর মানবিক ছিলেন। যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। সবাই আনন্দ উৎসবে ব্যস্ত। আমার নানার বাসায় মিষ্টি খাওয়া খাওয়ি হয়। আমরা নাকি যুদ্ধ জয় করেছি। আমরা ছোটরা ভেবেছি এই বোধহয় আর কোন সমস্যা নাই। ১৯৬৬ সালে আমরা আমাদের নিজস্ব বাসা বর্তমান বাসস্টেন্ডের বাসায় চলে যাই। সেখানেই আমাদের ভাই আবেদীনের জন্ম হয়। আমরা ভাই বোন ছাড়াও আমাদের বাসায় লোকসংখ্যা প্রচুর। আমার চাচাতো বোন জমিলা আপা আর উনার ভাই পড়াশুনার জন্যে এসেছেন। আর ছিলেন চাচাতো ভাই গোলাম রব্বানী। ক্লাস এইট থেকেই তিনি চাচার বাসায় থেকে পড়াশুনা করেন। পড়াশুনা কি করেন জানি না তবে প্রবল ভাবে ছাত্র রাজনীতি করেন আর তাকে প্রচ্ছন্ন সাহস দেন নিজেরই চাচা আমার আব্বা। আমার আব্বার নাম সোনাওর আলী অ্যাডভোকেট। সুনামগঞ্জ বারে যোগ দেন ১৯৫৯ সালে। তৎপূর্বে ঢাকায় পড়ার প্রাক্কালে উনি জড়িয়ে পড়েন বাম রাজনীতিতে। ১৯৫১ সাল থেকে সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে তিনি ঢাকায় ‘ল’ পড়ার জন্যে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হন। থাকেন ইকবাল হলে। রাজনীতি সচেতন ছিলেন বলে ভাষা আন্দোলন সহ সব আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নেয়া তার কর্তব্য মনে করতেন। তার রুমমেট ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। দু’বন্ধু এক সঙ্গে শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের স্বপ্নে বাম রাজনীতিতে দীক্ষা নেন। পরবর্তিতে সামাদ চাচা আওয়ামীলীগে যোগ দেন কিন্তু আমার বাবা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিস্থাপনের স্বপ্নকে ধারণ করে ন্যাপ রাজনীতির সঙ্গেই অবস্থান করেন এবং সব প্রগতিশীল আন্দোলনের সংগে যুক্ত হন। আর সেই কারণেই নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে ছাত্ররাজনীতি করায় বাধা না দিয়ে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দিতেন। আর দাদা (গোলাম রব্বানী, উনাকে আমরা দাদা ডাকি, এই উনাকে আমরা দাদা ডাকি, এই লিখায় দাদা শব্দটি বেশী ব্যবহৃত হবে। কারণ বার বার গোলাম রব্বানী লিখা দৃষ্টিকটু) একই পরীক্ষা বার বার দিয়ে ছাত্র জনতাকে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের মনন তৈরীর কাজে নিজেকে মনোনিবেশ করান। আর এই কারণেই ১১ বছরের মেয়ে হয়েও আমার মতো এক শিশু স্বাধীনতা যুদ্ধকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। কারণ আমার স্মৃতির উন্মেষ হওয়ার সময় থেকে আমি রাজনীতির কথাবার্তা শুনে তার মাঝেই বড় হয়েছি।
১৯৬৬ সালে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়। আমরাও নুতন বাসায় উঠেছি। আমাদের নুতন বাসা পুরাতন বাসার অপজিটে। রাস্তার এপার ওপার। দাদা আর আমাদের সঙ্গে নুতন বাসায় উঠেন নি। তিনি আব্বাকে ভীষণ ভয় পেতেন। তিনি তখন রাত করে বাসায় ফিরলে জবাবদিহি করতে হতো, রাত্রে সংগঠনের কেউ সেভাবে আসা সম্ভব নয়। তাই তিনি এপারে তার বন্ধু সংগঠনের কর্মী মানিক কোরেশীর বাসায় আস্তানা নেন। দুপুরে বাসায় এসে খেয়ে আবার আস্তানায় ফেরা। তার এই সব লুকিয়ে চলাফেরার প্রশ্রয় দাত্রী আমার মা। আর উনার কর্মকান্ডের জন্য ব্যাখ্যাও আমার মাকে ই দিতে হতো। এই মানিক কোরেশীর ঘর ছিলো তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির এক আখড়া। আমাদের কাজ ছিলো ওখানে কেটলী করে চা নিয়ে আসা আর মুড়ি সাপ্লাই দেয়া। আর উনাদের সিগারেটের প্যাকেট ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তা কুড়িয়ে নিজের স্টক বাড়ানো। এই সিগারেটের প্যাকেট ছিলো আমাদের খেলার এক অনুসঙ্গ। আমি, নার্গিস, নাহার আপা , মঞ্জু মাসী, তালেব, বাবলু মনি, আমাদের সবার এই বাসার দিকে আলাদা নজর থাকতো। এই সিগারেটের প্যাকেট কব্জা করার জন্যে। যে কেউ সিগারেটের প্যাকেট ফেলা মাত্রই দৌঁড়ে একজন গিয়ে নিয়ে আসতো। ক্যাপস্ট্যান এর প্যাকেটের মূল্য বেশী। তার সোনালী রাংতা আমাদের পুতুলের গয়না বানানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। আর প্যাকেট টাকা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কাজেই রাজনীতির কি আলোচনা হয় সেটা বড় কথা নয়, তাদের ফেলা প্যাকেটের আকর্ষণ পাড়ার আমাদের বয়সী প্রায় সবার ঐ বাসার আনাচে কানাচে ঘোরার মেক্ষম কারণ ছিলো। এরা সবাই ছাত্র নেতা। এদের কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বল্লে কোন ফাই ফরমায়েস দিলে বর্তে যেতাম। এরা মিছিল মিটিং করতো আবার সুযোগ পেলে আমাদের ‘সোনার টুকরী খেলায় ’ এসে টুকি দিয়ে দৌঁড় দিতো। আমাদের খেলায় হঠাৎ দাদা উঁকি দিতেন বা শহীদ ভাই । ঘাস দিয়ে একটা রিং তৈরি করে বলতেন চোখ বুজো চোখ বুজো। আমরা চোখ বুজতাম তিনি ঐ রিং উড়িয়ে দিয়ে বলতেন
মন গেলো দূর বিক্রম পুর
হেলার মাঝে ঠেলা দিয়া পড়ি রইছে
খুঁজে দেখো তোমরা সবে
যে পাইব সে রাজা অইবে
যাও এবার খুঁজতে থাকো বলেই নিজ কাজে চলে যেতেন। আমরা সেই ঘাসের রিং খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে খেলা শেষ করতাম। এখানে তখনকার সব ছাত্র নেতাকেই আমি দেখেছি । সেনদা, সুরেশদা, দাদা, মিন্টুদা, শহীদ ভাই, নাসির ভাই, সুজাত ভাই, মালেক ভাই, নজির ভাই, (উনি বড়দের সাথেও থাকতেন ) গুলজার ভাই, হুমায়ুন ভাই, সমছু ভাই, মতিউর মামা, খসরু ভাই, উদয় দা, মিনু ভাই, মৃৃদুল দা আরও কতো নাম না জানা ছাত্র নেতা। তাদের সবার স্বপ্ন দেশপ্রেম শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় আমরা ছোটরা মনে করেছি আর কোন সমস্যা নাই, কিন্তু না! কয়দিন পরই দেখা যায়, আবার মিছিল বের হয়েছে। মিছিল দেখলেই দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো। আর স্লোগানে গলা মেলানো। ছয়দফা মানতে হবে। ১১ দফা মানতে হবে। প্রতি বিকালে বা সন্ধ্যায় দেখা যেতো মিছিল বেরিয়ে গেছে । আমারাও সামিল হতাম সেই মিছিলে। আসলে ১৯৬৬ থেকে ৭০ সাল ছিলো মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল। ছাত্রদের তখন সর্বোচ্চ সম্মান। পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় ছাত্ররা জমায়েত হয়ে কিভাবে ছয় দফা বা ১১ দফা বাস্তবায়ন করা যায় সেই আলোচনায় মত্ত। প্রত্যেকের চোখে স্বপ্ন। ঐ সময় শোনা যেতে থাকে একটি নাম শেখ মজিবুর রহমান। সবার ভাষায় শেখ সাব।
আমার আব্বার সঙ্গে সবসময় দেখতাম একজনকে, তার নাম আলফাত উদ্দীন মোক্তার সাব । আর অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান সাহেবকে। খলিলুর রহমান চাচা বাগান বাড়ীতে ভাড়া থাকতেন। প্রতিদিন সকালে কালো কোট পড়ে রিকশা নিয়ে আমাদের বাসার সামনে আসতেন। আব্বা কালো কোট পড়ে উনার সঙ্গে এক সাথে অফিসে যেতেন। মনে হয় রিক্সা ঠিক করা ছিলো। খলিল চাচা আওয়ামী লীগ করতেন, আব্বা ন্যাপ, কিন্তু সৌহার্দ্যরে কোন কমতি ছিলো না। বিকালে আব্বা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রতিদিন যেতেন আলফাত মামার বাসায়। উনাকে নিয়ে রওয়ানা হতেন। গন্তব্য পুরানা কলেজের সামনে আলেয়া ফার্মেসী বা ন্যাশনাল ফার্মেসী। সেখানে সবাই জমায়েত হতেন। আর রাজনৈতিক আলোচনায় ঐ এলাকা সরগরম করে তুলতেন। পার্টির যে কোন কাজে অনেক সময় অনেকে আমাদের বাসায় আসতেন। বরুণ দা, পীর হাবিবুর রহমান, আলতাফ হোসাইন, গুলজার ভাই, নজির ভাই, খোকন মামা বাম ঘরানার নেতারাÑ তাদের আলোচনা সমালোচনায় একটা জিনিসই ফুটে উঠতো স্বাধীকার, স্বাধীনতার প্রশ্নে সবার এক হয়ে যাওয়া। তাদের স্বপ্ন হলো আগে স্বাধীকার পরে সমাজতন্ত্র। ছয় দফা আর ১১ দফার আন্দোলন এক সাথেই হয়। সুন্দর এক পরিবেশ ছিলো ছোট্ট শহরটাতে। এই জায়গায় কয়জন ছাত্রলীগ নেতা তো ঐ জায়গায় ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্রদের মাঝে ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র বেশী। কিন্তু ছয় দফার মিছিলে সবাই এক । আমি ছোট মানুষ ছয় দফাও বুঝি না ১১ দফাও বুঝি না। শুধু বুঝি আমার বাবা আমার দাদা আমার নানা যে কোন মূল্যে এই দফা গুলো চান। আমিও মিছিলে গলা মেলাই ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। ‘ স্বৈরাচারের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও’। (চলবে)