এখন যেভাবে ওএমএস এর চাল-আটা বিক্রির জন্য উপকারভোগীর তালিকা করা হচ্ছে তাকে কোনোভাবেই সুষ্ঠু পদ্ধতি বলার অবকাশ নেই। এক ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং হ-য-ব-র-ল পরিবেশে এই তালিকা করা হচ্ছে। খাদ্য বিভাগ নিয়ম করেছে, যারা লাইনে দাঁড়াবেন তাদের নাম তালিকায় উঠানো হবে এবং এই তালিকা অনুসারে পণ্য বিক্রি হবে। তালিকা করার কাজ করছেন খাদ্য অফিসের লোকজন। ওএমএস এর আওতায় দরিদ্র লোকজনের কাছে স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিক্রির কথা। লাইনে যারা দাঁড়াচ্ছেন তাদের সকলেই যে দরিদ্র তা জানার জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে তা বুঝার অবকাশ নেই। লাইনে দাঁড়ালেই দরিদ্র, এমন এক সরলিকৃত ধারণার বশবর্তী হয়ে আছে খাদ্য বিভাগ। এটি বাস্তবতা বিবর্জিত। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জেলা শহরের পুরাতন বাসস্টেন্ড ওএমএস কেন্দ্র নিয়ে যে প্রতিবেদন করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন দরিদ্র মহিলা তিন দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেননি। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, কিছু লোক লাইন না মেনে অনেকটা গায়ের জোরে সামনে গিয়ে একসাথে অনেকগুলো এনআইডি দিয়ে আসে। খাদ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী অসহায়ভাবে বলেছেন, তারা লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। সামনে যারা আসছে তাদেরই নাম লিখা হচ্ছে। সরকারের স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রির মহতী কর্মসূচিটি নিয়ে এই ধরনের ছেলেখেলা কাম্য নয়।
সংগত কারণেই এলাকার কে গরিব আর কার এই সহায়তায় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা তা খাদ্য অফিসের লোকজনের জানার কথা নয়। এই কাজটি জনপ্রতিনিধিদের করার কথা। নিখুঁত না হলেও আগে অনেকটা এরকমই ছিলো। হঠাৎ করে এখানে কেন পরিবর্তন আনা হলো তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। আর লাইনে দাঁড়িয়ে নাম তালিকাভুক্তির নিয়মটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। লাইনে যে এক পরিবারের একাধিক সদস্য দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন না, একেবারে দরিদ্র পরিবারের বাইরে সংগতিবানরা আসছেন না, একই লোক একাধিক জায়গায় নাম উঠাচ্ছেন না; সেটি কীভাবে যাচাই বাছাই করা হচ্ছে? লাইনের যে ভিড় তাতে কোনো ধরনের যাচাই বাছাই করাই সম্ভব নয়। খাদ্য বিভাগের ওই কর্মচারির কথাই প্রকৃত বাস্তবতা, সামনে যাকে পাওয়া যাচ্ছে তার নামই উঠে যাচ্ছে।
দারিদ্রতা প্রমাণের জন্য কেন লাইনে দাঁড়াতে হবে? এটি কি দরিদ্র ব্যক্তিদের প্রতি চরম অসম্মানজনক নয়? মানুষের দারিদ্রতা নিয়ে এমন মশকরা বুঝি বাংলাদেশেই সম্ভব। অথচ এই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য খুব ভালো পদ্ধতি আছে যা এর আগে বহুবার বহুভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এবং এটি একেবারেই খাঁটি কথা যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই এই তালিকা তৈরি করা উচিৎ। জনপ্রতিনিধিরা কোথাও কোনো ব্যত্যয় করলে সেটি প্রতিহত করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁদের উপেক্ষা করা ঠিক নয়। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের চাইতে আর কারও পক্ষে প্রকৃত দরিদ্র চিহ্নিত করা বেশি সম্ভব নয়। আমরা এর আগেও বলেছি এইসব সহায়তা দানের জন্য কার্ড বিতরণ করা উচিৎ। নির্ধারিত তারিখের আগেই জনপ্রতিনিধিরা এই কার্ড বিতরণের কাজ সেরে ফেলবেন। যাতে ওএমএস পণ্য কিনতে কারও অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে না হয়। দরিদ্র হলেই যে তার হাতে অফুরন্ত সময় থাকবে এমন ভাবা যুক্তিযুক্ত নয়। তিনদিন লাইনে দাঁড়িয়ে তালিকায় নাম উঠানোর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যে পরিমাণ শ্রমঘণ্টার অপচয় হচ্ছে তা বিবেচনায় নেয়া উচিৎ।
দারিদ্রতা নিয়ে এই উপহাস দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিৎ। রাষ্ট্রের কাছে ধনি দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মর্যাদা সমান। এই বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে ওএমএস খাদ্য সহায়তা বিতরণে এই লাইন প্রথা বন্ধ করার জন্য আমরা খাদ্য বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। দরিদ্রদের জন্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্ডের ব্যবস্থা করুন এবং নির্ধারিত তারিখে নির্ঝঞ্ঝাটে তাদের স্বল্পমূল্যে খাদ্য কেনার সুযোগ করে দিন।


