কিছু কথা কিছু স্মৃতি

জেসমিন আরা বেগম
সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ বৎসর পূর্তি উৎসব অর্থাৎ হীরক জয়ন্তী উৎসব। আহ্বায়িকা আমার বড় বোন শাহানা রব্বানী যখন এই উদ্যোগ নেন এবং আমাকে ফোনে বলেন, তখন একটু রাগই করেছিলাম ‘আর কোন কাজ পাও নাই আমাদের জন্যে কাজ বাড়াও?’ ‘‘বলে ধমকও দিয়েছিলাম। তার কারণও ছিলো। সদ্য সমাপ্ত জুবিলী স্কুলের ১২৫ বর্ষ পালনের উদ্যোক্তাদের আমি কাছ থেকে দেখেছি মতিউর মামা, হারু মামাদের সেই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, আমার বাসায় বসে তাদের সেই দীর্ঘ কর্মপদ্ধতি বণ্টনের বিড়ম্বনা, টাকা যোগাড় থেকে শুরু করে কাগজের পাতা যোগাড়ের ধকল সামলানো দেখেছি। তাদের কষ্টের সাথী হয়েছি। তারপর বিভিন্ন প্রশ্নবানে তাদের জর্জরিত হতেও দেখেছি, বিষয়টা নিজের উপর ছিলো না অবলোকন করার ছিলো বলে স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতে আপার এই উদ্যোগ দেখে আমার এই ঝাড়ি প্রয়োগ। তথাপি দেখি একদিন সঞ্চিতা দি, আরতি দি, কেয়া, শাম্মী, এরা এসে ঢাকায় হাজির। কি ? ৭৫ বৎসর উদযাপনের প্রস্তুতি সভা করবে! আড়ালে আপাকে, শাম্মীকে ডেকে বকা দিই ‘বদনামী হওয়ার আর কোন কাজ পাও নাই? জান কালি করতে বাড়ছে———! আরও কত কি। নিজের গা ভাসিয়ে রাখি আমি কিছুতে বাজবো না।
ও মা! দেখি আমার উপর সবচেয়ে কষ্টের কাজটা তারা ন্যাস্ত করেছে ম্যাগাজিন আহ্বায়িকা! অর্থাৎ পুরো বিজ্ঞাপন কালেকশন থেকে ম্যাগাজিন প্রকাশ পর্যন্ত গুরু দায়িত্ব। প্রথমে রাজী না হলেও প্রথম মিটিং এ সুনামগঞ্জের বহু পুরনো মুখ একত্রিত হলে আমার অন্তর নেচে উঠে। এক লহমায় ৫০ উর্ধ্ব মহিলাদের বালিকা হওয়ার ধরণ দেখে আমার মধ্যে যে বালিকা সব সময় বিরাজ করে সেও উল্লসিত হয়ে উঠে। মেতে উঠি কর্মযজ্ঞে। সংসদ লবীর সেই           
উন্মাতাল ধামাইল আমাকে জাগিয়ে তোলে। ফেলে আসা দিনগুলো জোর কদমে ডেকে উঠে——–
আয় আয়রে চলে আয় ছোট্ট বেলার দিনগুলো ডাকছে তোরে আয়, হারিয়ে গেছে সখীরা সব হারিয়ে গেছে বন
দশক দশক সময় গেছে, রয়ে গেছে সেই মন। ——আমি সে ডাক এড়াতে পারিনা।
ম্যাগাজিন সম্পাদিকা হওয়ার কারণে এই এত্তো বড় ম্যাগাজিনে আমার কোন স্মৃতিকথা যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ সম্পাদিকা হিসাবে এক পাতার একটি বক্তব্য যাবে। একজনের দু’টো লিখা যাওয়া সমীচীন নয়। আমি দেবোও না। কিন্তু লন্ডন, আমেরিকা, কানাডার বোনদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে ৭৫ গ্রুপের ফেইসবুকে নর্তন কুর্দন দেখে স্মৃতিকাতরতায় বেশ কয়েকমাস ধরে পেয়ে বসেছে আমায়। জুলাই থেকে সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রাক্তন এবং নুতন ছাত্রী যেনো বালিকা হয়ে গেছে। তাদের কথায় চলনে বলনে বালিকা সুলভ মন চলে এসেছে। হ্যাঁ মাঝে মাঝে এরূপ অনুষ্ঠান হওয়া উচিত যা মানুষকে জাগিয়ে তোলে আনন্দ দেয়, বাঁচার আশা বাড়িয়ে তোলে।
সেই স্মৃতিকাতরতা থেকে আমার স্কুল জীবনের স্মৃতি লিখতে খুব খুব ইচ্ছে হচ্ছে লিখে ফেললাম। কিন্তু ছাপাবো কোথায়? ম্যাগাজিনে তো আমার লিখা ধারণ করা বারণ! তখনই দেখলাম সুনামগঞ্জের খবর, সুনামকণ্ঠ, সুনামগঞ্জ প্রতিদিন আমাদের সতীশ চন্দ্রের মেয়েদের বিভিন্ন লিখা ছাপাচ্ছে যতেœর সাথে। ভাবলাম দিয়ে দেখি ই না সম্পাদক মহোদয়রা আমার লিখাটা ছাপে কি না। রুনা জানায় রাজীব গার্লস স্কুলের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে বলতে হয় বাংলাদেশ জন্মের ক্রান্তিলগ্নে আমরা অর্থাৎ আমি ও আমার সতীর্থরা ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। শহর প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সন্নিকটে অবস্থিত লাল টিনের চালের কাঠের কালো বেটনের মধ্যে সাদা চুনকাম করা দীর্ঘ এল আকৃতির এই স্কুল ঘরটি আমায় টানতো শহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকতেই। তার কারণ ছিলো সতীশ চন্দ্র গার্লস স্কুলের একটি কর্ণারের রুমে ক্লাস থ্রী এর একটি ক্লাস ছিলো। যা শহর প্রাইমারি থেকে দেখা যেতো সেই রুমের জানালায় দু’টি অপূর্ব সুন্দরী বালিকা দাঁড়িয়ে গল্প করতো তাদেরকে আমার স্বপ্নের পরী মনে হতো। একে তো বড় স্কুলে পড়ে তদুপরি খুব মিষ্টি আমার মনে হতো কেবল মাত্র ভালো ছাত্রী হলেই বোধহয় বড় স্কুলে ক্লাস থ্রী তে পড়া যায়। আমরা যারা শহর প্রাইমারিতে পড়তাম তাদের সবারই স্বপ্ন ছিলো লাল টিনের এই স্কুলে যাবার। যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন দেশ উন্মাতাল চারিদিকে রাজনীতির আলোচনা, ইলেকশনের আলোচনা, ছাত্রদের মিটিং মিছিল। রাজনৈতিক ফ্যামেলীতে জন্ম বাবা ন্যাপের নেতা ভাই গোলাম রব্বানী জেলে যাচ্ছেন বেরুচ্ছেন। মিছিল হচ্ছে জেলের তালা ভাঙবো রব্বানী ভাইকে আনবো——পরিস্থিতিতে আমি পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তির জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। শহর প্রাইমারি থেকে চলে যাচ্ছি রাজগোবিন্দ স্কুলে। শহর প্রাইমারির হেডমাস্টার স্যার তখন নরেন্দ্র লাল সেন তার ভাই যতীন্দ্র লাল সেন স্যারের কাছে অংক কষতে। আমাদের হেড স্যারই ব্যবস্থা করেন। কারণ তখন বৃত্তির ছাত্রদের জন্যে স্কুল থেকে আলাদা বন্দোবস্ত করা হতো। কোন টাকা পয়সা দিতে হতো না। স্কুলের অন্য ক্লাস বাদ দিয়ে দুপুরে চলে যেতাম রাজগোবিন্দ স্কুলের উদ্দেশ্যে আমি ও টুকু। যাওয়া আসার পথে অফুরন্ত স্বাধীনতা মিছিলে মিটিং এ গলা মেলানো, কুঁড়েঘর আর নৌকার শ্লোগান দেয়া, ছেলেদের সঙ্গে মারামারি করা রাস্তায় তেঁতুল কিনে হাতে নিয়ে চটাস চটাস করে খাওয়া ‘জয়বাংলা বাংলার জয়———নূতন স্বপ্ন দেখার এইতো সময়’ গানের সঙ্গে গলা মেলানো। সে এক উত্তেজনাকর সময় পার করে ক্লাস ফাইভ শেষ করে আমার স্বপ্নের স্কুল সতীশচন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় হয়ে যায়।  
সালটা ১৯৭১ এর জানুয়ারি ইলেকশন শেষ। ১৬৭ আসন পেয়ে আওয়ামীলীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পূর্ব পাকিস্তানে আনন্দের বন্যা। আবার ভয়েরও আশা নিরাশার দোলায় চলছে সারাদেশ হরতাল, ধর্মঘট, অসহযোগ আন্দোলন চারিদিকে কি হবে? কি হবে? প্রশ্নের মধ্যে কোর্ট কাচারী স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না। এমনই এক সময়ে পিতার হাত ধরে সরকারি সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী বারান্দায় পা রাখি। হেডমিস্ট্রেস মাহতাবুন্নেছা আপার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার ক্লাস ফাইভের মার্কশীট দেখার পর আব্বার সঙ্গে দু’একটা কথা বলে আমার ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। স্কুল রেজিস্ট্রারে আমার নাম এন্ট্রি হয়ে যায় ‘এ’ সেকশনে। সেই বহু আকাঙ্খিত মেয়েদের সান্নিধ্যে যাই কিন্তু শুধু তাদের নামটিই জানা হয় বন্ধুত্ব আর হয়ে উঠার সুযোগ হয় না। একজনের নাম ‘কাবেরী’ আরেকজন বিউটি। (কাবেরী এখন কলকাতায় গৃহিণী হয়ে অন্তরে সুনামগঞ্জ বহন করে জীবনযাপন করছে। আর বিউটি বাবার চাকুরীর সুবাদে সুনামগঞ্জের আলো বাতাসে বেড়ে উঠে এখন বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব) সে যাই হউক ৪/৫ দিন ক্লাস করার পরই আজ হরতাল কাল অসহযোগ করতে করতে সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ার স্বাদ গ্রহণ না করেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় কে যে কোথায় ভেসে গেলাম জানি না। 
যুদ্ধের মাঝে স্কুলে ফেরা
মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা শহরের কারও খবর কারও কাছে ছিলো কি জানি না তবে আমি ১৯৭১ সাল একবার এই স্কুলে এসেছিলাম প্রয়োজনে। ১৯৭১ সালে পিতাকে হারিয়ে নানা গ্রামগঞ্জ ঘুরে নানাভাই (মরহুম মতছিন আলী) চলে যান ইন্ডিয়া আম্মা বালাটের কলেরার ভয়ে জায়গা নেন আব্বার মামার বাড়ি গাগলী গ্রামে। আম্মার হাতে কোন টাকা নাই। আমাদের বাড়ি থেকে চাল আসে কিন্তু চলার মতো কোন টাকা নাই, আমাদের বাসা দখল করে নিয়েছে আমাদের গ্রামেরই রাজাকার সত্তার মিয়া। কাপড় নাই, সাবান নাই, লবণ মরিচ কেনার সামর্থ্য নাই। সেই কঠিন সময়ে গাগলী গ্রামে আম্মার ফুফা আজির উদ্দীন নাজির সাহেব খবর নিয়ে আসেন আমি ফাইভে বৃত্তি পেয়েছি। তার কিছুদিন পড়ে সম্ভবত আগস্ট/সেপ্টেম্বর মাসে আম্মা আমাকে এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে সুনামগঞ্জে পাঠান স্কুল থেকে বৃত্তির টাকা নিতে। সদ্য পিতা হারানো ১১ বৎসরের এক বালিকা। আমি বলতে গেলে একা সুনামগঞ্জে পা রাখি, কারণ আমার চাচাতো ভাই তার কাজ সেরে ঐ দিনই বাড়ি ফিরে যান। মানুষ নাই প্রায় বাসা ফাঁকা। হাঁটতে হাঁটতে আমি আমাদের বাসায় চলে আসি। আমাদের বাসা তখন দালাল ছত্তার মিয়া দখল করে নিয়েছিলো সে আমাদের গ্রামের লোক। তার স্ত্রী মেয়েরা আমায় চিনতো। আমি ঘুরে ঘুরে আমার পিতা মাতার অনেক কষ্টের বানানো অন্যের দখলে যাওয়া বাসা দেখি। আর চোখের জল নিরবে ফেলি। সে অনেক কথা অন্যত্র বলবো। আমি পরদিনই সতীশ চন্দ্র স্কুলে যাই বৃত্তির টাকা তুলতে। মাহতাবুন্নেছা আপা তখনও আছেন হেডমিষ্ট্রেস হিসাবে। স্কুলও ফাঁকা ১টার সময় ছুটি হয়ে যায় ছাত্রী সংখ্যাও হাতেগোনা। আমার স্বপ্নের স্কুলকে আবার আমি দেখি, যেনো প্রাণ নেই, উচ্ছলতা নেই, মৃতপ্রায় মানুষগুলো যেন চলছে। আমি হেডমিস্ট্রেস এর সঙ্গে দেখা করি সব টিচার আমায় জেকে ধরেন আমার আম্মার খবর জানতে চান। আমার আম্মা এই স্কুলের ছাত্রী, সুনামগঞ্জের মেয়ে, আমার আব্বাকেও সবাই চিনেন। তাই সব জানার আগ্রহ। আমি যতটুকু পারি উত্তর দেই। দরখাস্ত দিই বৃত্তির টাকা প্রদানের জন্যে। স্কুলে তখন কোন হিন্দু টিচার নেই। ঝুনু দি, প্রশান্তি দি, সুণীতি দি, রমা দি কেউ নেই, আছেন করিমুন্নেছা আপা, লুৎফা আপা, সাজ আপা আরও কারা কারা আমার মনে নেই তবে সবাই আমাকে ভালবাসা দেন দুঃখ প্রকাশ করেন। ক্লাসে নিয়ে যান লুৎফা আপা সবার সামনে নিয়ে বলেন ‘‘এই যে সোনা মনিরা তোমাদের আরেকটা বন্ধু এসেছে ক্লাস করতে সে বৃত্তি পেয়েছে খুব ভাল ছাত্রী। মিলে মিশে থাকবা কেমন?’’ —আরও অনেক কিছু বলেছিলেন সব মনে নেই তবে তাঁর ভালবাসার কণ্ঠ আজও কানে বাজে। আমাদের ক্লাস সিক্সও ফাঁকা। ৮/৯ জন ছাত্রী ডালিয়া, জাহিদা, বুলি, মাসুদা, সামছি আরও দু’চারজন তারাও প্রথমে অনেক প্রশ্ন করে। আবার সত্যি আম্মাকে ছেড়ে ক্লাস করবো কিনা সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে। আমি সবাইকে বলি আমি পড়তেই এসেছি। টাকা নিতে এসেছি কাউকে বলি না। যদি শেষে টাকা না দেয়। কিন্তু না আমাদের হেডমিস্ট্রেস মাহতাব আপা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন হয়তো প্রথম দিনেই আমার দরখাস্ত দেখে বুঝতে পেরেছিলেন আমি মা ভাই বোন ছেড়ে পড়তে আসি নাই। টাকাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। দু/তিন দিনের মধ্যেই হেড মিস্ট্রেস আপার রুমে আমার ডাক পড়ে ৪০০ টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দেন এবং কিভাবে আমি আম্মার কাঝে যাব সে খোঁজ নেন। টাকা পেয়েই আমি যাবার চিন্তা করি। এতো শখের স্কুল আমার কাছে মরা বাড়ির মতো লাগে। আনন্দ নেই, উল্লাস নেই সবার মুখে ত্রাসের চিহ্ন! আমাকে বুঝিয়ে দেয় বন্দিশালায় বিদ্যা অর্জন হয় না। আমি বাসায় ফিরে আসি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি সোলজার দেখি, দূর থেকে পি,টি স্কুলের দিকে তাকাই শুনেছি এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে প্রচন্ড মারে, আমার তাদের কাছে যেতে ইচ্ছে করে। এরপর কিভাবে আমি আম্মার কাছে গিয়েছিলাম, কি কি দেখেছিলাম তা অন্যত্র বলবো। স্কুল থেকে বেড়িয়ে আসার সময় আমার একটুও কষ্ট হয়নি। স্কুলকে আমার নিজের স্কুলই মনে হয় নি।
স্বাধীন দেশে স্কুলে ফেরা
সুনামগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয় সম্ভবত ৬ ডিসেম্বর, সাত্তার মিয়া আমাদের বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায় সম্ভবত তখনই। আমরা বাসায় ফিরি ৮/৯ তারিখের দিকে। তখনও দাদা (গোলাম রব্বানী), নানাভাই (মতছিন আলী), মতিউর মামা, কেউ সুনামগঞ্জে ফিরেন নাই। আম্মার বোধ হয় তর সই ছিলো না—-আর্মি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে আসেন। বাসার অবস্থা করুণ। শুধু বাসাটাই আছে আর কিছু নাই। একবার লুট হয়েছে ন্যাপ নেতা সোনাওর আলী সাহেবের বাসা বলে আবার লুট হয়েছে সাত্তার মিয়ার বাসা হিসাবে। কাজেই রিক্ত নিঃস্ব শূন্য হাতে বাসায় আসলেও এতো তৃপ্তি এতো শান্তি পেয়েছিলাম যে আজও মনে হলে সে সময়ের অনুভূতি হৃদয়ে অনুভব করি। ১৬ তারিখে দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর আমরা সুনামগঞ্জে বসে পাই। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিছিলে ছোট্ট আমি মিশে গিয়েছিলাম। এবার স্কুলে যাওয়ার পালা। সম্ভবত জানুয়ারির মধ্য সময়ে আমাদের স্কুল শুরু হয়। তখনও সবাই আসে নি। প্রথম দিকেই স্কুলে যাই এরপর একেক করে বান্ধবীরা আসতে থাকে আর আমাদের কি উল্লাস! ঐটুকু এসেছে! ঐ যে রপু! কাবেরী, স্বপ্না, যুথিকা, রতœা একেক করে সবাই আসতে থাকে সবার মুখে হাসি স্বাধীন দেশে ফেরার স্বস্তি সে যে কি মজার দিন! কি অনুভূতি সে সময়টা যারা দেখে নাই কল্পনাও করতে পারবে না। মার্চের শেষ বা এপ্রিলে হঠাৎ একদিন ঘোষিত হয় আমরা অটো প্রমোশন পেয়েছি অর্থাৎ সিক্স নয় আমরা ক্লাস সেভেনের ছাত্রী হয়ে গেছি। সেদিনও সারা স্কুলে মেয়েরা মাঠে নেমে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছিলো। সব ছাত্রীদের নিয়ে সতীশ চন্দ্র স্কুল আবার ভরপুর হয়ে স্বমহিমায় ফেরত এসেছিলো।
স্কুল স্মৃতি বলতে গিয়ে আজ বলতে হচ্ছে স্কুল ছিলো আমার আনন্দস্থল। আব্বা শহীদ হওয়ার পর আমাদের বাসা একটা কষ্টের আবাস হয়ে যায়। অনেক ধরণের সমস্যা, অনেক অভাব, আম্মার কান্না, সিতারার জন্যে কষ্ট, সব মিলিয়ে বাসায় হাসি আনন্দ ছিলো না বললেই চলে। ছোট্ট আমরা সব সময় কষ্ট বুকে ধরে চলতে পারতাম না। তাই স্কুলে গিয়ে বান্ধবীদের সাহচর্যে আরাম পেতাম। দুষ্টুমী করতে পারতাম। তাই স্কুল ছুটির ঘন্টা আমার খুব ভালো লাগতো না। তবু বাসায় যেতে হতো এবং সেই বয়সেই আমি পাকের ঘরের চার্জে চলে যাই। কারণ আম্মা বাইর সামলাতে নিজের অফুরান দুঃখ সামলাতে ব্যস্ত।
স্কুলের দুষ্টুমীগুলো আজও আমায় হাসায়, কাঁদায়। কত কত বান্ধবী কে যে কোথায় আজ তার খোঁজও জানি না। জাহিদা ছিলো। নাইনে উঠে তার বিয়ে হয়ে যায়। সুন্দর মেয়ে ছিলো। দুষ্টুর হাড়ি ছিলো। ক্লাস সেভেনে থাকতে সে নাগামরিচ স্কুলে নিয়ে এসে দুষ্টুমী করতে করতে আমার নাকে মুখে লাগিয়ে দেয়। সে যে কি জ্বলুনী আজও তার কথা আমায় মনে করিয়ে দেয়। আমার মুখ ফুলে যায় ঠোঁট নাক সব ফুলে যায় ক্লাসে হুলস্থ’ল পড়ে যায়, বড় ক্লাসের মেয়েরা ছুটে আসে, কোথা থেকে যেনো আপা আসে, এসেই আমাকে এক চড়, ‘‘দুষ্টুমী করার আর কিছু পাস নাই না?’’ বলেই ঝড়ের বেগে চলে যায়। কি করেছি তার খবর নেয় না। এই হলো আপা পরের দোষ দেখবে না। বুলি, ডলি, জাহিদা, ছায়া এরা পিছনের বেঞ্চে বসে বসে ‘‘সেলিনার গোপন কথা’’, ‘‘রিকশা ড্রাইভার’’-এ ধরনের বই পড়তো আমি তাদের কাছে যেতাম। পড়তে চাইতাম দিতো না। বলতো আহারে তুইতো ভাল ছাত্রী খুকী এগুলো পড়বি না, তবু আমি পড়তাম, আর ওদের বকতাম কিন্তু ঠিকই পড়তাম। কেউ কেউ প্রেম করতো চিঠির মাধ্যমে সে চিঠি পড়ার জন্যে যে হুড়োহুড়ি——-! আজ পড়ন্ত বেলায় এসে সে সব কথা মনে হলে হাসি পায়। বৃষ্টির দিনে ছিলো আসল মজা। ছাতি হাতে ভিজতে ভিজতে স্কুলে যাওয়ার মজাই আলাদা। আজকালকার বাচ্চারা সে মজা পাচ্ছে না। আমার ওদের জন্যে কষ্ট হয়। তারপর বারান্দা থেকে হঠাৎ করে একেক জনকে ফেলে দেয়া ছিলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিনোদন। এই স্কুলে এমন কোন দুষ্টুমী নেই যা আমি করিনি। তেঁতুল গাছে উঠা থেকে শুরু করে আমগাছে উঠা, কলতলায় পানি খাওয়ার নাম করে একেক জনকে ভিজিয়ে দেয়া, খেলার মাঠে এমন কোন খেলা নেই যেখানে আমি নাম দিই নি, কিন্তু বস্তা দৌড়ে একবার ৩য় হওয়া ছাড়া কোনদিন কোন পুরস্কার পাই নি। মনালী দি, প্রণতি, যুথিকা এরকম কিছু মেয়ের জন্যে অন্যদের পুরস্কার পাওয়া দুষ্কর ছিলো। তবে যে কোন ফাংশনে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতায় আমার কাছ থেকে পুরস্কার ছিনিয়ে নেওয়াও ছিলো কঠিন। দিদিদের ভালোবাসা বন্ধুদের সাহচর্যে খেলা হাসি গানে ভরপুর ছিলো আমাদের কিশোরী বেলাটা। কারণ এতে বড় মাঠ, সুনামগঞ্জের প্রকৃতি, প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের স্মৃতি সব মিলিয়ে ১৯৭২—–৭৬ সাল ছিলো আমার শ্রেষ্ঠ সময়। চিন্তা ভাবনাহীন অফুরান আনন্দ মেলা আর কখনও সম্ভব নয়। সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তী উৎসব হবে এ কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট, ঢাকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় প্রৌঢ়া বৃদ্ধা, অর্ধ বৃদ্ধা, যুবতী ছাত্রীরা বিশ্বের বিভিন্ন কর্ণার থেকে যে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে তার মূল কারণ চিন্তা ভাবনাহীন বাবা মায়ের কোলের এই সময়টাকে ফিরে পাওয়ার উদগ্র বাসনা। এতো নিশ্চিন্ত ভাবনাহীন সময় কখনও পাওয়া যায়না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক টেনশনও চলে আসে সবার জীবনে। কারও বা বিয়ে হয়ে যায়, কেউ বা নিজের পায়ে দাঁড়াতে গিয়ে কঠিন যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। কেউ বা ভুল প্রেমের খেসারত টানতে টানতে কালান্ত শ্রান্ত মহিলাটি আবার কিশোরী হতে চায়। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো তাকে ডেকে নিয়ে যায়। সে খুঁজে ফেরে তার শৈশব, কৈশোর, মা মাটি, জন্মভূমি, স্কুল মাঠ, প্রজাপতি, চোরাকাটা, বাদল দিনে ছাতি হাতে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা কিশোর প্রেমিক, যার সনে কোন কালে কথা হয় নাই হয়তো আর হবেও না। তবুও মনের কোঠরে কোথায় যেনো ছায়া রয়ে গেছে। অকারণ হাসি, অকারণ দুঃখ পাওয়া সে দিনগুলো, বান্ধবীদের জন্যে সেই আকুলী বিকুলী টান! একদিন দেখা না হলে সেই অভিমান! এর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যে সবাই হঠাৎ করে বালিকা হয়ে যায়।
আমিও বালিকা হয়ে গেছি। হঠাৎ করে ৪০ বৎসর পর এই স্কুলে মাঠে সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে দিন গুনছি। সুনামগঞ্জ মেতে উঠেছে হীরক জয়ন্তী উৎসব পালনের জন্যে। সতীশ চন্দ্র স্কুল সাজছে আজ নতুন সাজে। তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েদের কলকাকলী শুনতে।
সুনামগঞ্জের মেয়েরা যারা বিয়ে হয়ে বা চাকুরী সূত্রে বিদায় নিয়েছিলো দূরদূরান্তে তারা এক সঙ্গে ফিরছে জন্মভূমিতে। একত্রে এতোগুলো মেয়েকে ধারণ করতে আজ সুনামগঞ্জ প্রস্তুত। প্রতি ঘরে আজ সাজ সাজ রব! অনেক মা বাবাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ভাইয়েরা অপেক্ষায় আছে বোনদের বরণের জন্যে। প্রতি ঘরে মেয়েরা ফিরছে তার ফেলে যাওয়া ঘর, উঠোন, নিজ হাতে লাগানো গাছ, হারিয়ে যাওয়া পুতুল, পুতুলের বিয়ে, ফেলে যাওয়া সখী মেঘালয় পাহাড়, সুরমা নদীর মমতার ছোঁয়া পেতে। আজ কোথায় গেলি কাবেরী, টুকু, রুপু, বিউটি, ফাতেমা, ফরিদা, রুখসানা, রিনি, পারভীন, শিউলি, ডালিয়া, পান্না হাসমত, স্বপ্না, আয়রে তোরা আয় প্রাণের মেলায় মিলবো আবার সতীশের বারান্দায়।