হিরন্ময় রায়
যে কোন দেশের সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সে দেশের কর্মক্ষম জনবলের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। শুধু সরকার নয়, দেশ ও দেশের অর্থনীতির মূল মেরুদন্ড সঠিক ভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার মূল চ্যালেঞ্জই হলো এই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ইউরোপ, চীন, আমেরিকার মতো দেশগুলোর শিল্প উৎপাদনে তাদের জনবলের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সমক্ষ। সেখানে সরকার ও বেসরকারি খাত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখানে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ও বেসরকারি উদ্যোগে শিল্প উৎপাদন খাতে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কতটুকু সমর্থ হয়েছে?
একমাত্র উল্লেখযোগ্য খাত গার্মেন্টস খাত। অসমর্থিত সূত্র বলছে মাত্র চল্লিশ লক্ষ লোক সেখানে কাজ করছে। সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আট লক্ষের মতো জনবল নিয়োগের সুযোগ আছে। বিভিন্ন ব্যবসা ও স্ব-কর্মসংস্থানে নিয়োজিত আছেন আরো কিছু সংখ্যক লোক। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল। তাহলে কর্মক্ষম এই জনবলের কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবিলা করছে দেশ? সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধান ভূমিকা রাখছে সরকার বা বেসরকারি কোন শিল্প বা ব্যবসা খাত না, এ দেশের ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত কৃষি খাত।
আসুন একটি ম্যাজিক ফিগার উল্লেখ করছি। ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষা মতে জনবলের ৪৮.৬ ভাগ লোকের এবং ২০১৮ সালের খানা জরিপের সমীক্ষা মতে শুধু কৃষি শস্য উৎপাদন খাতে নিয়োজিত আছেন ৪০.১০ ভাগ জনবল। অন্যান্য উপখাত যেমন ডেইরি, পোলট্টি ও মৎস্যখাতের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
যদি কৃষিখাত না থাকতো, তাহলে চিন্তা করুন, ১৬ কোটির উপর জনসংখ্যার এদেশে কি অবস্থা হতো? এর উত্তর পেতে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোতে বছরের পর বছর লেগে থাকা দূর্ভিক্ষের চিত্রই যথেষ্ট। শুধু আফ্রিকা কেন, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা দেখুন, অপ্রতুল কৃষি ব্যবস্থার কারণে, শিল্প নির্ভরতার কারণে যখনই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় দেশগুলোতে, লক্ষ লক্ষ লোক কাজ হারিয়ে বেকার হন। ইউরোপ, আমেরিকা ও মিডলইস্টে ধনী দেশগুলো থেকে কাজ হারিয়ে কত মানুষ বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মিডলইস্ট থেকে বেকার হয়ে দেশে ফিরেছেন প্রবাসী শ্রমিক ভাইয়েরা। ২০০৮ সাল থেকে চলা বিশ্বব্যাপী এই মন্দায় এখনো উন্নত রাষ্ট্রগুলো ধুকছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, দেশের অর্থনীতি টিকে আছে এই কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থানের জন্য। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে কৃষিখাতে জনবল কম থাকায় তাঁরা উন্নত মেশিনারী নির্ভরতা বাড়িয়ে কৃষি উৎপাদন সচল রেখেছে। এজন্য তাঁরা বিভিন্ন সিডিং, হার্ভেস্টিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়ায় কম জনবল দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে উন্নত প্রযুক্তির মেশিনারি টুলস ব্যবহার করছে। কিন্তু বাংলাদেশে জনবলের কি অভাব পড়েছে?
এই শ্রমঘন কৃষি খাতে দেশের প্রায় ৪৮.১০ভাগ লোক নিয়োজিত থেকে দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখার পাশাপাশি, দেশের বেকারত্ব ঘুচাতে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এখন যদি পর্যাপ্ত শ্রমিক না থাকার সমস্যায় পড়ে উন্নত রাষ্ট্রগুলো যে মেশিনারি বা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেই দেশের সমস্যার সমাধানকল্পে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আমরা আমদামী করি, তাহলে তা আমাদের অধিক সংখ্যক জনবলের দেশে বেকারত্ব সমস্যার সৃষ্টি করবে। এই বেকারত্ব ঘুচাবার মতো সক্ষমতা আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের নেই।
শুনলে বেখাপ্পা লাগলে এটাই বাস্তবতা, আমাদের কৃষিখাতে মেশিনারি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে কর্মসংস্থানের স্বার্থেই। তবে কি আমরা কৃষিখাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করব না?
কৃষিখাতে বরং উন্নত প্রযুক্তি বাড়াতে আরো বেশি। আমাদের এক ফসলী জমিগুলোকে দ্বি-ফসলী বা তিন ফসলী করার প্রযুক্তি, দক্ষিণাঞ্চলীয় নোনাজমিতে লবণ সহিষ্ণু ফসল উৎপাদন প্রযুক্তি, শস্যবহুমূখিকরণ প্রযুক্তি, কম সময়ে ফসল উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার জন্য গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জলাভূমি, হাওর ও নদীগুলো ড্রেজিং করে মাছ চাষে অধিক জনবল নিয়োগ করতে হবে। এজন্য নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য সেখানকার উপকারভোগী মৎস্যজীবীদের কৃষি উপখাত বিবেচনায় সহজ কৃষিঋনের ব্যবস্থা করে নদী ও হাওরপারের লোকজনের সত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পোলট্টি ও গবাদি খাতে একই পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য থাকতে হবে শ্রমঘন কৃষিখাতে আরো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এজন্য উৎপাদন বৃদ্ধির প্রযুক্তি ব্যবহার করা, শ্রমহ্রাস করা না।
আর বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা শিল্পনির্ভর অর্থনীতির ফাঁকফোকড় দেখিয়েছে। আর আমাদের দেশেও মাত্র একমাস লকডাউনে থাকলে যেখানে গার্মেন্টস মালিকদের শ্রমিকদের বেতন দিতে সরকারি প্রণোদনা নিতে হয়, সেখানে দেশের কৃষিখাতে মেশিন নির্ভরতা বাড়িয়ে শ্রমঘন পরিবেশ নষ্ট করলে উদ্ভব হওয়া বেকারদের তারা কিভাবে কাজ দিবে?
আরেকটি বিষয় যেদিকে নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। দেশের কৃষি জমি প্রতিবছর কমছে। যেখানে সেখানে মার্কেট, পেট্টল পাম্প, বাসা বাড়ি, সরকারি স্থাপনা, ইপিজেড তৈরী করে কৃষি জমির পরিমাণ কমানো হচ্ছে আশংকাজনকভাবে। এজন্য নীতিমালা প্রনয়ন করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করলে অদূর ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জমি থাকবে না। এখন থেকে নিয়ম করে কৃষি জমি শুধুমাত্র কৃষি কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অফিসগুলো একটি সেডে নিয়ে আসা যায়। ডিসি অফিসের ভবনকে উর্ধ্বাংশে সম্প্রসারণ করে সকল অফিস সেখানে স্থানান্তর করলে, লোকজন একই সেডে সকল সেবা পাবে। জায়গায় জায়গায় সরকারি অফিসের জন্য ভবন করে কৃষি জমি নষ্ট করতে হবে না। বিভিন্ন ইপিজেডগুলো, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানাগুলো অকৃষিজমিতে নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হউক। সড়কপথের পরিবর্তে রেলপথ সম্প্রসারণ করা হউক, যাতে অধিক যাত্রীপরিবহন সম্ভব হয়, নতুন নতুন রাস্তা নির্মানের কারণে কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে।
ভারতের সেলিব্রিটি তারকা অমিতাব বচ্চন কৃষি জমি কিনেছিলেন। কিন্তু তিনি কৃষক না হওয়ায়, ব্যাপক সমালোচনা ও কৃষিনীতির কারণে তাঁকে সে জমি ফেরত দিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের সিউরিতে অনিচ্ছুক কৃষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা আজ মুখ্যমন্ত্রী।
আমাদেরও কৃষি জমি শুধু কৃষি কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- জগন্নাথপুরে দুই নির্মাণ শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত
- লকডাউন উপেক্ষা করে বাড়ি ফেরা পথে দুর্ঘটনায় মারা গেলেন ভাই, গুরুতর আহত বোন


