জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলাধীন মহাশিং নদীর তীরবর্তী ডাবরে বহু আগে নির্মিত হয়েছিলো একটি মৎস্য অবতরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র। এরপর একই উপজেলা সদরে তৈরি করা হয় মাছের পোনার কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্র (হ্যাচারি)। দু’টি প্রতিষ্ঠান তৈরিতেই খরচ হয় সরকারি বহু টাকা। নির্মাণের আগে শোনানো হয় অনেক বড় বড় আশার বাণী। বলা হয়েছিলো প্রতিষ্ঠানগুলো জেলার মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার কোনো কিছুরই দেখা মিলেনি। এসব প্রতিষ্ঠান কখনও কোনো কাজে ব্যবহার করা যায়নি। সময়ের ব্যবধানে এগুলো আজ পরিত্যক্ত। সরকারকা মাল দরিয়ামে ঢাল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই দুই প্রতিষ্ঠান। এই অবস্থায় জেলা সদরের ওয়েজখালিতে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রায় ১০ কোটি টাকা দিয়ে নির্মাণ করেছে আরেকটি আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। এই কেন্দ্রটি উদ্বোধন হবে আগামী ১ জুন। কিন্তু এরকম খবরে আমরা খুব বেশি খুশি হতে পারছি না অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে। মৎস্যস¤পদ উন্নয়নের জন্য স্থাপিত আগের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল না করে কেন নতুন করে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হলো এ প্রশ্নও সামনে আসে।
মুখ ভরে বলা হয় সুনামগঞ্জ মৎস্যসম্পদের ভা-ার। গণমাধ্যমের সংবাদে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, সুনামগঞ্জ বলেছেন, ‘হাওর অধ্যূষিত সুনামগঞ্জ মৎস্যসম্পদের ভা-ার। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চালু হলে হাওরের মাছের কদর বাড়বে। আড়তদাররা নিরাপদে মাছ বিক্রি করতে পারবেন।’ আসলেই কি তাই? আমরা জানি হাওরে এখন আর মাছ নেই। নির্মম সত্য হলো মিঠা পানির অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত বা দুর্লভ হয়ে গেছে। মিঠা পানির মাছের উৎপাদনকে সংহত করতে নেই তেমন কোনো পরিকল্পনা। মাছের বাজারগুলোতে ঘুরলে কদাচিৎ দেখা মিলে দেশি মাছের। বাজার ভরা থাকে খামারের মাছে। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে মিঠাপানির দেশিয় মাছকে রক্ষার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে সরকারি টাকা খরচ করে নতুন করে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র তৈরির যুক্তি আমরা খুঁজে পাই না। সুনামগঞ্জে দেশি মাছের প্রধান উৎস বিল। এই বিলগুলো থেকে সরাসরি মাছ কিনে নেয় জেলার বা বাইরের পাইকরারা। সাধারণ জেলেরা যে মাছ ধরেন তা একেবারেই নগন্য। নবপ্রতিষ্ঠিত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে তাহলে কারা মাছ বেচাকেনার জন্য নিয়ে আসবেন আর পর্যাপ্ত মাছের জোগান কি এখানে নিয়মিত দেয়া সম্ভব? সুনামগঞ্জ জেলা শহরের কিচেন মার্কেটে পাইকারি মাছ বিক্রির যে দৃশ্য আমরা দেখি তাতে বুঝা যায় এখানকার পাইকারি মাছের বাজার খুব বড় নয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুবিধাসম্পন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র সচল রাখতে যে খরচ হবে তা কি আহরিত রাজস্ব দিয়ে সংকুলান সম্ভব? আমরা জানি না এরকম প্রকল্প গ্রহণের আগে ভালোভাবে সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিলো কিনা। তবে একথা নিঃসংকোচে বলা যায় আলোচ্য প্রতিষ্ঠানটিও একসময় পর্যাপ্ত মাছের অভাবে পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
আসল কথা হলোÑ দেশি জাতের মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মাছের প্রজনন, বিচরণ ও জীবনচক্রকে নিরাপদ রাখতে হবে। এখন যেভাবে ছোট ও পোনা মাছ নিধনের মহাযজ্ঞ চলমান আছে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আসলে কোনো লাভ হবে না। সরকারের মৎস্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাই আমাদের আবেদন হাওর, বিল-জলাশয়-নদীর দেশি মাছের অসংখ্য প্রজাতিকে রক্ষা করতে গ্রহণ করুন সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। মাছের উৎপাদন বাড়লে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও অর্থবহ হয়ে উঠবে। এছাড়া ডাবর ও শান্তিগঞ্জের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও হ্যাচারি দুইটিকে সচল করার উদ্যোগ নিন। মনে রাখতে হবে সরকারের প্রতিটি টাকাই জনগণের। অদূরদর্শী প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এই টাকার অপব্যয় বা অপচয় করা অনুচিত।

