কাঁচা বাজারের পথেই দোকানপাট/ চলাচলে ভোগান্তি শহরবাসীর

বিশেষ প্রতিনিধি
শহরের কাঁচা বাজার, মাছ বাজারে যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় শহরবাসীকে। পথে পথে বসা দোকান, মালামাল বহনকারী ঠেলা, রিক্সা, পিকআপের ধাক্কা সয়েই নিত্যপণ্য কিনে আনতে হয় হাজার হাজার ক্রেতাকে। অথচ মাছ বাজারের পাশেই জেলা প্রশাসকের এক নম্বর খতিয়ানের ৪০ শতকেরও বেশি ভূমি বেদখল হচ্ছে। ময়লা আবর্জনার স্তুপ ওই ভূমিতে। কিছু ভূমি দখলও হয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের পুরাতন জেল রোড এলাকার সড়কে বসা সবজি বিক্রেতা এবং পাশের জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানের ভূমিতে হওয়া চাপড়া ঘরগুলো থেকেই মোরগ কিনে থাকেন পৌর এলাকার ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
সকাল সাত টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এই এলাকার সড়ক গুলোতে ক্রেতাদের ভিড় থাকে। বাজার শেষ করে স্বস্তিতে ফিরেন না কেউ-ই।
ভিড় ঠেলে শনিবার বাজার করছিলেন শহরের শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা রূপা চৌধুরী। বললেন, সপ্তাহে একদিন বাজারে আসা। মাছ, সবজি ও মোরগ কেনার সময় রীতিমত ধাক্কাধাকি করা লাগে। পরে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বহু জায়গা হেঁটে রিক্সায় ওঠতে হয়। এই ভোগান্তি বহুদিনের।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. মল্লিক মঈন উদ্দিন সোহেল বললেন, ছুটির দিনে বাজারে আসি, এখানে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচা বাজার করার উপায় নেই। পাশেই সরকারি ভূমি আছে। ওখানে একটি বড় কাঁচা বাজার হলে এই ভোগান্তি কমতো।
জেলরোডের মূল সড়কে বসে সবজি বিক্রি করেন মিনহাজ মিয়া। বললেন, সরকারের ভূমিতে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। কেউ কেউ দখলও করে আছে অনেক জায়গা। অথচ আমরা দোকানীরা বসার জায়গা পাই না। পথের দোকানী সুমন মিয়া ও খোকন মিয়া একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
মোরগ বিক্রেতা রশিদ মিয়া বললেন, ‘মেঘে ভিজি রইদে (রোদে) হুকাই। কিতা (কী) করমু (করবো) বাছাতো (বেঁচে থাকাতো) লাগবো। কত বছর ধইরা (ধরে) বাজারও মোরগ লইয়া আইয়া (আসি) বাইরে বইয়া বেছি (বিক্রি করি), কেউ কোন ব্যবস্থা করে না।’
শনিবার সকালে জেলরোড এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সড়ক দিয়ে হাঁটার উপায় নেই। সড়কজুড়েই দোকান। বাজারে রিক্সা নিয়ে ঢোকা যাচ্ছে না। মোটর সাইকেল নিয়েও ঢোকা দায়।
পাশেই জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানের ভূমিতে ঘর তৈরির জন্য মাটি খনন করছেন কিছু শ্রমিক। এটি কারা করছে, জানতে চাইলে একজন বললেন, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসন এটি করাচ্ছে। নির্মাণ কাজ দেখভাল করছেন সাইফুল হক নামের একজন ব্যবসায়ী। সাইফুল হক বললেন, পৌরসভার নির্দেশে আমরা আধাপাকা ছাপড়া ঘর তৈরি করছি।
সাইফুল হকসহ মোরগ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানালেন, পান, সুপারি, সবজি ও মোরগ বিক্রেতাদের বাজারে বসার কোন স্থাপনা নেই। যে যেখানে পারে বসে। এজন্য বাজারে শৃঙ্খলা নেই। আমরা যেখানে বসি এটি জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানের ভূমি। ওখানে টিনের ছাপড়া বানিয়ে বহুদিন হয় বসছেন মোরগ বিক্রেতারা। কয়েকদিন হয় পৌর মেয়র ও জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে ওখানে টিনের ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছেন তারা। নিজেরা ঘর তৈরি করলেও পৌরসভাকে ভাড়া দিয়ে ওখানে বসবেন তারা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আনোয়ার হোসেন জানালেন, পুরাতন জেলের পাশে ৪০ শতাংশ ভূমি আছে জেলা প্রশাসকের এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত। ওই জমিতে সরকারি কোন স্থাপনা নেই।
ওই অফিসের দায়িত্বশীল আরেকজন কর্মচারী বললেন, জেল রোডের পাশের জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানভুক্ত ওই ভূমি নিয়মমাফিক বন্দোবস্ত নিয়ে পৌরসভা বাজার তৈরি করতে পারে। তাতে পৌরসভার আয় বাড়ে, মানুষেরও ভোগান্তি কমে।
ওই কর্মচারী জানালেন, ওখানে দুটি দাগে (নম্বর ৩৯১ ও ৩৯৫) ৪০ শতকের মত জেলা প্রশাসকের একনম্বর খাস খতিয়ানের লায়েক পতিত শ্রেণির ভূমি আছে। ওই ভূমি পৌরসভার প্রয়োজনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট বন্দোবস্ত পাবার আবেদন করতে পারে। এই আবেদন জেলা প্রশাসক পাঠাবেন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নিকট। সহকারি কমিশনার ভূমির বাজার মূল্য যাচাই করে জেলা প্রশাসকের নিকট প্রস্তাব পাঠাবেন। জেলা প্রশাসক সেটি ভূমি মন্ত্রণালয়ে অগ্রবর্তী করবেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে পৌরসভা সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেবেন। পরে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে। ওই কর্মচারী জানালেন, জমি যেহেতু সরকারের কোন কাজে লাগছে না, পৌরসভা চাইলে নাগরিকদের প্রয়োজনে অবশ্যই পৌরসভা এই ভূমি বন্দোবস্ত পাবে।
জনভোগান্তির বিষয়ে পৌর মেয়র নাদের বখ্তের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বললেন, সবজি বাজার ও মোরগ বাজারে যেতে পথে পথে দোকান থাকায় চলাচলে মানুষের সমস্যা হয়। আবার দোকানীদেরও বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় জেল রোডের পাশের জেলা প্রশাসনের জমিতে অনুমতি সাপেক্ষে মোরগ ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সেড তৈরি করা হচ্ছে। ওই জমি বন্দোবস্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সকলের সহযোগিতা চাইবো। জমি বন্দোবস্ত পেলে কাঁচা বাজার এলাকার সকল দোকানীদের জন্য স্থায়ী মার্কেট নির্মাণ করে দেওয়া যাবে।