এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বসছে না। ২ তারিখ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। অফিস আদালত বন্ধ । স্কুল কলেজের তো কথাই নেই । ঢাকায় না কি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে ছাত্ররা । সুনামগঞ্জেও পতাকা তৈরির হিড়িক পড়ে । মতিউর মামা, কালা সফিক, শহীদ ভাই, দাদারা মিলে এস ডি ও অফিসের সামনে পতাকা টানান । শিল্পীরা রাস্তায় রাস্তায় ধনধান্যে পুস্পে ভরা , আর আমার সোনার বাংলা গান গেয়ে উত্তেজিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেনো এখনই দাবি আদায় করে ছাড়বে । এর মাঝে আসে ৭ মার্চ। দুপুরের দিকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন । সবাই কানের মাঝে রেডিও নিয়ে তটস্থ কি আদেশ আসে । রেডিওতে কিছু শুনা যায় না । সবাই উদগ্রীব ইন্ডিয়ার চ্যানেল ধরার প্রাণান্তকর চেষ্টা । পরদিন রেডিও ভাষণ সম্প্রচার করে । বার বার সম্প্রচার করে । ভাষণ শুনে সবাই রাস্তায় নেমে আসে । সবাই বুঝে যায় যুদ্ধ আসন্ন । আর বাঙালির মনোবল প্রস্তুত হতে থাকে। পরবর্তী কাজের জন্য সবাই রেডি। প্রত্যেক থানার পুলিশও এখন ছাত্র জনতার সাথে । কে মানে তাদের কারফিউ । সবাই শংকিত, উৎকন্ঠিত, কিন্তু ভীত নয় । বিশেষ করে ছাত্ররা । দেশপ্রেমের জোয়ারে প্রত্যেকে উদ্বেলিত।
সব ধরনের আলোচনা ভেস্তে যাচ্ছে। আব্বা, আলফাত মোক্তার মামা, রইছ চাচা, আব্দুল হাই নানা, নানাভাই, প্রত্যেককে দেখতাম একত্রে বসে আলোচনায় রত। কি যে আলোচনা হতো অতো না বুঝলেও দেশ স্বাধীন নিয়ে আলোচনা চলছে বুঝতাম। আন্দোলনকারীকে ঢাকায় মারছে এমন খবর আসছে । জাহাজে করে সৈন্য আনতেছে সে খবরও আসছে। খবর আর গুজব একত্রে চলছে। এর মাঝেই আমাদের পাড়ার রফিকুল আপা তুলা মিয়ার মেয়ে দু’দিনের জ্বরে মারা গেলেন । সারা পাড়ার মন খারাপ । মন খারাপ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটি। আমাদের খেলাধুলাও বন্ধ। আমরা ছোটরাও যেনো রাজনীতি সচেতন হয়ে গেছি। যেখানেই বড়দের আলোচনা সেখানে ভিড় জমাচ্ছি। আমাদের মাঝেও কার বাসায় কি আলোচনা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ । আর খবর সংগ্রহে আমি ওস্তাদ । আম্মার কাছে যেমন দাম পাচ্ছি তেমনি আপাদের আসরেও । কারণ দিলি আপা, আপা, নাহার এরা এখন সেলোয়ার কামিজ পড়ে । বাইরের খবর পায়না । আমি হাফপ্যান্ট পড়ে সারা পাড়া, বাজার , পুরান কলেজের সামনা উকিল পাড়া সর্বত্র ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করি । এর মাঝে ২৫ মার্চ চলে আসে।
২৬ মার্চ ১৯৭১ ও তৎপরবর্তী কয়দিন
২৫ মার্চ আমরা ঘুমিয়ে গেছি, রাত২/৩ টার দিকে প্রচন্ড জোরে জোরে পাশের বাসার হাসন বক্ত মামা (আমিন ভাইর আব্বা ) উকিল সাহেব উকিল সাহেব বলে ডাকতে থাকেন । আব্বা ধড়মড়িয়ে উঠেন । আমরাও । উনি হাফাতে হাফাতে বলেন সর্বনাশ হয়েছে যুদ্ধ লেগে গেছে । ঢাকায় পাকিস্তানিরা আমাদের আক্রমণ করেছে । ইয়াহিয়া পাকিস্তানে চলে গেছে ।
যুদ্ধ যে লাগবে সেতো জানি । কিন্তু আক্রমণ করেছে জানলেন কিভাবে । আর শেখ সাহেবকে এরেষ্ট করেছে তাই বা কেমনে জানলেন।
উনি শুধু বলেন খবর সত্য। আব্বা রেডিও ছাড়তে যান । সকালের আগে ঢাকার রেডিও খুলবে না । উনি শুধু একই কথা বার বার বলতে থাকেন আর কাাঁপতে থাকেন । ঢাকায় সব মানুষ মেরে শেষ ! শেখ মুজিবকে মেরে ফেলবে ।
আব্বা ইন্ডিয়ার চ্যানেল ধরতে চেষ্টা করেন আর পেয়েও যান । কোন চ্যানেল কি জানি, কিন্তু বড় অস্থির হয়ে যান । ফজরের আজান পড়ার সংগে সংগে বেরিয়ে যান। দেখা যায় রাস্তায় সামনের বাসার দিলি আপার আব্বা নাহার আপার আব্বা, বাবলুর আব্বা, অমি মামা, মানিক কোরেশীর বাসার ছেলেরা সবাই রাস্তায় । কে কি শুনেছে তার বর্ণনা চলছে । সবাই নামাজে যান । ভোরেই নানাভাই চলে আসেন তার চলনদার আবু ভাই সহ । সকালে সালেহর আব্বা আলফাত মামা আসেন আর আব্বা সহ বেরিয়ে যান। কোথায় যান আল্লাহ মালুম। হোসেন বক্ত মামাকে চরকির মতো রিকশায় ঘুরতে দেখি সকালে । কতবার যে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে যান ইয়ত্তা নাই । একটু বেলা হলে মানুষজন রাস্তা থেকে চলে যেতে থাকে ।
দুপুরের দিকে দাদা বাসায় আসেন । কালো প্যান্ট কালো জাম্পার গায়ে পিছনে এক রাইফেল । রাস্তায় নেক ভাইসাব রাইফেল হাতে । ও সি সাহেব আর আনসার এর হেড নাকি সব তাদের দিয়েছে যুদ্ধ করার জন্য । দাদাকে এই শেষ দেখি । আর দেখি স্বাধীন বাংলাদেশে। দাদা আম্মাকে আর আব্বাকে সালাম করতে আসছেন যুদ্ধে যাবার জন্য । কি যুদ্ধ করবেন কোথায় যুদ্ধ করবেন কিছুই ঠিক নাই । পাকের ঘরে জল চৌকিতে খাইতে দেন আম্মা । আমরা সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দাদা আম্মাকে বলেন “কে যে কোথায় যাবেন ঠিক নাই । আমার সংগে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নাই । বাবুকে দেখে রাখবেন । উনি অসুস্থ । ভালো করে একটা দৌঁড়ও দিতে পারবেন না । উনার জন্যেই আমার চিন্তা ”। আম্মা শুধু অঝোর ধারায় কাঁদতেই থাকেন । আমরা অবাক হয়ে রাইফেল দেখি । যুদ্ধ কি ভাবে করবে চিন্তা করি ।
দাদা আব্বা আম্মাকে সালাম করে যেতে উদ্যত হলে আব্বা দাদাকে জড়িয়ে ধরেন। বলেনÑ‘এই যুদ্ধ সবাইকেই করতে হবে কতজন যে মরবে আল্লাহ জানেন । চলতে ফিরতে পারলে আমিও তোমার সংগে যেতাম । দেশের জন্য যাও বাবা। আমি খুশী’ । আব্বা দাদাকে দোয়া দুরুদ পড়ে দেশের জন্য বিদায় দেন । আর তার প্রিয় ভাইস্তাকে সাথে দেখা হয় নাই । উনি নিজেও জানতেন না এই শেষ দেখা । দাদাও না । আমরা কাঁদতে থাকি । কালো জাম্পার গায়ে রাইফেল কাঁধে দাদা বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন আজও চোখে ভাসে ।
আমিও বের হই রাস্তা পর্যন্ত । আজ আর টো টো করার সুযোগ নাই । রাস্তায় নেক ভাই, মালদার মামার কাঁধে রাইফেল। হোসেন বক্ত মামা আর আলফাত মামা একত্রে আসেন। বাবাকে বলেন, প্রাথমিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করছি । আপনি যেনো আবার বের হবেন না। দৌঁড় দিতেওতো পারবেন না । আমার আব্বার মেরুদন্ডে বড় সমস্যা ছিলো। ঘাড় ঘুরাতে পারতেন না তাই সবার চিন্তা । আলফাত মামা সালেহদের মামী সহ আমাদের বাসায় দিয়ে যান। আমরা যেদিকে যাই তাদের যেনো নিয়ে যাই । এবং শেষে যেনো মুক্তাখাই পাঠানো হয় । ২৬ তারিখ চলে যায় সবার টেনশনের মাঝে । আমার নানা মতছিন আলী খুব ব্যস্ত তার বাজারের লোকজন নিয়ে । তাদের বেশীর ভাগই হিন্দু । পাক আর্মির হিন্দুদের উপর বড় রাগ । কিভাবে যে তাদের রক্ষা করবেন সে নিয়ে উৎকন্ঠিত । প্রশাসন ও থানা মোটামোটি ছাত্র জনতার দখলে। সুনামগঞ্জের মানুষ একাট্টা। আর্মি আসলে প্রতিরোধ করবেই । মিছিল কমে গেছে কিন্তু মোড়ে মোড়ে জটলা বাড়ছে । ছাত্রদের সাথে গ্রামগঞ্জ থেকে রামদা সুলফি উত্তেজিত মুক্তিকামী জনতা সামিল হচ্ছে। সবার মন থেকে ভয়ডর উধাও । যে করেই হউক প্রতিরোধ করবেই ।
সুনামগঞ্জে পরাজিত পাকবাহিনী
২৭ মার্চ রাত্রে এক গাড়ি ভর্তি আর্মি আসে। এসডিও সাহেবের সাথে দেখা করে কারফিউ জারি করে সার্কিট হাউসে যায় আর সেই ফাঁকে ছাত্র জনতা সার্কিট হাউস ঘেরাও করে ফেলে । পরদিন সকাল থেকে মাইকে আর্মিদের সুনামগঞ্জে আসার খবর দিয়ে তাদের আক্রমণ করার আহ্বান আসে । ভরাট গলার সেই মাইকিং । পরে শুনেছি সাব্বির ভাই এই মাইকিং করেছে। সে বোধ হয় তখন ক্লাস টেন এর ছাত্র । কিন্তু মৃত্যু ভয়কে জয় করেছে । রাস্তায় মানুষজন দৌঁড়ে নিজ নিজ বাড়ি যাচ্ছে। আব্বা রাস্তায়। প্রত্যেক বাসার খালু সাহেবরা রাস্তায়। আমিও আছি রাস্তায়। কারফিউ ভেঙ্গে সবাই রাস্তায় জমায়েত হয় । কোত্থেকে মিছিল শুরু হয় জানি না তবে মনে হয় বাসস্টেন্ডের কাছ থেকে । ওবায়দুর রেজা সাহেব, নানাভাই, আব্দুল হাই নানা , তারা নানা, আলফাত মোক্তার মামা , আকমল আলী মোক্তার সাব আফাজউদ্দীন সাব এবং আব্বা এইসব বড়রা এবং ছাত্ররা এখানে নাই। তারা যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত । ছোট্ট মিছিল কয়েকটা রাস্তা ঘুরে চলে আসে। হোসেন বক্ত মামা সবাইকে যার যার ঘরে যেতে বলেন। সাবধান থাকতে বলেন। আর বলেন এমনিতে তারা হার মানবেন না। যুদ্ধ হবে । তার দুই ছেলে নেক ভাই আর সুভাষ ভাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। নানাভাই, হোসেন বক্ত মামা আলফাত মামা আসেন আমাদের বাসায়। সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন । আব্বা অসহায়ের মতো তাদের দিকে তাকান । তাদের সংগে যেতে চান । তারা একযোগে উনাকে বাধা দেন । বলেন পরে আপনাকে কাজে লাগবে । এখন দৌঁড়দৌড়ি করার ব্যাপার আপনি করতে পারবেন না । নানাভাইও তাদের সাথে চলে যান । আমার বাবার সেই মন খারাপ করে বসে থাকার দৃশ্যটা আজও চোখে ভাসে। দুপুরের দিকে শুরু হয় যুদ্ধ । সে কি গুলির শব্দ । প্রথমে দু একটা পরে মুষলধারে গুলির শব্দ। সন্ধ্যা পর্যন্ত গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকে । রাত্রে আবার পাশের বাসার হাছন বক্ত মামা আসেন । আমরা নাকি যুদ্ধ জয় করেছি । সার্কিট হাউসে সব পাক সেনা খতম । আমাদের ছেলেরাও না কি মারা গেছে । কোথায় যে দাদা কোথায় যে মতিউর মামা আল্লাহ জানেন । আম্মা মতিউর মামা আর দাদার জন্যে কান্না শুরু করেন । মামী সালেহর আম্মা মামার জন্য । হাছন বক্ত মামা সালেহর আব্বার খবর বলেন, তিনি ভালো আছেন। বড়রা সরাসরি যুদ্ধ করে নাই, তারা নিরাপদে আছে । ছাত্রদের খবর তিনি জানেন না । উনি আমাদের বাসায় থাকা অবস্থায় ঝড় শুরু হয় । এ যেনো আরেক যুদ্ধ। (চলবে)