বৃহস্পতিবার জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার ১২ উপজেলায় ১৯৪টি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সভায় সরকারি কর্মকর্তাগণের বাইরেও সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা দাবি করেছেন, অসময়ে নির্মিত দুর্বল বাঁধই গত বছর ভেঙে হাওরের ফসল ডুবিয়েছে। পিআইসিগুলোতে প্রকৃত কৃষক বা সুবিধাভোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না বলেও অভিমত তুলে ধরা হয়। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের বিষয়টিও উত্থাপিত হয়। এসব দুর্বলতা যাতে এবার পুনরাবৃত্ত না হয় সেজন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। সভায় ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের প্রধান ফসল হলো বোরো ধান। বিশাল হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোরো ধান চাষ করা হয়। এই ধান ভালোভাবে গোলায় উঠলে জেলার কৃষক পরিবারসহ সকলেই সুখে থাকার নিশ্চয়তা পায়। এই ধান দেশের খাদ্য ভা-ারকে সমৃদ্ধ করে। জেলার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই বোরো ফসলের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন। তাই বোরো ফসল আবাদের সময়ে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতিতে জেলাবাসী ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। ২০১৭ সনে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদারি ব্যবস্থায় নির্মিত বাঁধ ভেঙে জেলার শতভাগ বোরো ফসল তলিয়ে গিয়েছিলো। সেসময় কৃষক ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের ফলে সরকার বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথার অবসান ঘটিয়ে পিআইসি প্রথায় সকল বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। কালক্রমে পিআইসি প্রথাটিও দুর্নীতিযুক্ত হয়ে যায়। গতবছর বাাপকভাবে বোরো ফসল হানির জন্য এই দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বল ও অসময়ের বাঁধ নির্মাণকে দায়ী করা হয়। যে বাঁধ পানির সামান্য তোড় আটকাতে ব্যর্থ হয় সে বাঁধের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। ২০১৭ ও গত বছরের অভিজ্ঞতার কারণে এ বছর জেলার উৎপাদন ও অর্থনীতির হৃদস্পন্দন রূপে বিবেচিত বোরো ফসল রক্ষার জন্য এইসব বাঁধ নির্মাণে যাতে কোনো দুর্বলতার সুযোগ না থাকে তাই সকলের কাম্য।
পিআইসিতে বাঁধ এলাকার প্রকৃত কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি ও তাঁদের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করার নীতিমালা রয়েছে যা অনেক সময় কৌশলে এড়িয়ে সুবিধাভোগী ও প্রভাবপুষ্ট ব্যক্তিদের পিআইসিভুক্ত হওয়ার দুঃখজনক বাস্তবতা আমরা দেখি। এইসব ব্যক্তি বাঁধ নির্মাণকালে বাঁধকে ফসল রক্ষায় সক্ষম করে গড়ে তোলার পরিবর্তে নিজেদের লাভ করার বিষয়টিকেই বেশি প্রাধান্য দেন। এই মনোভাবের কারণ্ েসময়মতো বাঁধের কাজ শুরু হয় না, বাঁধের উচ্চতা, প্রশস্ততা, ঢালু ও কমপেকশন ঠিক থাকে না, ঘাস ও বাঁশ লাগানো হয় না। ফলে সামান্য ঢলের পানি নামলেই বাঁধগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। যদি পিআইসি’র সভাপতি ও সম্পাদক পদে বাঁধ এলাকার প্রকৃত কৃষকদের দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে নিজের ফসল রক্ষার কারণে তাঁরা বাঁধ নির্মাণে অতিশয় আন্তরিক থাকবেন। এই কৃষকদের নিয়ে পিআইসি গঠন করা হলে তাদের অগ্রিম টাকা দিতে হবে। কারণ এরা ধার-দেনা করে যদি বাঁধের কাজ করে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়া বাঁধ নির্মাণের পুরো মৌসুমটি কঠোর নজরদারি ও তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। যেকানো ধরনের বিচ্যুতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
জেলা প্রশাসক জেলায় নতুন এসেছেন। তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তথা জেলার প্রধান ফসল বোরো ধানকে অকাল বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে তিনি যথেষ্ট আন্তরিক ও দায়িত্বশীল থাকবেন বলে আমরা আশা করি। সামনে যে মন্দার কথা শোনা যাচ্ছে সেই জায়গায় ফসল উৎপাদনকে সব ধরনের ঝুঁকি মুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই।

