করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার এবার রেড, ইয়েলো ও গ্রীন জোন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। হয়তো আজ কালের মধ্যেই এ সংক্রান্ত নির্দেশনা চলে আসবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরণের জোন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে নিশ্চয়ই এ সংক্রান্ত নির্দেশনায় অগ্রসর কিছু ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত হবে। মূলত জীবন ও জীবিকার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনতেই এই ব্যবস্থা। এ হলো মন্দের ভাল। যতটুকু জানা গেছে তাতে সিটি ও জেলা উপজেলাগুলোতে প্রতি এক লাখ লোকে আক্রান্তের ন্যূনতম সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। আক্রান্তের সংখ্যা এই ন্যূনতম সংখ্যার উপরে উঠলেই সংশ্লিষ্ট এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করা হবে। এইভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় ইয়েলো ও গ্রিন জোন নির্ধারিত হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই জোনগুলি নির্ধারিত হবে। মূলত শনাক্ত ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর ও বাসস্থানের তথ্য ব্যবহার করে এই জোন নির্ধারিত হবে। রেড জোনগুলোকে তিন সপ্তাহের কঠোর লকডাউনে আনা হবে বলে জানা যায়। রেড জোনগুলোর বাইরে ইয়েলো জোনে সীমিত আকারে ও গ্রিন জোনগুলোতে সতর্কতাসাপেক্ষে কিছু কাজকর্ম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। এইভাবে অর্থনৈতিক কর্মকা- কিছুটা চালু রাখার ব্যবস্থা করা হবে। তবে যেহেতু এখনও সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো পরিপত্র জারি হয়নি তাই রঙ ভিত্তিক এই ব্যবস্থাপনার স্বরূপ কেমন হতে পারে তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার হওয়ার পর যখন করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে তখন সরকারের এই নতুন চিন্তা মহামারী নিয়ন্ত্রণে আদৌ কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় কিনা সকলেরই দৃষ্টি এখন সেই দিকে।
তবে এই ধরণের ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন, তদারকি ও কার্যকর রাখা জটিল ও কঠিন বিষয়। বিশেষ করে আমাদের ঘনবসতিসম্পন্ন নগর, মহানগর ও শহর-বাজারগুলোতে বাস্তবায়ন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসবে। ধরা যাক ঢাকা মহানগরীকে ১০০ টি অঞ্চলে ভাগ করা হলো। এখন আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় ২০ টি অঞ্চলকে রেড জোন নির্ধারণ করে লকডাউন কার্যকর করা হলো। রেড জোনভুক্ত অনেক ব্যক্তির কর্মস্থল ইয়েল বা গ্রিন জোনে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে কি রেড জোনের মানুষ অন্য জোনের কর্মস্থলে যাবেন? সরকারি বেসরকারি অফিসগুলো তাদের রেড জোনভুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে কী নীতিমালা নির্ধারণ করবেন? রেড জোনের অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের লকডাউন কালের জরুরি প্রয়োজন তথা খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে কীভাবে? এমনও হতে পারে এক গ্রিন জোন থেকে আরেক গ্রিন জোনে যেতে মাঝখানে এক বা একাধিক রেড জোন পড়েছে। এখন এই জায়গায় চলাচলের নিয়মই বা কী হবে?
মহানগরের বাইরে জেলা বা উপজেলা পর্যায়েও একই সমস্যা দেখা দিবে। জনসংখ্যা বিবেচনায় কোনো জেলা বা উপজেলা হয়তো রেড জোন হওয়ার শর্ত পূরণ করেছে কিন্তু আক্রান্তরা রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সেক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলার কোন্ অংশ লকডাউনে থাকবে? এই ধরণের আরও নানা জটিলতার উদ্ভব হবে। উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সমাধান রূপ কী হবে সে নিয়েও জনমনে রয়েছে বিভিন্ন প্রশ্ন।
যে কোনো নতুন ব্যবস্থাপনাই প্র্যাকটিস এন্ড এ্যারর মেথডের মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণতা লাভ করে। তবে করোনা মহামারীর ক্ষেত্রে এই ধরণের পদ্ধতির প্রয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। শতভাগ লকডাউনেও যেখানে শতভাগ সফলতা দেখানো সম্ভব হয়নি সেখানে এই আংশিক লকডাউন পর্ব নিয়ে সংশয় থাকা খুবই স্বাভাবিক। নতুন ব্যবস্থাপনায় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত রাখা হবে বলে জানা গেছে। এটি ভাল সিদ্ধান্ত। জনপ্রতিনিধিদের জনতুষ্টির উর্ধে উঠে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোরও হতে হবে। তবে সবচাইতে বেশি দরকার আন্তরিকতা। মহাদুর্যোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলেই সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা দেখিয়ে জাতির মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম হবেন এমনটাই আমরা আশা করি।

