বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন থেকে দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতকারী কোটপতিদের একটি সংখ্যা জানা গেল। শুক্রবার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এই সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাংকিং খাতে কোটি টাকার উপরে আমানতকারীর সংখ্যা এখন ৬২ হাজার ৩৮ জন। দেশ স্বাধীনের পর দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল পাঁচ জন। সুতরাং দেশে কোটিপতির সংখ্যা যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য দেশের প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা এরচাইতে ঢের বেশিই হবে। কারণ প্রতিবেদনে যে কোটি টাকার উপরে আমানতকারীদের সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে তাঁরা নেহায়েৎই নিরিহ আমানতকারী মাত্র। ব্যবসায়ী বা আমলা-রাজনীতিবিদ যারা নানা বৈধ-অবৈধ পন্থায় শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছেন তারা সাধারণত নিজেদের আমানত ব্যাংকে গচ্ছিত রাখেন না। তাঁরা সব টাকাই বিনিয়োগ করেন। ব্যবসায়ী এবং কালো টাকার মালিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের উদ্বৃত্ত আমানত দেশের বাইরে পাচার করে দেন। সুতরাং বাংলাদেশ বর্তমানে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। কেটিপতির সংখ্যাস্ফিতি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ। স্বাধীনতার আগে এদেশে কোন শিল্পপতি বা বৃহৎ পূঁজির মালিক ছিলেন না। এখান থেকে স্বাধীনতার মাত্র ৪৫ বছরের মাথায় এসে এক লক্ষ কোটিপতি বনে যাওয়ার অর্থ হলো এদের ঘরে স্বাধীনতার স্বাদ ঠিকই পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা কোটিপতির সংখ্যাস্ফিতিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করবেন। কেউ কেউ এর মধ্য দিয়ে জনগণের মাঝে যে তীব্র সম্পদ বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে সেই কথাও বলবেন। অনেকেই বলবেন এই কোটিপতিরা কর ফাঁকি দিয়ে কিংবা অবৈধ পন্থায় সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছেন। পূঁজি বিকাশের প্রাথমিক স্তরে ধনবাদী বৈশিষ্ট্যদ্বারা আক্রান্ত যেকোন দেশে এমন অবস্থা দেখা যায়। সবকিছু মিলিয়েই দেশের অর্থনৈতিক শরীরে যে রক্তসঞ্চার বেড়ে গেছে তা ঠিক এবং এই রক্ত সঞ্চালনের ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতির উর্দ্ধগতির চিহ্ন এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়।
অন্তত একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। সেটি হলো অন্তত এই ৬২ হাজার আমানতকারী তাদের সঞ্চিত অর্থ বিদেশে পাচার করেন নি। এই ন্যুনতম দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়ার জন্য আমানতকারীরা ধন্যবাদ পেতে পারেন। এখন প্রশ্ন হলো এই আমানতকারীরা দেশের প্রচলিত কর ব্যবস্থার আওতায় সঠিক পরিমাণে কর পরিশোধ করেন কিনা এবং আমানতের বাইরে তাঁদের আয়ের উৎস ও সম্পদের হিসাব যথাযথভাবে দাখিল করেন কিনা । আমরা জানি দেশে প্রত্যক্ষ কর পরিশোধকারীর সংখ্যা এখনও প্রত্যাশিত পরিমাণে পৌঁছেনি। যারা টিআইএন নম্বর গ্রহণ করেছেন তাঁরা বিভিন্ন ফন্দিফিঁকির করে কর কমানোর অপচেষ্টায় নিয়োজিত থাকেন। কর পরিশোধযোগ্য সকল নাগরিকের আইন নির্ধারিত হারে নিয়মিত কর প্রদানের অভ্যাস একটি ভাল রাষ্ট্রের পরিচায়ক। আয় বা সম্পদ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক প্রতি মুহূর্তে পরোক্ষ কর পরিশোধ করে আসছেন এমন অবস্থায় সামর্থবানদের প্রত্যক্ষ কর ফাঁকির বিষয়টি খুবই গর্হিত কাজ নিঃসন্দেহে।
সবকিছু মিলিয়ে আমাদের প্রিয় দেশটি ধনবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এগিয়ে চলছে। এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে কল্যাণমূলক কর্মসূচীর বিস্তৃতি ঘটাতে পারে বহুলাংশে। এর সুফল নির্ধন বা স্বল্পবিত্তরা ছিটেফোটা পাবেন, এইটি ঠিক। যতদিন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চরিত্র এই ধারায় প্রবহমান থাকে ততদিন অন্তত রাষ্ট্র নিজের কল্যাণকামী চেহারা নিয়ে জনগণের মাঝে সবসময় বহাল থাকুন এই কামনা সকলের। নতুবা সম্পদ বৈষম্যের পাহাড়ের তলায় পিষ্ট হয়েই একসময় বৈষম্যের অবসান ঘটবে।

