এসএসসি ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছিল জেলার ২২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

বিন্দু তালুকদার
২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া ১২০৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না দিলে ওই সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হবে। রবিবার এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ কথা বলেন।
গত বুধবার এসএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণ ও ভর্তি বাবদ অতিরিক্ত ফি আদায়ে অভিযুক্ত এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিযুক্ত যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক জবাব দেবে না সেগুলোর প্রধান শিক্ষকের এমপিও স্থগিতসহ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা বলা ছিল নির্দেশে।
এ বিষয়ে রবিবার সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা দেশে অভিযুক্ত ৩০৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৩০টি জানিয়েছে তারা গৃহীত অর্থ ফেরত দিয়েছে। আর ৯৯৯টি জানিয়েছে তারা বোর্ড নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ নেয়নি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দাবি প্রমাণিত না হলে সেগুলোর ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠার পর ২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রনালয়ের চিঠি পাওয়ার পর ৪ ফেব্রুয়ারি সিলেট শিক্ষাবোর্ড থেকে চিঠিতে সুনামগঞ্জের ২২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।  
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাবোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সুনামগঞ্জের ২২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় দেয়া অতিরিক্ত টাকা এখনও ফেরত পায়নি। একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন, ফরম পূরণের ফি কত টাকা তা এখনও সঠিকভাবে তাদেরকে জানানো হয়নি।
তবে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন ফরম পূরনের ফি নির্ধারিত হারেই নেয়া হয়েছে। ফরম পূরনের সাথে কোচিং ফি নেয়া হয়েছিল। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে শিক্ষাবোর্ডের চিঠি পাওয়ার পরপরই এবিষয়ে জবাব দেয়া হয়েছে, বোর্ড বিষয়টি ভালভাবে বুঝেছেন। যারা সঠিক জবাব দেননি তারাই পরবর্তী ব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন।
এদিকে বেশ কয়েকজন শিক্ষক উল্টো প্রশ্ন করেন বলেন, প্রায় একই হারে জেলার সিংহভাগ বিদ্যালয়েই ফরম পূরণ ও কোচিং ফি’র অর্থ আদায় করেছে। অথচ শুধুমাত্র প্রধান ২২টি বিদ্যালয়কে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাকী বিদ্যালয়কে কেন এধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি?  
তবে অভিযুক্ত বিদ্যালয়গুলোর পক্ষ নিয়ে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আব্দুল মান্নান খান ও উপ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. মঈনুল ইসলাম দাবি করেছেন, বোর্ডের চিঠি পাওয়ার পর বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দিয়েছেন। তবে তাঁদের এই কথার সত্যতা মিলেনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্যে।
এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া সিলেট বোর্ডের ৪ জেলার ৬০ টি প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত অর্থ আদাকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় সবচেয়ে বেশী সুনামগঞ্জ জেলার ২২টি ও সবচেয়ে কম হবিগঞ্জে মাত্র ৭টি, সিলেটে ১৮ ও মৌলভীবাজারে ১৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা মোতাবেক এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে বিজ্ঞানে ১৫২০ টাকা, মানবিক ও বাণিজ্যে ১৪৩০ টাকা আদায় করার নীতিমালা ছিল। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে সুনামগঞ্জের ২২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৮৪০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায়  করেছিল। অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের তালিকা মোতাবেক সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে অতিরিক্ত আদায় করেছিল ২৫০০ টাকা, মানবিকে ২২৫০ টাকা ও বাণিজ্যে ২৩৩০ টাকা। এভাবে সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানে ২৩০০ টাকা, মানবিকে ২০৫০ টাকা ও বাণিজ্যে ২২০০ টাকা অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে।  সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ২০০০ টাকা, মানবিকে ১৭০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৯৮০ টাকা, চরমহল্লা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৫০০ টাকা, মানবিকে ১৩০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৪০০ টাকা, রঙ্গারচর হারিনাপাটি উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে  ১৫০০ টাকা, মানবিকে ১৩০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৪৩০ টাকা, মঙ্গলকাটা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৬০০ টাকা, মানবিকে টাকা ১৪৫০ ও বাণিজ্যে ১৫৩০ টাকা, পাগলা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৭০০ টাকা, মানবিকে ১৫৫০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৬২০ টাকা, বাদাঘাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৫০০ টাকা, মানবিকে টাকা ১৪৫০ ও বাণিজ্যে ১৪৫০ টাকা, দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৩০০ টাকা, মানবিকে টাকা ১২০০ ও বাণিজ্যে ১২৫০ টাকা, দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৩০০ টাকা, মানবিকে টাকা ১২০০ ও বাণিজ্যে ১২৫০ টাকা, রানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৫০০ টাকা, মানবিকে ১৩৫০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৪০০ টাকা, পাইলগাঁও বি.এন উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৮০০ টাকা, মানবিকে ১৬০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৭০০ টাকা, বিশ্বম্ভরপুর উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ২১০০ টাকা, মানবিকে ২০০০ টাকা ও বাণিজ্যে ২০৫০ টাকা, পলাশ উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ২০৬০ টাকা, মানবিকে ১৮০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১৯২০ টাকা, ধর্মপাশা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১২০০ টাকা, মানবিকে ১০০০ টাকা ও বাণিজ্যে ১০৫০ টাকা, জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ২১০০ টাকা, মানবিকে  ১৯০০ টাকা ও বাণিজ্যে ২০৫০ টাকা, ছাতক বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ১৭৮০ টাকা, মানবিকে ১৫৫০টাকা ও বাণিজ্যে ১৬৬০ টাকা, গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ২৪৮০ টাকা, মানবিকে ২০০০ টাকা ও বাণিজ্যে ২৩০০ টাকা, আমবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় বিজ্ঞানে ৯০০ টাকা, মানবিকে ৬০০ টাকা ও বাণিজ্যে ৭০০ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণ করেছিল।
অভিযুক্ত ২২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কেউই ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নেন নি দাবি করে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুল হক মোল্লা বলেন,‘আমরা ফরম পূরণে কোন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেইনি। বোর্ডের নীতিমালা মেনেই টাকা নেয়া হয়েছে। অভিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিত ফরম পূরণের সাথে সরকার অনুমোদিত বিশেষ ক্লাসের জন্য টাকা নেয়া হয়েছে। এটাকেই অতিরিক্ত টাকা আদায় করার তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কেউ অতিরিক্ত টাকা আদায় করেননি। বোর্ড থেকে আমাদের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছিল। আমরা আমাদের সঠিক জবাব দিয়েছি।’
এ ব্যাপারে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আব্দুল মান্নান খান ও উপ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মঈনুল ইসলাম মুঠোফোনে এ প্রতিবেদকে বলেন, ‘ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়ার পর আমাদের বোর্ডের প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে বলে আমাদের অবগত করেছেন। সুনামগঞ্জের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত ও জবাব দিয়েছে তবে মৌলভীবাজারের ৪টি বিদ্যালয় এখনও অর্থ ফেরত দেয়নি।’
তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন,‘এই বিষয়টি শিক্ষাবোর্ডের অতি গোপনীয়। আমাদের কাছে এধরনের কোন তথ্য নেই। আমি যতদূর জানি সুনামগঞ্জের ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের অর্থ ফেরত দেয়া ও জবাব দেয়ার জন্য মন্ত্রাণালয়ের সচিব ও বোর্ডের চেয়ারম্যান বিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিদ্যালয়গুলো জবাব দিয়েছে । তবে শুনেছি বোর্ড নাকি এতে সন্তুষ্ট নয়।’