কুয়া নাই, তবু ঠাণ্ডায় হাত-ফাও ঠাইয়া অইযায়

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
‘খুব সকালে ঘুম থাকি উইঠ্যা বিলো যাই মাছ মারতে। চাইরো বায়দি কোনো কুয়া (কুয়াশা) থাকেনা। এরফরেও যে ঠাণ্ডা পড়ে হাত-ফাও একেবারে ঠাইয়া অইযায়। কাম-কাজ কুন্তা করতাম পারি না। মরছি তো আমরা গরিব অখল। ধনী মাইনষ্যের তো আর অতো সকালে ঘুম থাকি উঠা লাগে না। আমরা অপেক্ষা করিয়ার কোন সময় ঠাণ্ডা কমতো।’ খুব কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের বীরগাঁও (গাঙপাড়) গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন। প্রতিদিন সকালে মাছ ধরার জন্য হাওরের একটি জলাশয়ে যান তিনি। তার কথার সাথে যুক্ত হন পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. জগলু মিয়া। তিনি পান-সিগারেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। প্রতিদিন ভোরে এসে তার দোকান খুলতে হয়। পাগলা বাজার বাসস্ট্যান্ডে সড়ক ও জনপদের জায়গার উপর খোলামেলা উপড়ি দোকান তাঁর। তিনি বলেন, ‘কুয়া একবারেই থাকে না। প্রচণ্ড ইম (হিম) পড়ে। সাথে খুব বেশি বয়ার (বাতাস)। খোলামেলা দোকান লইয়া বাজারো ঠিকা দায়।
গত এক সপ্তাহ যাবৎ শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রচণ্ড শৈত্য প্রবাহ লক্ষ করা যায়। এর আগে বৃষ্টির কিছু সম্ভাবনা দেখা দিলেও এ উপজেলায় তেমন বৃষ্টি হয়নি। তবে কোনো কোনো জায়গায় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছিলো ঠিক কিন্ত শীত কমেনি। দেশব্যাপী আবহাওয়ার যে পূর্বাভাষ দেওয়া হয়েছিলো তার সাথে মিল রেখে চলতি সপ্তাহে এ উপজেলায়ও বেড়েছে শীতের তীব্রতা। স্থানীয়রা ধারণা করছেন, আরো কয়েকদিন হাওরিয়া উপজেলা শান্তিগঞ্জে শীতের আক্রমণ থাকতে পারে। একে তো চারদিকে হাওর তার উপরে নদী, খাল, বিল-ঝিল। এছাড়াও প্রচণ্ড বেগে বয়ে চলা বাতাস শীতকে আরো গতিশীল করে ও উষ্কে দেয়। দিনের শুরুতে প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূযর্োর তেজে কিছুটা ঊষ্ণ হয় আবহাওয়া। সময় গড়িয়ে সূর্য যখন মাথা রাখে বিকালের কূলে এবং একসময় অস্ত যায় তখন থেকেই আবার বাড়তে থাকে শীত। এটা বলা যায় যে, কুয়াশা না থাকায় সূরে‌্যর দেখা মিলছে নিয়মিতই।
শীতের এমন অমানবিক আচরণে জনজীবনের স্ববাভাবিক চলাচল কিছুটা ব্যহত হচ্ছে। কর্মমুখী মানুষের দিনের প্রথমদিকটা খুব কষ্ট করে শুরু করতে হচ্ছে। যাঁরা চাষাবাদের সাথে জড়িত প্রচণ্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে তাঁদের। রিকশা আর সিএনজি (অটোরিকশা)’য় বেশি বাতাস লাগার কারণে খুব সহজে যাত্রীরা উঠতে চাননা। এতে রিকশা, সিএনজি চালকদের চলমান জীবনও ব্যহত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে শীতার্ত মানুষকে সহযোগিতা করতে সমাজের কিছু মানবিক মনের মানুষরা এগিয়ে এলেও বেশিরভাগ বিত্তবানরা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে। সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের জোর দাবি, যদি সকল বিত্তবানরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতো।
ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করেন বাচ্চু চৌধুরী। তিনি বলেন, আমার বয়স ৪০/৪৫ হবে। আমার দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। মাঘ মাস পর্যন্ত শীত থাকতে পারে। ফাল্গুন মাসের শুরুর দিকে কিছুটা শীতের তীব্রতা কমবে বলে আমার ধারণা।
পাগলা বাজারের বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক আলহাজ্ব শাকিল মুরাদ আফজল। প্রতি বছরই তাঁর সন্তানদের সহযোগিতা নিয়ে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন তিনি। ডা. আফজল বলেন, সকল বিত্তবানদের উচিৎ শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো। যদি সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে একজন দু’জন সমাজসেবী বের হন তাহলে আর গরিব-ধনী বৈষম্য আমাদের সমাজে থাকবে না। মানুষের পাশে দাঁড়ানো সকলের দায়িত্ব।