খসরু ভাইকে নিয়ে দুয়েক কথা

ইকবাল কাগজী
তিন ॥ পাঠাগারের সঙ্গে ডিকড়া (দিগদাড়া) দেওয়া মানুষ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
খসরু ভাই বলে কথা। তিনি আসতে না আসতেই আড্ডার চাড্ডা হয়ে উঠার পথটা প্রশস্ত হওয়ার দিকে জোর কদমে কয়েক ধাপ টপকে একেবারে সুনিশ্চিয়তার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনীতি হলো। তিনি কীছুক্ষণের মধ্যে অফিস সহকারি কাউসারকে ডাকলেন এবং তাঁকে মিষ্টি আনার নির্দেশ দিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর উপস্থিতির প্রভাবে আড্ডার রঙঢঙ দুটোই আপাদমস্তক পাল্টে গেছে। অসংযত বাচনিকতাকে যথাযথভাবে সংযত হওয়ার লাগাম পরিয়ে একবারে চুস্ত শোভন সংস্কৃত করে তোলা হয়েছে। কিন্তু সেজন্য কারও মধ্যে কোনও মনোক্ষুণœতার আলগা আঁচড় লেগেছে এমনও নয়, বরং সকলেই যেনো আরও প্রফুল্ল আরও সতেজীব (সতেজ+সজীব) হয়ে উঠেছেন, নিজেদের মধ্যে খসরু ভাইকে পেয়ে। এখানে যাঁরা আছেন তিনি (খসরু ভাই) সকলেরই বয়সে বড়।
এই বড়ত্বের একটা ভার আছে। এই ভারটার মর্যাদা রাখতে পারেন তিনি তুলনাহীনভাবে, সকলে যা পারেন না। নিজের চেয়ে বয়সে কম বয়সী তরুণদের সঙ্গে মিশে জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠতে তাঁর মতো পারদরঙ্গমতা (পারদর্শী+পারঙ্গম+তা) সকল প্রবীণের সাধ্যে কুলায় না। এজন্য চাই উত্তরাধুনিক চিন্তাচেতনার সারনির্যাসের রসে নিজের মননমেধাকে সম্যক সম্পন্ন করা, অর্থাৎ চিৎপ্রাকর্ষিকতা অর্জন করা, এককথায় উত্তমরূপে উত্তরোত্তর সাংস্কৃতিক হয়ে উঠা। এই চিৎপ্রাকর্ষিকতা অর্জন করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাঁর জীবনযাপনের স্বাভাবিকতার মধ্যে নিহিত ব্যতিক্রমী এই চিৎপ্রাকর্ষিকতা তাঁকে তরুণদের সঙ্গে অড্ডা-চাড্ডায় নিতান্ত সহজ স্বাভাবিক করে তোলেছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি এতে এতোটাই পাকা ও স্বচ্ছন্দ ছিলেন যে, অবাক হতে হয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এইভাবে শিং ভেঙে বাছুরের দলে মিশে যাওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন যদি হতেন আমাদের সকল প্রবীণেরা তবে কতোই না ভালো হতে এই সমাজের, আর সমাজটা নবীন-প্রবীণের সম্মিলিত প্রয়াসে এগিয়ে যেতো তরতর করে, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক প্রাকর্ষিকতায় পিছিয়ে থাকতো না।
একসময় রসগোল্লা এলো, বিতরিত হলো, তৃপ্তির সঙ্গে গলাধঃকরণ শুরু হলো । একজন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। প্রাশ্নিকতার উত্তাপে গলতে গলতে তিনি প্রশ্নপর হলেন এবং যথাবিধি জানতে চাইলেন এই বিশেষ মিষ্টিমুখের রহস্য কী। খসরু ভাই যা বললেন তার নির্গলিতার্থ এই যে, আজ তিনি মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন না, কাগজী মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। টাকাটা তিনি দিয়েছেন মাত্র, এর একটি কারণ আছে। এরপর যথারীতি কারণটা ব্যাখ্যা করা হলো। কারণটা সেদিন তিনি যতোটা খোলাসা করে বলেছিলেন, আমি আজ ততোটা খোলাসা করে বলতে পারবো না, রহস্যকথা একটু হলেও রহস্যের আড়ালে থেকে যাবে এবং বোধ করি সেটাই আপাতত শোভন হবে। তবে খসরু ভাইর এইভাবে মিষ্টিমুখ করানোর কারণের পেছনে তাঁর চিৎপ্রাকর্ষিতা কেবল নয়, অনুজ একজনকে অপরূপ এক অদৃশ্য হাতে স্পর্শ করে সাদরে ¯েœহসিক্ত করার সঙ্গে প্রচ-ভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার এই করণকৌশল আমাদের সমাজে সকলের জানা থাকে না, কোটিতে গোটিকের থাকে। এই কোটিতে গোটিকের একজন হলেন খসরু ভাই। আমাদের না হলেও আমার পরম ভাগ্য যে, তাঁর মতো মহান মানুষের সংস্পর্শে আসার আমার সুযোগ হয়েছিল।
মিষ্টি খাওয়ানোর কারণের কেচ্ছাটা সংক্ষেপে একটু বলি। মিষ্টি খাওয়ানোর কদিন আগে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। প্রবন্ধটির নাম বোধ করি ছিল, ‘একজন জগৎজ্যোতির জন্য পৃথিবী কখনও শূন্য থাকে না’। লেখাটা তার খুব পছন্দ হয়েছিল। পছন্দের কারণ বোধ করি এটাই যে, প্রবন্ধটি ছিল একজন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অন্য একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধার অবমাননাকর অবস্থানের বিরুদ্ধাচরণ করে একটু আক্রমণাত্মক সমালোচনা।
খসরু ভাই জগৎজ্যোতির সহযোদ্ধা ছিলেন না, কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধ না করার দূরভিসন্ধিমূলক অপসংস্কৃতি তাঁর স্বভাবে কখনওই ছায়া ফেলে নি। বরং তিনি মনে করতেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সকল মানুষের নির্বিচারে সম্মানের পাত্র, মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে যে-রক্তমাংসের মানুষ থাকে যদিও তাকে সমালোচনা করা যায়, রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে যে-মুক্তিযোদ্ধার অবস্থান সেই চেতনাগত মুক্তিযোদ্ধা অবশ্যই যে-কোনও যুক্তিতে সমালোচনার উর্ধে, এই চেতনাগত মুক্তিযোদ্ধাকে সমালোচনা করা যায় না। যদি কেউ এই চেতনাগত মুক্তিযোদ্ধাকে সমালোচনা করে, তবে সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই সমালোচনা করে, এবং তাহলে ধরে নিতে হবে যে, সে আস্ত একটা রাজাকার কিংবা রাজাকারজিবিতায় ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ, মানুষ নামের একেবারেই অবান্তর। মুক্তিযোদ্ধাকে কোনওরকম অবহেলা না করার সংস্কৃতিকে লালন করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মানকে সমুন্নত রেখে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়াই হবে মুক্তিযুদ্ধ করে অর্জিত স্বাধীন দেশের যে-কোনও মানুষের নৈতিকতার অপরিহার্য অংশ, বাংলাদেশে এর কোনও বিকল্প নেই। বোধ করি, এই বোধে উজ্জীবিত হয়ে খসরু ভাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতির উপর বিরূপ কারও উপর মনে মনে খুব রেগে গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই রাগ আমার লেখার প্রশংসার স্বরূপ ধরে সুসংস্কৃত উপায়ে ঝরে পড়েছিল, অপার আনন্দের ধারায়। মাঝপথে আমার লেখাটি গৌবান্বিত হয়েছিল এবং আমাকে প্রকারান্তরে অভূতপূর্ব প্রশংসার সোনায় মোড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি, নিজের আনন্দকে উপভোগ করার জন্যে। আমার লেখা দাঁতভাঙা সব শব্দচয়ন-প্রয়োগে কঠিন ও অনেকটাই দুর্বোধ্য হয়ে উঠে, যে-খসরু ভাইর এমন অভিযোগ ছিল, সেই তিনি, আমার লেখার প্রশংসা করলেন লাইব্রেরির চাড্ডাকে মিস্টি খাইয়ে দিয়ে। সে কথা কি ভুলা যায়?