কিঞ্চিৎ কৃষি পুনর্বাসন সহায়তার ন্যায়সঙ্গত বণ্টন কাম্য

৭২২৬২ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের বিপরীতে মাত্র ২৬০০ জন কৃষককে কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচীর আওতায় সহায়তা দেয়া নিতান্তই দুঃখজনক। প্রদত্ত সহায়তার পরিমাণও নিতান্তই অকিঞ্চিতকর। কৃষক প্রতি দেয়া হবে ৫ কেজি বীজ ধান ও দুই প্রকারের ৩০ কেজি সার। গত বোরো ফসল কাটাই মৌসুমে জেলায় পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হলেও কৃষি বিভাগ ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন না করে মনগড়াভাবে অতি সামান্য ক্ষতি দেখিয়ে সরকারের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। জেলার কৃষকগণ মনে করছেন, কৃষি বিভাগের ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন না করার জন্যই এবার পুনর্বাসন কর্মসূচীর আওতায় বরাদ্দ কম এসেছে। অবশ্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক এই বরাদ্দেই খুশি। এটি বুঝা যায় তাঁর বক্তব্য থেকে। আত্মতৃপ্তি সহকারে তিনি বলছেন, ‘অন্যান্য জেলায় পুনর্বাসন ও সহায়তার পরিমাণ আরো অনেক কম হলেও আমরা তুলনামূলকভাবে একটু বেশি পেয়েছি’। যেখানে কৃষি বিভাগের কম দেখানো হিসাব মতেই গত বোরো মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ ছিল টাকার অংকে প্রায় ৪০৪ কোটি টাকা ও জমির পরিমাণের হিসেবে ৩৩ হাজার ২১৯ হেক্টর এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৭২২৬২ জন সেখানে মাত্র ২৬০০ জনের জন্য আসা বরাদ্দকে কিভাবে তিনি ‘তুলনামূলক একটু বেশি’ বলতে পারেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তুলনা করতে হয় সমান অবস্থাসম্পন্ন কিছুর সাথে। সুনামগঞ্জের মতো গত বোরো মৌসুমে দেশের আর কোথাও এত ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি। তাই অন্য জেলার তুলনায় খুদ-কুড়োর মতো সামান্য কিছু বীজ ও সার পেয়ে আত্মপ্রসাদে ভোগার কোন অবকাশ নেই আমাদের। কৃষি সম্প্রসারণের উপ পরিচালক তাই এই সহায়তায় খুশি হতে পারলেও আমরা সেরকম সন্তুষ্ট হতে পারছি না।
গত মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির জন্য প্রধানত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সীমাহীন দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধ ভাঙার প্রকৃত কারণ নিরুপণের জন্য তখন একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কমিটির কোন প্রতিবেদন অদ্যবধি কেউ চোখে দেখেনি। মানুষের চোখে ধুলোপড়া দেয়া ও তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রশমনের দাওয়াই স্বরূপ এটি ছিল একটি আমলাতান্ত্রিক মুলো। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতির হিসাব না দেখিয়ে দ্বিতীয় ক্ষতিটি করেছে কৃষি বিভাগ। এখন দেখা যাচ্ছে দেশের কৃষককূলের ভাল-মন্দ সবকিছু আমলাতান্ত্রিক মর্জির কবলে পড়ে গেছে। অর্থাৎ তথাকথিত কাগুজে প্রতিবেদনে ক্ষতি দেখানো গেলেই শুধু সরকার বাহাদুর বুঝবেন মাঠের ফসল হানি ঘটেছে। কৃষকদের এই লাল ফিতার ভিতরে আবদ্ধ করে রাখার প্রক্রিয়াটি আমাদের জাতীয় কার্যধারার একটি দুর্বলতম দিক।
এদেশের সংগ্রামী কৃষককূল কোন ধরনের সরকারি প্রণোদনা, সহায়তা কিংবা পরামর্শের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করে চলেছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষীরা আবারও নতুন উদ্যমে কর্দমাক্ত জমিনে সবুজ রাজ্য বানিয়ে সোনালী ফসল গোলায় তোলার স্বপ্ন নিয়ে কঠোর পরিশ্রম শুরু করে দিয়েছেন। অন্নদাতা কৃষকদের জন্য যদি সরকারি সবগুলো কর্মসূচী যথাযথভাবে ক্রীয়াশীল থাকতো তাহলে কৃষিখাতে অর্জনের পরিমাণও অনেক বেড়ে যেতে পারত। যাহোক এবার যে সামান্য পরিমাণ পুনর্বাসন সহায়তা এসেছে সেগুলো যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে পৌঁছায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি। এই সহায়তা নিয়ে যাতে কোথাও কোন স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি সংঘটিত না হয় সেদিকে নজর রাখা আবশ্যক।