এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
মিছিলের শব্দ পেলেই আমরা স্যারের বাসায় দরজার সামনে চলে যেতাম আর সকলে তারস্বরে শ্লোগান দিতে থাকতাম। স্যার বেত দিয়ে মেরেও আমাদের ক্ষান্ত করতে পারতেন না। উনার ছেলে রানা দার তখন নুতন বিয়ে হয়েছে তিনি আমাদের এই উপদ্রব সহ্য করতে পারতেন না। মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলের কথা শুনে স্যার বেত নিয়ে মারতে মারতে স্কুলে নিয়ে যেতেন। তিনি বেত হাতে পিছনে, সামনে আমরা। তথাপি শ্লোগান দেয়ার সময় ঠিকই গলা মেলাতাম। আর বেত খেতাম। ঐ এলাকার ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন খসরু ভাই। কালো সার্ট পড়ে মিছিল নিয়ে বেরোতেন, মিনু ভাইয়ের বাসার সামনে জমায়েত হতো। প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনায় ইলেকশন শেষ হয়। অক্টোবরে নির্বাচন হয় না। বন্যা ঝড় অনেক কারণ। ডিসেম্বরে হয় কাঙ্খিত নির্বাচন। নৌকার বিপুল বিজয়। সারা দেশের মাঝে একটা কুঁড়েঘরের সিট। তা ও সুনামগঞ্জে। সেন দা। আমাদের বাসায় বিরাট জমায়েত। সবাই খুশী। স্বপ্ন যেনো হাতের মুঠোয়।
৭১ এর উন্মাতাল সময়
কিন্তু না বড়দের টেনশন শেষ হয় না। আরও অনেক কিছু নাকি বাকী। আমরা বৃত্তির জন্যে মনোযোগ দিই। জানুয়ারিতে বৃত্তি শেষ হয়। আব্বা সতীশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে আমাকে ভর্তি করে দিয়েছেন। কিন্তু ক্লাস হওয়ার নাম নেই । মনে হয় সারা জীবনের জন্যে মুক্তি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরার অবারিত দ্বার। শহরে শান্তি নেই। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন। পয়েন্টে রাজনৈতিক নেতাদের সমাগম। আলেয়া ফার্মেসী, ন্যাশনাল ফার্মেসীতে আব্বাদের মতো নেতাদের সমাগম। পুরান কলেজের সামনে ছাত্র নেতাদের উত্তপ্ত আলোচনা শ্লোগান চলতেই থাকে। এখনকার চিন্তা শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী করবে তো ? এতো সহজে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ফলাফল মেনে নেবে তো ? কি হচ্ছে ঢাকায় ? ছয়দফা বাস্তবায়ন কি এতো সহজে হবে ? ছাত্র জনতা, শহর গ্রাম, রাস্তা দোকান, বাসা বাড়ি সর্বত্র একই প্রশ্ন। এমনিতেই কি পশ্চিম পাকিস্তান সব মেনে নেবে ? এ সময় আরও একজনের নাম চারিদিকে শুনা যেতে থাকে। জুলফিকার আলী ভুট্টো। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিববের থেকে অর্ধেকের কম সিট পেয়ে নাকি প্রধানমন্ত্রী হতে চায়। বাংলার মানুষ তা মানবে কেন? সবাই তাকিয়ে আছে তাদের প্রিয় নেতার দিকে। এখন আর কোন পার্টি নেই সবাই এক একাট্টা। জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। সব জায়গায় ক্ষোভ, আর নিজেদের পাওনা বুঝে নেয়ার দৃঢ় কঠিন সংকল্প। সরকার কারফিউ জারি করেও কিছু করতে পারছে না। শেখ মুজিব তাদের প্রিয় নেতা, তিনি যা বলেন পূর্ব পাকিস্তানের সবাই তা মানার জন্যে উদগ্রীব। মার্চ মাসের প্রথমেই জাতীয় সংসদ বসার কথা। (চলবে)