ইকবাল কাগজী
দুই ॥ তাঁর একটি চিৎপ্রার্ষিকতা ছিল, যাকে বলি, মননের সাংস্কৃতিক দার্ঢ্য
আমাদের সমাজে এমন লোকেরা আছেন যাঁরা নিজের নামের পেছনে বিভিন্ন সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের পদপদবীপদক (সভাপতি, সম্পাদক, সদস্য, উপদেষ্টা) ইত্যাদির তালিকা বাড়ানোর সদিচ্ছা মনের ভেতরে পোষণ করে থাকেন এবং ক্রমাগত ক্রয় করতে থাকেন একটির পর একটি। এমনকি তাঁরা রঙবেরঙের সম্মাননা, পুরস্কার, ক্রেস্ট ইত্যাদি সংগ্রহ করেন অনবরত এবং সাগ্রহে, তারপর বিরাজ করেন আত্মশ্লাঘার তুড়িয়ানন্দের চূড়ায়। এই তো গত ক’দিন আগে ‘সুনামগঞ্জের সাহিত্য পুরস্কার’ নিলেন কেউ কেউ, শিল্পকলার মঞ্চে সাড়ম্বর অনুষ্ঠান করে এবং ট্যাঁকের টাকা নাকি দশ হাজার করে সাগ্রহে গচ্ছা দিয়ে। একেই বলে মুক্তবাজার অর্থনীতির সব কীছু পণ্যায়নের প্রকরণের পরাকাষ্ঠা।
খসরু ভাইকে নিয়ে অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিস আলী বীর বিক্রম লিখেছেন গত বরিবারের সু.খবরে। তাঁর লেখাটার শিরোনাম, ‘সুনামগঞ্জবাসী নির্ভরযোগ্য অভিভাবক হারাল’। তিনি কী কী ছিলেন তার একটা ফিরিস্তি আছে সে-লেখায়। সে-ফিরিস্তিটার বিস্তর বিস্তৃতি প্রশংসার তুঙ্গতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছে, বুঝাই যায়। জনাব আলী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেই পারেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কথা হলো, প্রশংসা প্রকাশক কথিত ফিরিস্তিটি আমার নজর কেড়েছে এবং এবং আমি হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছি যে, কোনও কোনও মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের নিজেদের নামের পেছনে পদপদবিপদকের তকমা সাঁটার পেছনে ছুটেন না, বরং পদপদবিপদক তাঁদের পেছনে ছুটে, হন্যে হয়ে। খসরু ভাই এই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। তাঁর সব পদপদবি বিষয়ে বিস্তর বাকবিস্তারের কোনও প্রয়োজন নেই। দুয়েকটির কথা বললেই যথেষ্ট। যারা বোঝার তাঁরা বোঝে যাবেন। জনাব আলী উল্লেখ করেছেন, খসরু ভাই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। এই পদপদবীর নির্গলিতার্থ বিশ্লেষণ করে যে-কেউ তাঁকে একজন প্রতিথযশা শিক্ষানুরাগী রূপে চিহ্নিত করতেই পারেন এবং যদি করেন তবে সেটা অপাত্রে কন্যাদানপ্রায় অপকর্ম হয়ে যাবে না। কিংবা ধরুন, তিনি ছিলেন, ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’-এর পুরোহিত ও কেন্দ্রীয় সভাপতি। এই সংগঠনটি সুনামগঞ্জের তৃণমূল মানুষ কৃষকদের জীবন সংগ্রামে ওতপ্রোত আছে, বোধ করি থাকবে এবং খসরু ভাইয়ের প্রতিবাদী ও সংগ্রামী ভূমিকার পতাকা উড্ডীন রাখবে।
বলা বাহুল্য, খসরু ভাই যে-সমাজের মানুষ ছিলেন, সে-সমাজটি একটি শ্রেণিবিভক্ত শোষণভিত্তিক সমাজ। এখানে যাঁরা ধনাঢ্য হয়ে উঠেন তাঁরা অনবরত তৃণমূলের মানুষকে শোষণ করেই যাবতীয় জাগতিক সম্পদ সঞ্চয় করে থাকেন। এমনকি যাঁরা ‘দানবীর’ পদবিতে বিভূষিত হন তাঁরা প্রথমে সম্পদশোষণের কর্মযজ্ঞের পুরোহিত হয়ে মানবিকতার বিপরীতে দানবিকতাকেই জীবনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিপুল ধনভা-ার অর্জনের পর দানবীর খেতাবের আড়ালে নির্বিঘেœ আরও বড় দানব হওয়ার ভ-ামিতে প্রবল বিক্রমে নিয়োজিত হয়ে পড়েন। লোক-দেখানো এই কর্মকা-ের বা ভ-ামির বিষয়ে ফিরিস্তি দেওয়ার অবকাশ এখানে নেই। প্রসঙ্গটির অবতারণা না করলেও চলতো, কিন্তু এই অপ্রিয় প্রসঙ্গটিকে এড়িয়ে গেলে খসরু ভাইর ভেতরের মানুষটির রূপস্বপটির লাবণ্যেকে একটু খতিয়ে দেখা, একটু পরখ করার মওকাটা পাওয়া যেতো না, হারিয়ে যেতো। আমি সে-সুযোগটা হাত ছড়া করতে চাই না। যেহেতু তাঁকে নিয়ে দুয়েকটি কথা লিখতে বসেছি।
খসরু ভাইকে নিয়ে, খসরু ভাইকে নিয়ে কি, আসলে যে-কোনও মানুষকে নিয়ে বলার কথাগুলো কী হতে পারে ? কখন তিনি আমার জন্য কী করলেন, আমাকে কী দিলেন, আমি তাঁর জন্যে কী করেছি, আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল, এইসব নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয়াদির বিস্তৃত বয়ার্ণনাই (বয়ান+বর্ণনা) কি একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের সামগ্রিকতা? ব্যাপারটা মোটেও তেমন কীছু নয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বাদ দিয়ে তো নয়ই, আসলে বিষয়টা ব্যক্তিগত বিষয়নম্পর্কগুলোকে অতিক্রম করে ব্যাপকতরভাবে ব্যাপক ও সামাজিক-রাজনীতিক অন্যান্য যাবতীয় বিষয়াদিরও অন্তর্ভুক্ত এবং সে-ভাবেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে, অন্যভাবে নয়।
খসরু ভাইর ধন ছিল না এমন নয়, কিন্তু তিনি বোধ করি যাকে বলে ধনাঢ্য কেউ ছিলেন না। ধনাঢ্য হতে গেলে যে-বিপুল পরিমাণ অর্থ-বিত্তের মালিক হতে হয়, বলা বাহুল্য তাঁর ধনের পরিমাণ সে-মাত্রাকে স্পর্শ করে নি, তুলনায় বরং তাঁর ধনের পরিমাণটা অতি ক্ষুদ্র, অর্থাৎ প্রকৃত ধনীদের তুলনায় তিনি নিতান্তই এক চুনোপুটি ছিলেন। আমাদের সমাজে যাঁরা কোটি কোটি টাকার মালিক, অর্থাৎ যাঁরা বিপুল পরিমাণ টাকার মালিক কিংবা বিরাট ধনী, বিদেশে গাড়ি বাড়ি আছে, সুইস ব্যাঙ্কের গোপন তহবিলে বিপুল পরিমাণ টাকা আছে, তাঁদের আয়ের উৎস অবশ্যই তৃণমূলের মানুষের শ্রমশোষণ কিংবা কদর্থে চুরি ভিন্ন অন্য কীছু নয়। তা ছাড়া দেশপ্রেমের মাপকাঠির নিরিখে তাঁদের উপার্জিত অর্থ অবশ্যই বৈধতা হারায়, কারণ তাঁদের অর্থ দেশের ব্যাঙ্কে রাখা নেই, বিদেশের ব্যাঙ্কে রাখা হয়েছে, সে-টাকা দেশের কোনও কাজে লাগে না অথচ তা উপার্জিত হয়েছে এই দেশের মানুষের শ্রমের অংশ থেকে আলাদা করে নিয়ে এবং এতে করে তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, তাঁদের দেশপ্রেম বলে কীছু নেই। দেশকে তাঁরা ধনোপার্জনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেন মাত্র। আর যাঁদের দেশপ্রেম নেই তাঁরা কীছুতেই, কোনও যুক্তিতেই, উত্তম নাগরিক বলে বিবেচিত হতে পারেন না। তাঁদের ভূমিকা একাত্তরের রাজাকারের ভূমিকার চেয়ে উত্তম কীছু নয়। খসরু ভাইর ধনের উৎসকে তৃণমূলের মানুষকে শোষণের পর্যায়ে তো ফেলা যায়ই না, এমনকি যাঁরা বিভিন্ন অসদোপায় অবলম্বন করে ধনসঞ্চয় করেন, সে-সব অসদোপায়ের কোনওটিতেও পড়ে না। অথচ তার কীছু না কীছু হলেও ধন তো ছিলই, সেটাও অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এই ধনটুকুর মালিক হওয়ার যোগ্যতা সত্যিকার অর্থেই তাঁর ছিল, সে-টার পেছনে কোনও অসদোপায় ছিল না।
একটু বাঁক ফেরা যাক। খসরু ভাইকে আরও একটু বেশি করে বোঝার স্বার্থে একটু অন্য দিক ঘুরে আসা যাক। আমরা যখন দেখি কোনও বাস চালকের সহকারী দু’চার বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে কোনও একটা শহরের শতাধিক বাসাবাড়ির মালিক বনে যায়, তার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কতো সে নিজেও তার হিসাব জানে না, সরকারী দলের কেউকেটাও হয় অনায়াসে, এই রাজনীতিক কেউকেটা বনে ধরাকে সরা জ্ঞান করে সামরিক বাহিনীর আস্ত একটি কোম্পানিকে নগদ অর্থে ক্রয় করে ফেলে, বাণিজ্যস্বার্থের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মানুষ খুন করতে কাজে লাগায় সেনাসদস্যদেরকে। কিংবা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিদ্যায় বকলম হলেও বাণিজ্যমেধায় অধ্যাপকের মর্যাদায় উন্নিত হয়ে ভুমিখেকো, ইয়াবাব্যবসাযী, সন্ত্রাসের হোতা, খুনী, ধর্ষক ইত্যাদি হয়ে সমাজটাকে দুমড়েমুচড়ে দলা পাকিয়ে ছাড়ছে সমাজের মাথায় চড়ে বসে কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে কেউ কেউ এবং প্রকারান্তরে যাকে বলে সমাজের প্রভু হয়ে বসেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি সে-প্রভুত্ব অর্জনের পথ তো খসরু ভাইর জন্যে খোলাই রেখেছিল, তিনি সে-পথে ভুল করেও কস্মিনকালেও হাঁটেন নি। তিনি এমন অসংস্কৃত মননের কেউ ছিলেন না। বিদ্যানদের মধ্যে এমন শয়তান যে কেউ নেই এমন তো নয়, তিনিও এমন কেউ হতেই পারতেন। কিন্তু হন নি। তিনি স্বোপার্জিত সম্পদ তাঁর পরিবার প্রতিপালন ও সন্ততিদের মানুষ করার এবং তারপর সমাজতিতৈষণার কাজে ব্যবহার করেছেন। আমাদের ভাগ্য যে তাঁর মতো সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ তো এই সমাজে এখনও আছেন। তাঁরা আমাদের নমস্য। যাঁরা নিজেদের মেধা ও একজীবনের শ্রম খাটিয়ে যা অর্জন করেন, তা নিজের বাঁচার জন্যে যা প্রয়োজন তার অতিরিক্তটা মানুষের জন্য ব্যয় করেন, সমাজের উপকারে কাজে লাগান। নিজের পকেট ভারি করার লোভে, ক’টি টাকার জন্যে মুনাফার পেছনে সারা জীবন ছুটে, সমাজটাকে অসামাজিক ও অমানবিক করে তোলার কাজে ব্যয় করেন না। খসরু ভাই হাতে গোণা সেইসব মানুষদের মধ্যে একজন। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।
সম্পদ সম্পর্কে একটি কথা আছে, কেউ কেউ বলেন, অসংস্কৃত মানুষের হাতে সম্পদ সঞ্চিত হলে, সে-সম্পদ সমাজেকে নিগৃহীত করে। মানুষের উপর সম্পদের এই অত্যাচারের চূড়ান্ত রূপ যুদ্ধ। ধনীরা অর্থোপর্জনের জন্যে, অর্থাৎ মুনাফা লাভের জন্যে রীতিমতো পরিকল্পিত প্রকরণে যুদ্ধ সংঘটিত করে। পৃথিবীতে দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে পৃথিবীর ধনকুবেরদের ধনলাভের লোভকে চরিতার্থ করার জন্যেই, এর অন্য কোনও কারণ নেই। বিশ্বজুড়া এই যুদ্ধবাজ ধনকুবেরা চূড়ান্ত আকারের অসংস্কৃত মানুষ। এদের ক্ষুদ্র সংস্করণকে আমরা পরিরক্ষিত করে থাকি আমাদের সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে। তারা কেউ হয় তো বা কোনও আমলা মুৎসুদ্দি অথবা কোনও রাজনীতিক দলের পা-া। আবার তারা কেউ হয় তো বা কোনও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, কোনও সরকারি দলের জেলা-উপজেলার কোনও সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদক, নিদেনপক্ষে কোনও বড় ব্যবসায়ী অথবা কোনও চোরাচালনী, ইয়াবাব্যবসায়ীও হতে পারে। যারা প্রতিনিয়ত সমাজটাকে শোষণ করে আখের মতো ছুবড়া বানিয়ে চলেছে, সন্ত্রাস করেই চলেছে এবং সমাজটাকে অন্যায় অত্যাচারের রাজত্ব করে রেখেছে। খসরু ভাই এইরূপ অসংস্কৃত কেউ ছিলেন না। তাঁর একটি চিৎপ্রার্ষিকতা ছিল, যাকে বলি, মননমেধার ভেতরে সাংস্কৃতিক দার্ঢ্য। মানবিকতার অগ্নি¯œানে শুদ্ধ হয়ে যে-শুভ্রতার আলো মানুষের মননের সংস্কার সাধন করে মনের অন্ধকার দূর করে, বিদগ্ধজনেরা তাকেই বলেছেন চিৎপ্রাকর্ষ।


