করোনাকালেও বহমান অনিয়ম ও তাহিরপুরের রাস্তা ভেঙে পড়া

করোনাময় পৃথিবীতে এখন আর সব কিছুই যেন গৌণ হয়ে পড়েছে। করোনা ছাড়া যেন কথা বলার আর কোনো প্রসঙ্গ নেই। অথচ দুনিয়া সেই আগের দুনিয়াই আছে। আমাদের বাংলাদেশ ২০১৯ সনের বাংলাদেশের মতোই আছে। করোনাহীন সময়ে যতসব অনুষঙ্গ আমাদের নিত্যসঙ্গী ছিল তারা কেউই সঙ্গ ছাড়েনি। অথচ আমরা করোনাবিষাদে এতটাই আকুল ব্যাকুল যে সেই সঙ্গীদের কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি। সঙ্গীরা কিন্তু বসে নাই। সকলেই আপন আপন মহিমা দেখানোর পারদর্শিতা প্রদর্শনে এতটুকু বিরতি দেননি। বরং করোনাকে তারা নিজেদের জন্য প্রকৃতির কর”ণায় পরিণত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। যারা বলেছিলেন করোনাত্তোর পৃথিবী হবে অনেক বেশি উদার, সহনশীল, নীতিনিষ্ঠ ও সমদর্শী তারা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। কিছুই পরিবর্তন হয়নি, কিছুই পরিবর্তন হবে না। আসলে পরিবর্তনের জন্য কোনো মহামারী পূর্বশর্ত হতে পারে না। পরিবর্তন নির্ভর করে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি আদর্শের উপর। করোনায় তো সারা পৃথিবীতে মাত্র চার লাখের উপর মানুষ মরেছে। কিন্তু অসম রাজনীতি অর্থনীতির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বিতারণ, দ্বেষ, হিংসা প্রভৃতি কারণে কতো মানুষ মারা যায় সেই হিসাব করলে করোনা মৃত্যুকে নেহায়েতই কিঞ্চিৎকর মনে হবে। আর মহামারী করোনাও মানুষের দুর্বিনীত আচরণেরই পরিণতি। প্রকৃতি তখনই সংহার মূর্তি ধরে যখন মানুষ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করায় নিয়োজিত হয়।
করোনা যে ইতিবাচক শিক্ষার দূত হয়ে আসেনি তার ক্ষুদ্র একটি নিদর্শন দেখা গেল সোমবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের এক সংবাদে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের ২৩০ মিটার মাত্র অংশ ঠিকাদারের নিম্নমানের কাজের ফলে বছর বছর ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ২৩০ মিটার অংশ আনোয়ারপুর বাজার সেতুর পূর্বাংশে অবস্থিত। সড়কের এই জায়গা দিয়ে পাহাড়ি জাদুকাটা নদী প্রবাহিত। পাহাড়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে এই নদী খর¯্রােতা রূপ ধারণ করে। পানির তীব্র চাপে সড়ক ভেঙে যায়। তাই সড়কের এই অংশে বিশেষ ডিজাইন অবলম্বন করে কাজ করতে হয়। কিন্তু ঠিকাদার সেইভাবে কাজ না করেই বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এলজিইডির সহায়তায় পুরো বিলের টাকা তুলে নিতে সক্ষম হন। যেকোনো ভৌত কাজের একটা আয়ুষ্কাল নির্ধারিত থাকে। ওই সময়ের মধ্যে ক্ষয় ক্ষতি হলে ঠিকাদারকেই তার দায় বহনের কথা। কিন্তু আলোচ্যক্ষেত্রে দেখা গেল, ২০১৮ সনে সম্পূর্ণ কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তোলা হলেও সড়কের ওই ২৩০ মিটার অংশ ওই বছরই ভেঙে যায়। এজন্য ঠিকাদারকে কোনো দায়িত্ব নিতে হয়নি। উপরন্তু একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি টাকা খরচে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত ওই অংশ পুনরায় মেরামত করার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে মাস কয়েক আগে। তিরস্কারের বদলে পুরস্কার, সাজার বদলে উপঢৌকন দেয়ার এই রীতি সত্যিই চমৎকার বটে। এবারও ঠিকাদার কর্তৃক প্রাক্কলন অনুসরণ না করে নিজের ইচ্ছামত কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, তাহিরপুর এলজিইডির অবহেলাকে দায়ী করেছেন। কিন্তু ঠিকাদারের তাতে থোরাই কেয়ার। তিনি জামাই আদর পাচ্ছেন সুতরাং কে তার অনিয়ম ঠেকায়। এই ঠিকাদার বা তার পৃষ্ঠপোষকরা করোনাক্রান্তিকে পরোয়া করেন না। তারা বীরদর্পে সরকারি অর্থ লুণ্ঠন করাকেই পরম ধর্ম মনে করেন।
তাতে তাহিরপুরের সাথে দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও কারও কিছু আসে যায় না। সংবাদভাষ্য অনুসারে তাহিরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সিলেট যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে ওই জায়গার ভাঙার কারণে পুনরায় তাহিরপুর ফিরে যেতে হয়েছে। এই দৃশ্য দেখে ঠিকাদার দূর থেকে মুচকি হেসেছেন বলে অনুমান করা যায়। কারণ তার হাত অনেক লম্বা। একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার গন্তব্যে যেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরতেই পারেন কিন্তু অনিয়ম রোধ করতে পারবেন কি?