মীর মোশারফ হোসেন
গত ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে করোনার যে ঢেউ শুরু হয়েছিল তা আজ সারা পৃথিবীতে মহামারি আকারে বিরাজ করছে। প্রতিনিয়ত রূপ এবং স্বভাব পরিবর্তন করতে করতে করোনা তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। পৃথিবীবাসীও তাদের মেধা ও যোগ্যতা সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ইতোমধ্যেই করোনা আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে প্রায় দুই মিলিয়নের মতো লোক।
প্রসঙ্গত গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা হয়। ক্রমেই করোনার বিস্তার বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যাপক প্রাণ নাশের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বছরের মার্চ মাসে এই করোনা সংক্রমনকে মহামারি হিসাবে ঘোষণা করে বিশ্ববাসীকে সতর্কবার্তা প্রদান করে। এই প্রেক্ষিতে বেশ কিছু নির্দেশনাও প্রদান করে।
করোনা যখন থেকে তার যাত্রা শুরু করেছে তখন থেকে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক ডাক্তার, বিজ্ঞানী, ভাইরোলজিস্টগণ বিভিন্নভাবে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে সতর্কতামুলক পদক্ষেপ নিতে তাগাদা দিচ্ছিলেন। বিশেষ করে বিদেশ ফেরত কিংবা অন্য দেশের নাগরিকদের দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্কতামুলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার তার সাধ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছিল।
ফেব্রুয়ারিতে যখন বিদেশ থেকে দেশীয় নাগরিকেরা দেশে ফিরতে শুরু করল তখন সরকার কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যায়ও পরেছে। যারা বিদেশ থেকে ফেরত আসছিল তাদেরকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামুলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তা বিভিন্ন কারনে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকার বিদেশ ফেরত নাগরিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ জারি করে। একই সাথে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করে। প্রাথমিকভাবে এভাবেই সরকার বেশ কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অবশ্য তখনও পর্যন্ত করোনার ভয়াবহতা এদেশের মানুষ আমলে নেয় নাই। বলা যায় বেশ খানিকটা অবহেলাই করেছে। সরকারি কিংবা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কানে নেয় নাই।
এই অবস্থা চলাকালীন সময় বাংলাদেশে চলতি বছরের মার্চের ৮ তারিখে সর্বপ্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। দিনে দিনে সংক্রমনের হার বাড়তে থাকে। এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংক্রমন যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য সরকার মার্চ মাসের ১৭ তারিখ সারা দেশে লকডাউন জারি করে। জোর দেওয়া হয় সন্দেহভাজন রোগীদের পরীক্ষার উপর।
২০২০ এর মার্চের ১৯ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম কোন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়। শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। নড়েচড়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষ। সচেতন নাগরিকেরা চলাফেরায় সংযমী হতে শুরু করে। সারা দেশের ডাক্তার, নার্স, আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপর হয়ে উঠে। হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ সতর্কতা। কিছু হাসপাতালকে করোনার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। স্থাপন করা হয় করোনা পরীক্ষার ল্যাব। আমদানি করা হয় করোনা পরীক্ষার কীট।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংক্রমনের হার বিবেচনায় বিভিন্ন নামে ও রঙে চিহ্নিত করা হয়। দফায় দফায় লকডাউন করে সংক্রমন কমানোর চেষ্টা চলে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়।
এরপর থেকেই সারাদেশে করোনা আতংক বাড়তে থাকে। সচেতন নাগরিকগণ তাদের সাধ্যানুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি পালন করতে শুরু করে। আর বাকীদের সচেতন করার জন্য প্রশাসন মাঠে নেমে পড়ে। বিভিন্নভাবে মানুষকে সচেতন করতে চেষ্টা করে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করে। এই ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়।
তারপর সারা দেশে সাধারণের চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা হয়। যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় সকল কারখানা। মাস্ক পরা ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়। শুরু হয় নানাবিধ সংকটের।
এই করোনাকে কিছু দুষ্ট, অসৎ, লোভী, দুর্নীতিবাজ অবৈধ টাকা রোজগারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। কিছু হাসপাতাল ভুয়া রিপোর্ট ও নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে রোগীর কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ লুটে নেয়। সরকারের সরলতার সুযোগ নিয়ে সাহেদ, সাবরিনা ও আরিফের মতো লোকেরা শুরু করে লুটপাট। ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে দেশে বিদেশে দেশের সুনাম ক্ষুন্ন করে। কতিপয় অসৎ, দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি সরকারি বরাদ্দের টাকা ও মালামাল লুটপাট শুরু করে। সরকার তা শক্ত হাতে দমন করে। এতে অনেকের পদ, পদবি ও চাকরি চলে যায়।
এক পর্যায়ে আতংক করোনা সংক্রমনের মাত্রাকে অতিক্রম করে। সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে জনমনে বেশ বিভ্রান্তি দেখা দেয়। আতংকের আতিশয্যে মানুষ মৃত্যুর ভয়ে মানবিক অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়ে উঠে যায়। সন্দেহভাজন অসুস্থ আপনজনদের অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যাওয়া থেকে মৃত আপনজনদের লাশ যেখানে সেখানে ফেলে রেখে চরম অমানবিকতার পরিচয় দিতে শুরু করে।
করোনা ভাইরাস আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মাস্ক, কোয়ারেন্টিন, হ্যান্ডওয়াশ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, আইসোলেশন, অক্সিমিটার, সোশাল ডিস্টেন্স, লকডাউন, পিপিই ইত্যাদি শব্দ আমাদের দৈনন্দিন শব্দভান্ডারে যুক্ত হয়েছে। আমরা এখন কথায় কথায় এইসব শব্দ ব্যাবহার করতে শিখেছি। আমরা শিখেছি মাস্ক ব্যাবহারে অভ্যস্থ হতে, নিরাপদ থাকার জন্য বিশ সেকেন্ড ধরে সাবান কিংবা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে বারে বারে হাত ধুতে। আমরা আরও শিখেছি কিভাবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। প্র্রয়োজনে কোয়ারেন্টিনে থাকতে অভ্যস্ত হতে শিখেছি।
করোনা আমাদেরকে শিখিয়েছে চরম বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। একই সাথে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা করতে শিখিয়েছে। মানুষের চরম দুর্দিনকেও যে মানুষ সুযোগ হিসেবে নিয়ে অবৈধ ফায়দা লুটতে পারে তা বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে। সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ এদের মতো মুখোশধারী লোকদের মুখোশ উম্মুচিত করেছে। স্বাস্থ্যখাতে সীমাহীন দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করে আমাদেরকে সচেতন হতে শিখিয়েছে।
করোনা আরও শিখিয়েছে কিভাবে আরও বেশি মানবিক হওয়া যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মানুষ মানুষের জন্য কতটা নিবেদিত হতে পারে সেটাও আমাদের শিখিয়েছে করোনা। আমরা দেখেছি বেশিরভাগ ডাক্তার, নার্স, ল্যাব-টেকনিশিয়ান, হাসপাতালের কর্মচারীরা, পুলিশসহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়েছে। সৎকার করেছে স্বজনদের ফেলে রেখে যাওয়া করোনায় মৃত লাশ। রাতের আঁধারে শসানে কিংবা কবরস্থানে গিয়ে মৃতদেহের সৎকার করেছে অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই করোনা আক্রান্ত্ রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অনেকে করোনা আক্রান্ত্ হয়ে মারাও গিয়েছেন।
করোনা আমাদেরকে জাত ধর্ম ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। আমরা দেখেছি দেশপ্রেমিক সামর্থ্যবান নাগরিকেরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে চলে গেছে অসহায় মানুষের দ্বারে দ্বারে। আমরা দেখেছি অনেক স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনকে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ভুখা মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতে। আবার এমনও দেখেছি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজনীয় খাবার, সবজি, পোশাক রেখে যেতে যাতে প্রয়োজনে অসহায় মানুষকে কারো কাছ থেকে চেয়ে নিতে না হয়। আমরা দেখেছি পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীর লোকেরা নিজেদের কাঁধে খাদ্যসামগ্রী বয়ে নিয়ে অসহায় মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। আর সরকারের কথাতো বলাই বাহুল্য। একটা দেশের সরকার কতটা জনবান্ধব হতে পারে সারা বিশ্বে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। এইসব ভাল শিক্ষাই দিয়েছে আমাদেরকে এই করোনা।
এতো গেলো করোনার শিক্ষার কথা। এবার আসা যাক শিক্ষার করোনার প্রসঙ্গে। লকডাউনের প্রথম দফায়ই অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থগিত করে দেওয়া হয় চলমান এবং আসন্ন সমস্ত পাবলিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা। এভাবেই শুরু হয় শিক্ষায় করোনার আক্রমন।
করোনা সংক্রমন ছড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে গত মার্চ মাসের ১৮ তারিখ থেকে পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে সকল প্রকার শ্রেণি কার্যক্রম ও আভ্যন্তরীন পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়া হয়। তখন চলছিল সম্মান চতুর্থ বর্ষের (শেষ বর্ষ) পরীক্ষা। কিছু পরীক্ষা বাকী রেখেই পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এপ্রিলে অনুষ্ঠিতব্য এইচ, এস, সি পরীক্ষা স্থগিত করা হলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য। পরিপূর্ণ প্রস্ততি শেষ করেও শিক্ষার্থীদের দেওয়া হলো না এইচ, এস, সি পরীক্ষা।
অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিকল্প শ্রেণিকার্যক্রমের অংশ হিসেবে শুরু হয় কেন্দ্রীয়ভাবে দুরদর্শনে পাঠদান কর্মসুচী চালু করা হয়। চেষ্টা করা হয় শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার। এই সুবিধাও সকলের পক্ষে গ্রহণ করার সুযোগ হয় নাই। তারপর শুরু হলো প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের অনলাইন পেইজ। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নিজস্ব অনলাইন পেইজ থেকে শ্রেণিকার্যক্রমে অংশগ্রহনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সুবিধাটাও অনেকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয় নাই। দেখা গেছে বিনামূল্যের কিংবা স্বল্পমূল্যের (প্রতিমাসে ২০ থেকে ২০০ টাকা) ক্লাস দেখতে একজন শিক্ষার্থীকে একটি ভাল এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ করতে হয় যা অনেক অবিভাবকের পক্ষেই সম্ভব না। তারপরও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অনেকেই বাধ্য হয়ে শিক্ষার এই বর্ধিত ব্যায় জোগাড় করেছে।
এই পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশ আলোচনা, সমালোচনা হয়। বেশকিছু প্রস্তাবও দেওয়া হয়। বিস্তর চিন্তাভাবনা করে নীতিনির্ধারকগণ ঐক্যমতে পৌঁছতে না পারায় পিইসি, জেএসসি, জেডিসি, এইচ, এস, সি পরীক্ষা না নিয়ে সকলকে অটোপাশ ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করা হয়।
অপরদিকে ১ম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে ঘরে বসে পরীক্ষা এবং ৬ষ্ঠ, ৭ম, নবম শ্রেণির ছাত্রদেরকে এসাইনমেন্ট ম্ল্যূায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সকল পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষার ঘোষনা দেয়। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমাপ্ত পরীক্ষাগুলো নেওয়ার সময়সূচী ঘোষণা করে। এর পরপরই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের অসমাপ্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সময়সূচী প্রকাশ করে।
করোনা সংক্রমনের শুরু থেকেই করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। এই ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি করেছে। অনেক ট্রায়ালের পর কিছু ভ্যাকসিন উত্তীর্ণ হয়েছে। ভ্যাকসিন বিপনন ও বিতরণও শুরু হয়ে গেছে। ফলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। শিক্ষ্ক শিক্ষারথীরা তাদের প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন্ দেখছে।
অন্যদিকে আগামী ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হবে বলে জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষজ্ঞগণ দ্রুততম সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অবিভাবক নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করায় অনেকেই চরমভাবে হতাশ হয়েছে।
শিক্ষা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে দেশের চরম ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কত সময় লাগবে তা অনুমেয় নয়। শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সাধারণের অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষা খরচ বেড়েছে কয়েকগুন। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যায় বৃদ্ধির হার শতগুন। শারীরিকভাবে করোনা আক্রান্ত না হলেও মানষিকভাবে শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে গেছে। অনেকে ইতোমধ্যেই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেছে। হার বেড়ে গেছে বাল্য বিবাহের।
আর বন্ধ হয়ে গেছে অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আয় না থাকার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা বেতন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষক জীবন বাঁচাতে পেশা পরিবর্তন করে হয়েছে ক্ষুদে ব্যবসায়ী কিংবা দিনমজুর।
অনেক ব্যাবসা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রকাশনা কোম্পানী থেকে শুরু করে লাইব্রেরী এন্ড স্টেশনারী ব্যবসা মুখ থুবরে আছে। এইসব প্রতিষ্ঠান খুলা থাকলে প্রতিদিন টিফিন বিক্রি করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হতো অনেক পরিবহন। যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত চালক হেল্পারদের আয়ও কমে গেছে অনেকাংশে। আরও অনেকে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নিম্নশ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে তাদের খরচ নির্বাহ করতো। তাদের আর শহরে থাকা হলো না। অনেক কোচিং সেন্টার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করিয়ে আয় করতো। তাদের আর কোন বিকল্প রইলো না।
পোশাক তৈরির দোকানগুলো কিংবা তৈরি পোশাক বিক্রির দোকানগুলোও সারাবছর ব্যস্ত সময় কাটাতো এই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরি কিংবা বিক্রি করে। তারাও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
শিক্ষা করোনা আক্রান্ত হওয়ার প্রভাব জীবনের সকল স্তরে পরেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে পারিবারিক সম্পর্কের ঘাটতি হয়েছে অনেকগুণ। শিক্ষার্থীদের আচার-আচরণে অনেক অনাকাঙ্খিত নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ঘরে বন্ধি থাকার ফলে, বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের মানষিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। আয়ের স্বল্পতার কারণে কিংবা আয়ের উৎস বন্ধ হওয়ার কারণে অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ন্যূনতম প্রয়োজন মিটানোই যেখানে কঠিন সেখানে প্রিয়জনদের ছোটখাট আবদার মিটানোও এখন দু:সাধ্য সুকঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার করোনা দূর করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার এই করোনা সারানোর একমাত্র উপায় হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া। শিক্ষার করোনা দুর করতে পারলে খুলে যাবে আরও অনেক সমস্যার জট। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে। সসচল হয়ে উঠবে শিক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। আরও জোরে ঘুরবে অর্থনীতির চাকা। দুর হয়ে যাবে অনেক সমস্যা। প্রজন্ম এগিয়ে যাবে অনেক দুর।
লেখক: প্রভাষক (ইংরেজি), জামালগঞ্জ কলেজ, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ।


