কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারকে রক্ষা করতে সকলে ভূমিকা রাখুন

স্বাধীনতার পরপরই বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরা শ্রম দিয়ে জেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র ডিএস রোডের সরকারি জায়গায় নির্মাণ করেছিলেন যে শহিদ মিনার সেটিই সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার হিসাবে পরিচিত। একপর্যায়ে শহরে একটি দৃষ্টিনন্দন শহিদ মিনার নির্মাণের প্রসঙ্গ আসার পর এজন্য স্থান হিসাবে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সাথে আরও দুইটি জায়গার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে ব্যাপকভাবে আলাপ আলোচনা শুরু হয়। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে দৃষ্টিনন্দন শহিদ মিনারটি বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের স্থানেই নির্মাণের পক্ষে অভিমত দেন অধিকাংশ মানুষ। এই জনমতের পক্ষে তখন শহরে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বর্তমান স্থাপনাটি আরও সম্প্রসারণ ও দৃষ্টিনন্দন করার প্রস্তাব গৃহিত হয়। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সম্প্রসারণের জন্য এর পার্শ্বস্থ কিছু জায়গার জন্য আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় তখন একটি কমিটিও গঠন করে দেয়া হয়েছিলো। ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু শহরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সম্প্রসারণ ও দৃষ্টিনন্দন করার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের গোড়ায় শহরের জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের এক কোণে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নামাঙ্কিত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর সেই পুরানো আলোচনা আবারও জোরেশুরে আরম্ভ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুবিলীর খেলার মাঠে শহিদ মিনার নির্মাণ না করে বর্তমান জায়গা ঠিক রাখার জন্য শত শত ব্যক্তি মন্তব্য করা শুরু করেন। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায়ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটিকে রক্ষার ব্যাপারে জোর দাবি উচ্চকিত হতে থাকে।
জনমতের তীব্রতার কারণে জুবিলীর মাঠে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী জেলা পরিষদ প্রশাসক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছেন, সকলের মতামতের ভিত্তিতেই শহিদ মিনারের জায়গা নির্ধারণ করা হবে। জেলা পরিষদ প্রশাসক রাজনীতিবিদ। রাজনীতিবিদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো জনমতকে ধারণ করা। তিনি সেটি করেছেন। এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু এই কথা বলে দায় সারলেই শুধু হবে না। জনমত বাস্তবায়নের দায়িত্ব এবার তাঁকে নিতে হবে। শহিদ মিনার হলো জাতীয় একতা ও সংহতির প্রতীক। চেতনাকে শাণিত করার জায়গা এই শহীদ মিনার। জাতির আবেগ ও অনুভূতি ধারণ করে এই স্মৃতির মিনার। তাই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রমে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার রক্ষা করা সকলের আবশ্যিক কর্তব্য। অবস্থানগত কারণে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার স্বাধীনতার পর নানা দুর্যোগ-সংকটে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে । স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবি-দাওয়া জানানোর কর্মসূচী পালন, এরকম ক্ষেত্রে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সংগ্রামী ভূমিকা সকলের জানা। শহিদ মিনারটি প্রধান সড়কের নিকটবর্তী হওয়ায় চলার পথে মানুষ এই শহিদ মিনারের দিকে তাকিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেইসব দিনের কথা স্মরণ করেন। শহিদ মিনার নির্জন স্থানে নির্মাণের কোন স্থাপনা নয়। মানুষের হৃদয়ের সাথে এর সম্পর্ক। সুতরাং যেখানে মানুষের সমাগম বেশি সেখানেই শহিদ মিনার থাকা সঙ্গত।
শহিদ মিনার সম্প্রসারণে আইন মন্ত্রণালয়ের জায়গা ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার বিষয়টিকে অনেকে বাধা হিসাবে মনে করছেন। এটি কেন বড় বাধা হবে তা কিছুতেই আমাদের বোধগম্য নয়। যেখানে সকল মানুষ এটি চান, আইন মন্ত্রণালয় সেখানে মানুষের বিপক্ষে অবস্থান নিবেন, এটি আমরা বিশ্বাস করি না। দরকার যথোপযুক্ত ও আইনসঙ্গত উদ্যোগের। জেলা পরিষদ প্রশাসককে এই বিষয়ে বলিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাই আমরা। বিতর্ক নয়, রাজনীতি নয়, দোষারূপ নয়, আসুন সকলে মিলে আমাদের প্রাণের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটিকে রক্ষা করার পাশাপাশি আরও দৃষ্টিনন্দন ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে তুলি।