স্টাফ রিপোর্টার
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেছেন, সুনামগঞ্জ জেলায় হাওরে আগাম বন্যা গত বছর এসেছিল ২৮ জুন। এ বছর এসেছে ২৭ জুন। গত বছর ২য় দফায় এসেছিল ১২ জুলাই, এ বছর এসেছে ১১ জুলাই। অর্থাৎ এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এটিকে রোধ করা যাবে না।
ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আমরা পাচ্ছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্যই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আগে যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে আগাম সতর্কবার্তা আমরা পেতাম না। এখন আবহাওয়া অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটা ডিজিটাল টাইমিং এড্রেস করে দেয়া হয়। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতি। ধানকাটা ও বন্যা মোকাবেলা সহ বিভিন্ন বিষয়ে এটি সহায়তা করছে।
বুধবার সাম্প্রতিক বন্যা, ক্ষয়ক্ষতি এবং করণীয় নিয়ে অনলাইনে সিপিডি’র সংলাপে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ এসব কথা বলেন।
সংলাপে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, জেলায় মুজিব কেল্লা নির্মাণ প্রকল্প চলছে। এটার সংখ্যা যদি বাড়িয়ে দেয়া হয় ভালো হবে। বন্যা মোকাবেলায় নদী তীরবর্তী খাসজমি উঁচু করা হচ্ছে। বন্যার সময় কৃষকরা সেখানে ধান শুকানো ও মাড়াই করতে পারবেন। এছাড়াও ভিলেজ ডেভলেপমেন্ট প্ল্যান করা হচ্ছে। হাওরে আগাম বন্যা হলে ফসলহানির আশংকা থাকে। এজন্য কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল বিআর ২৮ ধান চাষে উৎসাহিত করা হবে। বিআর ২৮ ধান সহ এ জাতীয় ধানগুলো অন্য ধানের চেয়ে ১৫ দিন আগে পেকে যায়। আমরা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ধানটা কেটে ফেলতে পারি। তখন কিন্তু বন্যার আশংকা থাকে না। কিন্তু কৃষক বিআর ২৯ বা অন্য একটু বেশী ফলনশীল ধানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এজন্য উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা সহ কৃষি বিষয়ক সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা কৃষককে নভেম্বর থেকেই মোটিভেশন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক প্রকল্প হিসাবে বিএনডিসি থেকে বিআর ২৮ ধান এনে কৃষকদের দেয়া হবে। যাতে ফসলহানির বিষয়টি না আসে।
সংলাপে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের কভিড প্রস্তুতির শুরুতেই ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনার আলোকেই আমরা মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি এবং ভলান্টারি গ্রুপের সমন্বয়ে মানবিক সহায়তা দিয়েছি। বরাবর যে মানবিক সহায়তা দেয়া হতো ইউনিয়ন পরিষদ বা রিলিফ সেন্টার থেকে সেটা এবার পরিবার প্রতি পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়েছিল গত মার্চ মাস থেকে। নৌকা ও বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে আমরা সহায়তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অগ্রাধিকার তালিকার ভিত্তিত্বে গ্রাম পর্যায়ে আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় ডাটাব্যাজ করে কাজ করেছি। ত্রাণ সহায়তা, আর্থিক সহায়তা, শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। শুরু থেকে রিলিফ বা সহায়তার কোন সংকট ছিল না। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে আমরা অ্যাডভান্স রিলিফ দিয়ে রেখেছি। এরপরও যেসব জায়গায় আমরা যেতে পারিনি সেখানে ভলান্টারী গ্রুপের সহায়তায় ৩৩৩ মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণে কোন অনিময়ম হয়নি।
তিনি বলেন, কভিড পরিস্থিতির কারণে বন্যার সময় প্রতিটি বিদ্যালয় বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ টি পরিবার আমরা রেখেছিলাম। পুরো জেলা যখন বন্যার কবলে পড়ে তখন আমরা ৩৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্র আমরা খুলেছিলাম। এতে করোনা সংক্রমণ থেকে আমরা রেহাই পেয়েছি। পাশাপাশি গবাদিপশুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়া হয়। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ইউনিয়ন ভিত্তিক মেডিকেল টিম কাজ করেছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, হাওরে নদী ভাঙনের বিষয়টি খুব বেশী ভয়ের না। পানি যখন হাওরে প্রবেশ করে তখন হাওরে ভাসমান গ্রামগুলো প্লাবিত হয়। ঢেউয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। এ বিষয়ে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং সংসদস্যদের নিয়ে হাওরে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
সংলাপে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানায়, সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের ৩৩ জেলার ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এবারের বন্যা স্থায়িত্বের দিক থেকে ১৯৮৮ এবং ২০০৪ সালের বন্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকার যে ত্রাণ সরবরাহ করছে তা প্রযোজনের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।
চলতি বছরের বন্যা ৩৫ দিনের বেশি সময় ধরে চলমান রযেছে। ফলে পুরো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও পাওয়া যাযনি। তবে যতটুকু পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে, ৪২ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ৭৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সমপরিমাণ গবাধিপশু, ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৯ হেক্টর কৃষিজমিও ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি ১৬ হাজার ৫৩৭ হেক্টার জমির গাছপালা, ৮১ হাজার ১৭৯টি টিউবওয়েল এবং ৭৩ হাজার ৩৪৩টি ল্যাটিন এবং ১ হাজার ৯০০ এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুল রহমান বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহযোগিতায় সরকার সবধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বন্যায় মানুষের মাঝে খাদ্য ও নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও হেল্পলাইন খোলা হয়েছে, যাতে করে যেকোনো মানুষ প্রয়োজনে ত্রাণ সহায়তা পেতে পারেন। তিনি বলেন, বন্যায় ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের সবধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। কেউ ত্রাণ পাচ্ছে না- এই কথা মোটেও সঠিক না।
বক্তব্য রাখেন সিপিডি’র চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, নদী, জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন, সাংবাদিক, কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, ব্র্যাক’র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক গওহর নাঈম সহ সালমা সারোয়ার, জাফর সাদিক, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান প্রমুখ।
- ধর্মপাশায় শালীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে দুলাভাই কারাগারে
- ধান-চাল কেনা যায় নি ‘এটি হাস্যকর কথা’,-বললেন কৃষক নেতারা


