এনজিও ঋণ আদায় নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টে ফসল হারানোয় সর্বস্ব খোয়ানো জনপদে এনজিও থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধে এনজিওকর্মীদের চাপ প্রয়োগ করার বিষয়টি সামনে উঠে এসেছে। সরকার যাবতীয় ঋণের আদায় কার্যক্রম এক বছরের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে কৃষকদের স্বল্পসুদে পুনরায় ঋণ বিতরণের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে। এরকম অবস্থায় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ফসলহারা গ্রামগুলোতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে অব্যাহত তাগিদ দেয়াটি নিঃসন্দেহে সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী। একটি দেশে যেকোন সংস্থা তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে সরকারি নীতিমালার আলোকে। এরকম অবস্থায় এনজিওবিশেষ যদি গ্রামাঞ্চলে ঋণগ্রহীতাদের উপর কিস্তি পরিশোধের অমানবিক চাপ প্রয়োগ করে থাকেন তাহলে সেটি হবে সরকারের ঘোষণা অমান্য করার সামিল। উপজেলায় উপজেলায় এনজিওদের কাজ তদারকির জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিকে ঋণ আদায়ে এনজিওদের অমানবিক তাগাদা দানের বিষয়টি বন্ধ করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এনজিওরা একটি যুক্তি দেখান, তারা শস্য উৎপাদনের জন্য সাধারণত ঋণ বিতরণ করেন না। বিভিন্ন আয়বর্ধন কর্মকা-ের বিপরীতে তারা ঋণ বিতরণ করে থাকেন। অকাল বন্যায় ফসল হানি ঘটলেও তাদের ঋণের আইজিএগুলো অধিকাংশক্ষেত্রেই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি। সুতরাং আইজিএ’র বিপরীতে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার কোন যুক্তি নেই। তাদের এই যুক্তি আসলে অন্তসারশূন্য। কারণ হলো কৃষি তথা ধান চাষ এই অঞ্চলের এমন একটি খাত যেটির উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য সব বিষয় সম্পর্কিত। কৃষির ক্ষতি হলে আইজিএ ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। মনে করা যাক এবার যে ব্যক্তি গরু মোটাতাজাকরণের জন্য ঋণ নিয়েছেন তিনি তার গরুকে খাওয়ানোর জন্য কোন খড় সংগ্রহ করতে পারেন নি। অন্যদিকে ফসল হারানোয় তার খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্ট হওয়ায় অভাবের তাড়নায় তিনি আইজিএ’র গরু বেঁচে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এখন কোনভাবে বলা সম্ভব হবে ঋণগ্রহীতার আইজিএ ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি? অনুরূপভাবে সকল আয়বর্ধন কর্মকা-ের বেলায়ই এরকম কথা প্রয়োজ্য। সুতরাং ঋণের কিস্তি আদায় থেকে অন্তত একবছরের জন্য এনজিওগুলোকে বিরত রাখাটাই হবে উত্তম।
আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ বিশাল ভূমিকা রাখছে। ক্ষুদ্র ঋনের কারণে গ্রামীণ পটভূমিতে শোষণমূলক মহাজনি প্রথা প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। বন্ধক দেয়ার মতো যে জনগোষ্ঠীর কোন সম্পদ নেই তারাও ঋণ ব্যবস্থার আওতায় এসে মূলধন জোগাড় করে বিভিন্ন পেশা গড়ে তুলার সুযোগ পাচ্ছেন। এই যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনকারী ক্ষুদ্র ঋণ এ নিয়ে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের হতাশার অন্ত নেই। কারণ হলো আমাদের ঋণগ্রহীতা জনগোষ্ঠী নিজস্ব ইচ্ছায় স্বতপ্রণোদিত হয়ে ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসেন খুব কমই। তারা নানা ফন্দিফিঁকির খুঁজেন ঋণ পরিশোধ না করার জন্য। সরকারি সংস্থা কর্তৃক বিতরণকৃত ঋণচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিতরণকৃত ঋণের সিংহভাগ খেলাপী ঋণে পর্যবসিত হয়েছে। এনজিওগুলো কিস্তি পরিশোধে চাপ অব্যাহত রাখে বিধায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাইতে তাদের খেলাপী ঋণ কিছুটা কম। ঋণগ্রহীতা জনগণের এই পরিশোধ না করার মনোভাব পরিবর্তন না হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ঋণ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। আর তখন পুরানো মহাজনি প্রথা আবার ফিরে আসতে পারে তার কদর্য চরিত্র নিয়ে। এই বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।
ফসল হারানো ঋণগ্রহীতাদের সাথে মানবিক আচরণ করার জন্য আমরা এনজিওদের প্রতি অনুরোধ জানাই।

