তাহিরপুরের একটি গ্রাম থেকে ৩০ টি পরিবার একযোগে গ্রাম ছাড়ছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদের তথ্য অনুসারে তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের অন্তর্গত নোয়ানগর গ্রামের দুলাল মিয়া, আলখাস মিয়া, মান্না, সাহাজ উদ্দিন, আলী আজগর, খুর্শিদ আলী, ফজলুল হক, বিমল মিয়া, ডালিম মিয়া, কপিল উদ্দিন, মিরাজ উদ্দিন, আলী মর্তুজা, হাফিজ উদ্দিন, জুলহাস মিয়া, জালাল উদ্দিন প্রমুখের পরিবারের গ্রাম ছাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রাম ছাড়ার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এই ৩০ পরিবার আলী আজগর ও হাফিজ উদ্দিন পক্ষের লোক বলে পরিচিত। এদের প্রতিপক্ষ গ্রুপ জয়নাল ও আব্দুল কাদিরের নামে পরিচিত। এই দুই গ্রুপের মধ্যে রেষারেষি, মারামারি ও মামলা মোকদ্দমা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিবদমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষেই কিছু ব্যক্তি আহত হয়। উভয় গ্রুপই মোকদ্দমা করে। সম্প্রতি মোকদ্দমার আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পরই আলী আজগর ও হাফিজ উদ্দিন পক্ষের ৩০ পরিবার গ্রাম ছাড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে ওই পরিবারগুলো ঘরের জিনিসপত্র ও গরু-ছাগল অন্যত্র সরিয়ে নেয়া শুরু করেছেন। ধারণা করা যায়, প্রতিপক্ষ গ্রুপের দাপটের কারণেই এরা গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। অবশ্য গ্রাম ছাড়া গ্রুপের প্রতিপক্ষ দলের একজন আব্দুল কাদির সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, আলী আজগর ও হাফিজ উদ্দিনসহ তাদের পরিবারগুলো জামালগঞ্জ উপজেলার হরিনাকান্দি গ্রাম থেকে ২০/২৫ বছর আগে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এদের বিরুদ্ধে গ্রামে কোন্দল তৈরি ও ঝগড়া বিবাদ লাগানোর অভিযোগ করেছেন আব্দুল কাদের।
একটি গ্রামের ৩০ টি পরিবারের এক যুগে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। নিজের দীর্ঘদিনের বসতি ছেড়ে কেউই অন্যত্র চলে যেতে চায় না। এই বসতির সাথে তাদের জীবন-জীবিকা ও আবেগ অনুভূতির প্রশ্ন জড়িত। এই পরিবারগুলোর অনেক সন্তান এই গ্রামেই জন্মেছে। জন্মভিটা ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো কষ্টদায়ক কোনো বিষয় আর হতে পারে না। নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ এ কাজ করে না। নোয়ানগর গ্রামটি বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়। সুতরাং কেন নোয়ানগরের ৩০ পরিবার গ্রাম ছাড়ছে সেটি খতিয়ে দেখা উচিত স্থানীয় প্রশাসনের। এক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব অগ্রগণ্য। ইউপি চেয়ারম্যানকে এদের সাথে কথা বলে প্রকৃত অবস্থা অবগত হয়ে এই উন্মূল হওয়ার প্রক্রিয়া ঠেকাতে হবে। যদি প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তার কারণে এরা গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়ে থাকেন তাহলে এর পরিণতি সুখকর হবে না। কারণ এতে করে প্রভাবশালীদের দাপট পরবর্তীতে আরও বেড়ে যাবে। একটি গণতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত এলাকায় কোনো গোষ্ঠী বিশেষকে এমন বেপরোয়া আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত করা রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব। নতুবা সবলের কাছে দুর্বলের পীড়ন কখনও বন্ধ হবে না।
গ্রামাঞ্চলে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের কারণে সহিংসতা ঘটে চলেছে বিভিন্ন এলাকায়। গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব যেখানে প্রবল সেখানে রাষ্ট্রীয় আইন ও শৃঙ্খলা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়ে থাকে। একটি সভ্য সমাজে কখনও আইনি কাঠামোর বাইরে যেয়ে কোনো বিশেষ ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোকে বিকশিত হতে দেয়া যায় না। যেকোনো প্রকারে এই অপপ্রবণতাগুলো আটকাতে হবে। এখন এলাকায় এলাকায় পুলিশি কমিউনিটিং সভার আয়োজন করা হয়। আমরা মনে করি এমন দ্বন্দ্ব নিরসনে কমিউনিটি পুলিশিং বিশেষ ভূমিকা রাখাতে পারে। তাহিরপুরের নোয়ানগর গ্রামের একটি পরিবারও যাতে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য না হয় সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

