কচুরিপানা মাথায় দিয়ে লুকিয়েছিলেন জমশর আলী

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
ডানপিটে জমশর আলী। শান্তিগঞ্জ উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের মরহুম ওয়ারিশ উল্লাহ ও সমলা বিবি দম্পতির একমাত্র পুত্র সন্তান তিনি। একই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আবদুল মতিন মতলিবের সাথে এক কাতারে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। টগবগে যুবক জমশর আলীর বয়স তখন ২৫ হবে। সুনামগঞ্জ জেলার তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিলেটের কলাপাড়ার লস্কর আলী ওরফে ময়না মিয়ার অধীনে যুদ্ধ করেন তিনি। বীরগাঁও, জয়কলস ও আহসানমারা সেতুতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এই যোদ্ধা। যুদ্ধকালীন সময়ের দুঃসাহসিক অভিযান নিয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। তিনি শুনিয়েছেন যুদ্ধের সময়কার নিদারুণ কষ্ট, নির্যাতন আর যুদ্ধ জয়ের গল্প।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জমশর আলী বলেন, আমরা দেশকে পাকিস্তানমুক্ত করতে পেরেছি এটাই আমাদের স্বার্থকতা। কান্দিগাঁও গ্রামের আমার এক বড় ভাই মরহুম আবদুল মতিন মতলিবকে দেখে আমি যুদ্ধে যাওয়ার সাহস পাই। তিনিই আমাকে সাহস যুগিয়েছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমরা ১৯৭১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে নামি। এর আগে অবস্থা পরখ করছিলাম। তারপর একুয়ান থেকে ভারতের বালাটে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আহসানমারা সেতুতে আমাদের কমান্ডার লস্কর সাহেব পায়ে গুলিবিদ্ধ হলে তাঁকে নিয়ে আমি, মতলিব ভাইসহ বেশ কয়েকজন নৌকাযোগে বালাটে চলে যাই। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসার পর বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। এতে জয়কলস উজানীগাঁও গ্রামের বাসিন্দা, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সত্তার মিয়া ও আমার ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন রাজাকার মতলিব ভাইসহ আমাদের উপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়। পরে আমাদের বাড়িতেও তারা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বুধবার রাতে তারা মতলিব ভাইর বাড়িতে হামলা করবে এমন খবর আসে আমাদের কাছে। আমরা পরিবারসহ নিজেরা নিরাপদে সরে যাই, কিন্তু রাতে হামলা না করে তারা হামলা করে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারে বিকালে। আমাদের এলাকার এক রাজাকারের নেতৃত্বে হামলা হয়। মতলিব ভাইর সম্পূর্ণ ঘর জ্বালিয়ে দেয়। পরে লোকমুখে শুনেছি, মিলিটারিরা বার বার বলছিলো- ‘আওরত কিদার হ্যায়’। এরপরই তারা আমার বাড়িতে আসে। অনেক খুঁজাখুঁজি করেছিলো আমাকে আর মতলিব ভাইকে। বাড়ির পেছনে আমাদের এক পুকুরে আমি কচুরিপানা মাথায় দিয়ে লুকিয়েছিলাম। মতলিব ভাই কোথায় ছিলেন ঠিক মনে নেই। জোঁকে অনেক রক্ত খেয়েছিলো। আমার বোকামির জন্য মতলিব ভাই অনেক বকেছিলেন আমাকে।
আমার ঘরে কিচ্ছু রাখেনি কাফের-মুনাফিকেরা। সকল ধান, কাপড় চোপড় ও ট্রাঙ্ক নিয়ে গিয়েছে। এসব দিনের কথা মনে হলে গা শিউরে উঠে। তবে এখন দুঃখ নেই, প্রতিটি রাজাকারকে বের করে শাস্তি দিচ্ছেন শেখের বেটি হাসিনা। ধন্যবাদ দেই তাঁকে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিলো বিজয়ের দিন। বিবিসি বাংলা বার বার শুনেছি। ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই যখন শুনছিলাম দেশ স্বাধীন হচ্ছে, তখন আমাদের খুশি আর দেখে কে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা দেশ ছেড়ে চলে যায়। আমরা পাই লাল সবুজের পতাকা। গর্বে সেদিন বুকের চাতি ৫৬ ইঞ্চি বড় হয়েছিলো।