কৃষ্ণগাথা, ‘ও গানওয়ালা…’

উজ্জ্বল মেহেদী
বংশগতির পেশা। ব্যস্ততা হাতের কাজে। মন আর মুখ উন্মুখ গানে। তাঁর প্রতি আকর্ষণ এখানেই। কিশোরবেলার সেই আকর্ষণ তুলনাহীন ছিল। দিনভর পেশার ব্যস্ততার পার রাতভর কাটত গানে-সুরে। এক রাতে এভাবেই দেখা হয় তাঁকে। তাঁর ভেতরকার সুপ্ত প্রতিভা প্রত্যক্ষ করে শ্রদ্ধা ভর করে। একজন কৃষ্ণ চন্দকে নিয়ে আমার কৃষ্ণটান সেই ছেলেবেলার। বেলা গড়ায়। একদিন অবেলায় শুনলাম কৃষ্ণ নেই! নেই মানে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। মধ্য বয়সে, বড় অকালে এবং অবেলায় এই চলে যাওয়া।
কৃষ্ণ নামটিই তো বিবাগী করে চলে যাওয়ার। তাঁর জন্য শোকগাথা, কৃষ্ণগাথা। এসব নিজের মনকে বলে শান্ত করার প্রয়াস। একটু খুলে বলতে চাইছি। তার আগে আবার পাঠ করি শোকসংবাদটি। ‘…সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয়মুখ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোকসংগীত শিল্পী ও সংগীত প্রশিক্ষক কৃষ্ণ চন্দ (৪৯) আর নেই। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটায় পৌর শহরের ষোলঘরস্থ নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোকগমণ করেন।… বিশিষ্ট কির্ত্তনীয়া মৃত. নরেশ চন্দ এবং কিংবদন্তী ধামাইল শিল্পী কুমকুম চন্দের ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মেয়ের মধ্যে কৃষ্ণ চন্দ ছিলেন তৃতীয় সন্তান। শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। …মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৩ছেলে সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন। বিকেল তিনটয় শহরের ধোপাখালীস্থ শ্মশানঘভটে তাঁর অন্তোষ্ঠিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। …কৃষ্ণ চন্দ’র মৃত্যুতে জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিবারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক প্রকাশ এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। …এদিকে পৃথক প্রেস বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেছে জেলা ক্ষৌরকার সমিতির সভাপতি নির্মলচন্দ,সাধারন সম্পাদক দেবশীষ চন্দ বাপ্পা, প্রচার সম্পাদক প্রদীপ চন্দ, দপ্তর সম্পাদক দয়াল কর, সহ অর্থ সম্পাদক কানাই চন্দ, সেবক চন্দ, সদস্য বাদল সরকার।’
শোকসংবাদ এ টুকুই। শোকগাথা এখান থেকেই। শব্দের ব্যবচ্ছেদে ‘শোক’ বাদ দিয়ে ‘কৃষ্ণ’ যোগ করতেই হলো কৃষ্ণগাথা। এই গাথা তৃণমূল থেকে প্রোথিত। কিংবা তাঁর রক্তে। তাঁর বাবাও ছিলেন পেশার আড়ালে এক গানওয়ালা। মা-ও তাই। ধামাইলে মজে থাকতেন। কৃষ্ণ সেই মা-বাবার মধ্যমণি এক সন্তান। সুনামগঞ্জ শহরে ষোলঘর পয়েন্ট আমার আব্বার ফার্মেসির সুবাদে ছেলেবেলা থেকে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে সংযোগ। কৃষ্ণকে চেনা হয় তাঁদের পেশার পাশে থাকায়। যেদিন পেশার ভেতরে মজে থাকা সুর-সংগীতকে জানা হয়, সেদিন থেকে কৃষ্ণকে একটু আলাদা করে চেনা।
কৃষ্ণদা বলে ডাকতাম। বয়সে আমি ছোট। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধায় কখনো আমার নাম ধরে ডাকতেন না। সম্মোধন ছিল ‘ছোট ভাই’। তাঁর কণ্ঠে যতবারই গান শুনেছি, ততবারই আমার মনে ভর করে ‘ও গানওয়ালা’ গানের কথা। তাঁকে বলেছিও সেই কথা। কৃষ্ণ আপ্লুত থাকতেন। তৃণমূলকে আঁকড়ে থাকার সেই আপ্লুত অবস্থা আমাকে বিমোহিত করত।
সংগীত শেখাতেন কৃষ্ণ। ছোট ছোট ছাত্ররা বড় হয়। তাঁকে ‘ওস্তাদ’ বলে মান্য করেন। সফল মঞ্চ থেকে পা ছুঁয়ে সালামও করেন অনেকে। আমি দেখতাম তাঁর ভেতরকার মানুষকে। তাতে ছিল তৃপ্তির সুর। পেশাকে পাশ কাটিয়ে কৃষ্ণের সংস্কৃতিসঙ্গ দেখে মুগ্ধ ছিলেন এই শহরের প্রয়াত পৌরপিতা কবি মমিনুল মউজদীন। তাঁকে পৌরসভায় একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে আরও বিস্তৃত ছিল কৃষ্ণের সাংস্কৃতিক মনন। ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছিল গানের ভুবন। সেই সুর হয়তো সবার আগে তাঁর ছোট ভাই কানুকে ঘিরে ধরে। কৃষ্ণ চাইতেন কানু পড়াশোনা করুক। কিন্তু কানু গানে বুঁদ। গানপাগল কৃষ্ণ আর বিরাগ হননি ছোট ভাইকে নিয়ে। দুজনই গানওয়ালা। জীবনের যোগ-বিয়োগের খেলায় তাঁদেরকে নিয়ে আমার ভাবনায় আবারও ভর করল সুমন কবীরের সেই অজেয় গান।
‘ও গানওয়ালা, আর একটা গান গাও
আমার আর কোথাও যাবার নেই,
কিচ্ছু করার নেই।

ছেলেবেলার সেই, ছেলেবেলার সেই
বেহালা বাজানো লোকটা,
চলে গেছে বেহালা নিয়ে
চলে গেছে গান শুনিয়ে।
এই পাল্টানো সময়ে, এই পাল্টানো সময়ে
সে ফিরবে কি ফিরবে না জানা নেই…
কৈশোর শেষ হওয়া, কৈশোর শেষ হওয়া
রঙ চঙ্গে স্বপ্নের দিন
চলে গেছে রঙ হারিয়ে,
চলে গেছে মুখ ফিরিয়ে।
এই ফাটাকাবাজির দেশে,
এই ফাটাকাবাজির দেশে
স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই…’
স্বপ্ন, কথা আর বাস্তবতা। জীবনের ধারাপাত বড় কঠিন। এপার-ওপার মাত করা এই গানের মতো করে ভাবি তৃণমূলের এক কৃষ্ণকে নিয়ে। কৃষ্ণের গান ভরা হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল অসুখ। হৃদয়ের অসুখ। সত্যিই ‘কিচ্ছুই করার নেই’-এর মতো অবস্থা ছিল। চিকিৎসার জন্য দৌঁড়ঝাপ করে নির্জীব জীবন কেটেছে মধ্যবয়সের শেষ কটা দিন। তাঁর ফেরার পিপাসা ছিল, কিন্তু চলে যেতে হয়েছে ‘মুখ ফিরিয়েই’। কৃষ্ণকে সামনে রেখে ‘ও গানওয়ালা…’ তেই আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে। ভেসে ওঠে শুধু কৃষ্ণের মুখ। লোকসংস্কৃতির শহর এই সুনামগঞ্জ থেকে এক গানওয়ালা বিদায় নিয়েছেন সত্য। তাঁর সুর-গান-সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা নিশ্চয় করবেন কেউ না কেউ। পাশে দাঁড়াবেন বিপন্ন পরিবারের। সেই চেষ্টায় জন্ম নেবে আরও আরও মুখ। সেই পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
লেখক : সিলেটে প্রথম আলো’র নিজস্ব প্রতিবেদক।