বিশেষ প্রতিনিধি
খরায় ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা সুনামগঞ্জের আমনচাষীরা। অনেক আমনচাষী এবার ধানের আবাদের চিন্তা বাদ দিয়েছেন। কৃষি অফিস অবশ্য দাবি করেছে, লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ধানের আবাদ হবে। জেলার বিশ^ম্ভরপুরের বাঘগাঁওয়ের বড় আমনচাষী ফরিদ আলম বললেন, ‘খরচায় পুষায় না, এর লাগি খেতে ধান করতামনায়’।
আমনচাষী ফরিদ আলম বললেন, ‘৩৬ কেয়ার (১২ একর) খেতে আমন লাগাই, টানে ইরি-পাইজং, লামার খেতে মালতি, গান্ধি ও বিরই ধান লাগাই। মাইর-টাইর না গেলে (কোন কারণে নষ্ট না হইলে) প্রতি কেয়ারে ১০-১২ মণ ধান অয় (হয়)। পাওয়ার টিলার দিয়া হাল চাষ করতে এক হাজার টেকা (টাকা) লাগবো, গত বছর খরচ গেছে ৬০০-৬৫০ টেকা, ডিজেল কিনছিলাম ৬৮ টেকা লিটারে, ইবার ১২০ টেক লিটারা, কামলা খরচ আছিল দিনে জনপ্রতি ৩০০ টেকা, ইবার ৫০০ টেকা, খড়ায় খেত শুকাই গেছে, খেত করতে অইলে আগে পাওয়ার পাম্প দিয়া সেচ দেওন লাগবো, পরে পাওয়ার টিলার দিয়া হালচাষ করা, ধান কাটা-মাড়া, সবতায় (সবকিছু) মিইল্লা (মিলে) গত বছর কেয়ারে খরচ গেছিল ১০ হাজার টেকা, ইবার যাইবো ১৫ হাজার টেকা, ফসল অইলে (হলে) ধান পাইমু ১২ মণ, খেত কইরা খরচায় পুষায় না, এর লাগি ধানও করতাম নায়।’
বাঘবাগাঁওয়ের পাশের গ্রাম শাহ্পুরের বর্গচাষী হারুন মিয়া জানালেন, গেল আমন মৌসুমে ১০ কেয়ার (৩ একর এক কেয়ার) জমি চাষাবাদ করে (নিজের এবং পরিবারের শ্রমের মজুরি’র হিসাব ছাড়া) তার খরচ হয়েছিল ৭০ হাজার টাকা, ধান পেয়েছিলেন ৮০ মণ, কোনভাবে লাভের মধ্যে ছিলেন, এবার হাওর খরায় শুকিয়েছে, পানির জন্য খেতে ধান লাগাতে পারছেন না, বৃষ্টির আশায় আছেন, বৃষ্টি না হলে পাওয়ার পাম্প দিয়ে জমিতে পানি দিতে হবে। ডিজেলের এবার যে দাম খরচ অনেক বেড়ে যাবে। জমি চাষাবাদ ছাড়া তার হাতে আর কোন কাজ নেই। বললেন, ‘বড় মুশকিলে পড়েছি ভাই’।
কেবল বিশ^ম্ভরপুরের ফরিদ আলম বা হারুন মিয়া নয় জেলাজুড়ে আমনচাষীরা ‘মুশকিলে’ পড়েছেন।
দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ফাতেমানগর গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ জানালেন, প্রতি কেয়ার জমিতে ট্রাক্টর মালিককে তিন-চারশ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে, শ্রমিকের মজুরিও বেড়ে গেছে, নিজের জমি পতিত যাতে না যায়, এজন্য চাষাবাদ করেছেন। উৎপাদন ভালো হলেও এবার খরচ আর উৎপাদিত ধানের আয়ে সামঞ্জস্য থাকবে না।
সরমঙ্গল ইউনিয়নের নওয়াগাঁও গ্রামের আমন চাষী মো. মিছির আলী বললেন, ভয়াবহ বন্যায় আমন চাষাবাদ ১৫ দিন পিছিয়ে গেছে। এখন খড়ায় জমি শুকিয়েছে। ডিজেলের মূল্য বেড়েছে। কিভাবে কি করবেন- বুঝতে পারছেন না। আমন ধানের জমি না করলে গরু’র খড় পেতে সমস্যা হয়। জমি চাষাবাদ করলেও বিপদ, না করলে আরও বেশি বিপদ।
ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, প্রচ- খরায় জমি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া জমিতে আগে সেচ দিতে হবে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করবেন না।
কৃষকরা জানালেন, প্রচ- খরায় চাষাবাদ করা আমন জমিতে পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। বিশ^ম্ভরপুরের কৃষক ফরিদ আলম বললেন, বড়বন্দের হাওরে লাগানো আমন জমিতে পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। এটি আরেক বিপদ।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দিন টিপু বললেন, বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক চাষী আমনের চারা রোপন করতে পারছে না। রোপণ করা জমিতেও খড়ায় পাতামাছি, মাজরা এবং থ্রিপস পোকার আক্রমণ আছে কোথাও কোথাও। এসব জমিতে সেচ দেবার এবং ডায়াজিনন গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা বিমল চন্দ্র সোম জানালেন, জেলায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে এবার আমন চাষাবাদ হয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৭ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। বন্যায় চাষাবাদ কয়েকদিন পিছিয়েছে, এখন খড়া হলেও সেচের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ডিজেলের দামের সঙ্গে উৎপাদিত ফসলের দামও বেড়েছে জানিয়ে তিনি দাবি করলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় চাষাবাদ কমবে না। বৃষ্টি হলে অনেক সমস্যাও মিটে যাবে।
- ৯ বছরেও সেতুর এপ্রোচ হয়নি/ ভোগান্তিতে রক্তিপাড়ের ৫০ গ্রামের লাখো মানুষ
- চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান বিডব্লিউসি’র


