বিশেষ প্রতিনিধি
খাদ্য দ্রব্যের সঙ্গে চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে দুর্ধর্ষ চুরি’র ঘটনা শুরু হয়েছে। এই ধরনের অপরাধকর্ম এ বছরই শুরু হয়েছে, এর আগে ঘটেনি সুনামগঞ্জে। গত রোববার রাতে মল্লিকপুরের এক কুয়েত প্রবাসী এবং এর আগে গত ৭ মে দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের জালালপুরের এক সৌদি প্রবাসীর বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটেছে। এই দুটি ঘটনায়-ই চোরেরা ঘরের আলমিরাগুলো ভেঙে এবং মহিলাদের গলায় থাকা স্বর্ণালংকারসহ সবকিছু নিয়ে গেছে। অর্থাৎ পরিবারের সদস্যদের অজ্ঞান করে এক ধরনের ডাকাতি’র ঘটনা ঘটিয়েছে চোরেরা। এই দুটি ঘটনার সংবাদ যারাই শুনেছেন তারাই আতংক অনুভব করছেন। শহরের বিভিন্ন মহল্লার একাধিক বাসিন্দা বলেছেন,‘এই পদ্ধতিতে কারো বাড়িতে চোর ঢুকে যা খুশি তাই করতে পারবে, ঘরের সদস্যরা তো বুঝবেই না, পাশের ঘরের বা প্রতিবেশিরাও টের পাবে না’।
রোববার রাতে শহরের মল্লিকপুর এলাকায় এক কুয়েত প্রবাসির ঘরের সবাইকে অজ্ঞান করে দুর্বৃত্তরা ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ দেড় লাখ টাকা নিয়ে গেছে। ওই প্রবাসিসহ পরিবারের ৭ জনকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে, অবস্থা গুরুতর হওয়ায় পরে ৫ জনকে সিলেটের রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং এরপর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ এবং ঐ প্রবাসীর বাড়ির লোকজন ঘরে স্প্রে করে এই দুর্ধর্ষ চুরি হয়েছে দাবি করলেও ডাক্তাররা বলছেন,‘ঘরে স্প্রে করে নয়, খাদ্য দ্রব্যের সঙ্গে চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে এমন ঘটনা ঘটানো হতে পারে’। কুয়েত প্রবাসী মোস্তফা আলীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেও ডাক্তারদের মতামত-ই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে।
ঘটনার দিন ঐ পরিবারের যে সব সদস্য রান্না ঘরের খাবার খাননি তারা সুস্থ ছিলেন এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার আগে যারা খাবার খেয়েছিলেন তারাও সুস্থ ছিলেন।
মোস্তফা আলীর স্ত্রী সুহেলা বেগম ঘটনার দিন সিলেটে ছিলেন। রাতে এসে ঘরের রান্না করা খাবার খাননি, তিনি সুস্থ ছিলেন। মোস্তফা আলীর নাতি ১১ মাসের শিশু মুহিত ও ১০ মাসের শিশু মিফতাহ্ রান্না করা খাবার খায়নি, তারা সুস্থ রয়েছে। সন্ধ্যা ৭ টায় রান্না করার পর পরই ভাত খেয়েছিল পরিবারের ৪ বছরের শিশু আমান, সেও সুস্থ রয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার পর ঐ বাড়িতে একজন আত্মীয় এসেছিলেন বলে জানা গেছে। এরপর থেকে যারাই রান্না করা খাবার খেয়েছেন সকলেই অজ্ঞান হয়েছেন। অবশ্য পরিবারের সদস্যরা কাউকে সন্দেহ করেন এমন তথ্য পুলিশকে জানাননি। তবে প্রবাসী মোস্তফা আলীর ওই আত্মীয় পুলিশের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
মোস্তফা আলী বলেছেন,‘আমার ধারণা কমপক্ষে ৩ জন চোর ঘরের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল, এবং চুরি করে চোরেরা কলাপসেবল গেইটের তালা ভেঙে সকাল হবার আগে কোন এক সময় বেরিয়ে যায়’। মোস্তফা আলী জানান, বুধবার বিকালে পুলিশ এসে রোববার রাতে যে তরকারি রান্না হয়েছিল, ফ্রিজে রাখা ঐ তরকারি নিয়ে গেছে।
এর আগে গত ৭ মে রাতে জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের পল্লীতে সৌদী প্রবাসী একই পরিবারের ৬ জনকে অজ্ঞান করে সবকিছু লুটপাট করা হয়েছিল। অজ্ঞান হওয়া ঐ পরিবারের ৬ সদস্যকেই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
ডাক্তাররা তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে ছিলেন ‘প্রবাসীর ঐ স্ত্রীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল’।
প্রবাসীর ভাই নাছির উদ্দিন তাৎক্ষণিক বলেছিলেন, ‘শুক্রবার (ঘটনার রাত) রাত ১১ টায় প্রবাসী’র স্ত্রী’র ধর্মীয় আত্মীয় পরিচয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসেন এক যুবক। ঐ যুবক মিষ্টি, রসমালাই ও জুস সঙ্গে নিয়ে আসে। রাতে মিষ্টি, জুস পরিবারের সকলকে খেতে দেওয়া হয়। এর ১০-১৫ মিনিট পর কিছুই বলতে পারেননি তারা’।
এই দুটি ঘটনা যারাই জেনেছেন আতংক অনুভব করছেন।
মল্লিকপুরের ( ৮ নম্বর ওয়ার্ডের) কাউন্সিলর আহমদ নূর বলেন,‘আমরাও ধারণা করছি খাবারের সঙ্গেই চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এটি ভয়ংকর ঘটনা, যত নিরাপত্তাই থাকুক, এভাবে চেতনানাশক কিছু খাইয়ে নির্বিঘেœ যে কোন বাড়িতে বড় ঘটনা ঘটানো সম্ভব’।
মান্নানরগাঁয়ের রফিক মিয়া বলেন, ‘জালালপুরের দুর্ধর্ষ ঘটনার পর এলাকার অনেকেই আতংকিত হয়েছিলেন’।
সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন,‘ইনহেলার এনেস্তেসিয়ার কার্যকারিতা এয়ারটাইট ঘর ছাড়া বেশিক্ষণ থাকবে না, ঘরে চেতনানাশক রাসায়নিক ছেড়ে এমন ঘটনা ঘটানোর মতো ঘর দোয়ারাবাজারের জালালপুরেরটাও ছিলা না, মল্লিকপুরের ঘরও এমন ছিল না বলেই শুনেছি। আমাদের ডাক্তারদের মধ্যে যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করেন, তারা বলেছেন কোন একটি খাবারদ্রব্যের সঙ্গে চেতনানাশক রাসায়নিক মেশানো হয়েছে, যারা এই খাবার খেয়েছেন তারাই অসুস্থ হয়েছেন বা অজ্ঞান হয়েছেন’।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘দোয়ারাবাজারের জালালপুরের ঘটনার সঙ্গে গাইবান্ধার এক ব্যক্তি জড়িত ছিল, তার ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে না। ওখানেও পরিবারের সকলকে চেতনানাশক কিছু খাইয়েই চুরির ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। শহরের মল্লিকপুরেও একইভাবে ঘটনা হয়েছে, এ ঘটনায়ও পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ১-২ জন রয়েছে, বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে, সুনামগঞ্জে এটি নতুন ধরনের অপরাধ, এর সঙ্গে স্থানীয়রা জড়িত আছে। তবে বাইরের অপরাধীরা এই অপরাধের মূল হোতা, পুলিশকে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে আরো বেশি কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’।
- পোস্টাল অর্ডারের জন্য হাহাকার বিপাকে জজকোর্টে চাকুরিপ্রার্থীরা
- অ্যাথলেটিকসে নিষিদ্ধ, ঝুলে আছে পুরো রাশিয়ারই অলিম্পিক-ভাগ্য


