ঐতিহাসিক বালিশিরা দিবসের ৫৯তম বার্ষিকীতে বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছ।
২৩ ফেব্রুয়ারি বুধ্বার সন্ধ্যায় কমলগঞ্জের শমসেরনগরস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক অবনী শর্ম্মার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ জেলা কমিটির সভাপতি কবি শহীদ সাগ্নিক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল মোহাইমীন, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা, কৃষক সংগ্রাম সমিতি জেলা কমিটির সদস্য প্রবীণ কৃষকনেতা নাইওয় মিয়া, চা-শ্রমিক সংঘের যুগ্ম আহবায়ক শ্যামল অলমিক, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট কমলগঞ্জ উপজেলা কমিটির নেতা মৃগেন চক্রবর্তী, শ্রমিকনেতা রজত বিশ্বাস ও নারায়ন নাইড়– প্রমুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলার বালিশিরার কৃষকরা পাহাড়ে অধিকার রক্ষার দাবিতে ১৯৬৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাড়ি ফেরার পথে কালিঘাট চা বাগানের সামনে ‘টি ডেভেলাপমেন্ট কমিটির’ মদদে পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করলে টগবগে যুবক ছালিক ও বৃদ্ধ গণু মিয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। নিহতদের লাশও পুলিশ গুম করে ফেলে, শুরু হয় সমস্ত এলাকায় ব্যাপক পুলিশী নির্যাতন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৬৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শিববাড়ি মাঠের এক জনসভায় গণু মিয়া ও ছালিককে শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ একবছর বালিশিরা পাহাড়ে কৃষকদের আন্দোলন চলে।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, দেশে গৃহহীন, ভূমিহীন ও গরীব কৃষকের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে আর অন্যদিকে লুটেরা শ্রেণির সম্পদ ফুলে-ফেপে উঠছে। সার, ডিজেল, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের মাত্রাতিরিক্ত মূল্যের কারণে কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরন্তু বর্তমান দ্রব্যমূল্যেও (চাল ৫০/৫৫ টাকা, ডাল ১০০/১২০ টাকা, সোয়াবিন তেল ১৬৮/১৭০ টাকা, চিনি ৮০ টাকা, পিয়াজ ৫০/৬০ টাকা, মাছ-মাংস, দুধ-ডিমের লাগামহীন ঊর্দ্ধগতি আর শীতের মৌসুমেও শাকসবজি ৪০ টাকার নিচে মিলছে না) কষাঘাতে জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। তার উপর সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ১৫ টাকা এবং সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য ৬২ টাকা বৃদ্ধি করে এখন সর্বক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণ বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে যা আগামী মার্চে গণশুনানির নামে নাটক করে চুড়ান্ত করবে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিরও পাঁয়তারা চলছে। গাড়িভাড়া, লঞ্চভাড়া, বাড়িভাড়া, ঔষুধপত্র, চিকিৎসা ব্যয়ের ধারাবাহিক মূল্য বৃদ্ধিতে জনসাধারণের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি ঘটলেও শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আয় বাড়েনি। সরকার “উন্নয়নের জোয়ারের” কথা বললেও কৃষকের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। অথচ সরকারের মন্ত্রীরা মতো বলে বেড়াচ্ছেন ‘দেশের জনগণ নাকি ঘুমের মধ্যে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে’! সরকার উন্নয়নের যে গালভরা বুলি আওড়াচ্ছে তা মূলত সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির সর্বোচ্চ মুনাফার লক্ষ্যে সড়ক, রেল, নৌপথসহ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ আর সর্বোচ্চ লুটপাট ছাড়া আর কিছুই নয়।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, শ্রেণি বিভক্ত বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রে যে শ্রেণির সরকার ক্ষমতায় থাকে তারা সেই শ্রেণিরই স্বার্থ রক্ষা করে। বাংলাদেশ একটি নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক দেশ। এদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এ যাবত অধিষ্টিত সকল সরকারই হচ্ছে সামন্ত আমলা মুৎসুদ্দি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সরকার। তাই আমলা মুৎসুদ্দি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সরকার কখনোই জনগণের কথা ভাববে নাÑএটাই স্বাভাবিক। জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা দালাল পুঁজি বিরোধী শ্রমিক-কৃষক জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, গরীব কৃষকদের সারা বছর কাজ, কৃষি উপকরণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবের দাম কমানো, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, নদ-নদী, খাল-বিল খনন, ভেজাল সার ও বীজ বিক্রি বন্ধ, সর্বস্তরে সল্পমূল্যে রেশনিং চালুসহ ৭ দফা দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করে চলছে। বালিশিরা আন্দোলনের ঐতিহাসিক শিক্ষাÑ সংগঠিত আন্দোলন ছাড়া বিজয় অর্জন করা যায় না। কৃষকদের স্বার্থে আদর্শ ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলে পরিকল্পিত আন্দোলন সংগ্রামের পথে অগ্রসর হয়ে বিজয় অর্জন করতে হবে।
প্রেসবিজ্ঞপ্তি


