খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অনিয়ম বাতিলকৃত ৬ ডিলারই সরকার দলীয় কর্মী

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলার ১১ উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণের জন্য নিয়োগকৃত ডিলারদের মধ্যে গত এক মাসে ৬ জনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। এদের ৩ জনকে আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছে। কালো তালিকাভুক্ত ডিলারদের সকলেই স্ব স্ব স্থানে সরকারী দল আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায়, কেউবা চালের বস্তার সঠিক হিসাব দিতে না পারায় এমন আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীলরা মনে করেন, ‘দরিদ্রদের ১০ টাকার চাল প্রদানে যারা অসহযোগিতা করবে, তারা দেশের শত্রু, দলেরও শত্রু। এরা কর্মী নয়, এরা অসহযোগিতাকারী, এদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে’।
সুনামগঞ্জে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণের জন্য ১৭২ জন ডিলার নিয়োগ হয়েছিল। নিয়োগকৃত ডিলারদের বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসাবেই পরিচিত। গত এক মাসে অনিয়মের জন্য ৬ জনের ডিলারশিপ বাতিল করে, ৩ জনকে আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ১ জন ডিলার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে। তাছাড়া বাতিলকৃত এই ৬ জনের বাইরে দোয়ারাবাজারে ৩ জন এবং দিরাইয়ে ১ জন স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন। এই অবস্থায় ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন। এখনো জেলার অনেক এলাকা ডিলারশিপ শূন্য রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার জামালগঞ্জে হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত ১০ টাকা দরের ১০২ বস্তা চাল একটি রাইস মিল থেকে সোমবার সন্ধ্যায় জব্দ করা হয়েছে। উপজেলার সাচনাবাজার ইউনিয়নের রামনগর বাজারের ডিলার পয়েন্টের পাশে আঞ্জু মিয়ার মিল থেকে এসব চালের বস্তা আটক করা হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী ডিলার মোতাসিম বিল্লাহ্’র ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। জামানত বাজেয়াপ্ত এবং আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া ছাতকের গোবিন্দগঞ্জের যুবলীগ কর্মী ওবায়দুর রহমান বাবলু’র এবং বিশ্বম্ভরপুরের পলাশের মনিরুজ্জামানের ডিলারশিপ পয়েন্টে চালের বস্তার হিসাবে গড়মিল পাওয়ায় ডিলারশিপ বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত করে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই উপজেলার দক্ষিণ খুরমার আজিজুর রহমান, জাতুয়ার আব্দুল কাদিরের ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে। তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্ত হবে কী না এই বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। অন্যদিকে, দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব চালের ডিলার চন্দন মজুমদার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। এই পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলার যাদের ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে, তারা সকলেই স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ কর্মী হিসাবে পরিচিত।
সরকারের এতো বড় একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দলীয় কর্মীদের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি অ্যাড. আপ্তাব উদ্দিন বলেন,‘সরকার এই বিষয়ে কঠোর। দলীয় কর্মীরা এই কর্মসূচিতে পাহাড়াদারের ভূমিকায় থাকবে। দলের কর্মী হয়ে কেউ এই কর্মসূচিতে অনিয়মের আশ্রয় নিলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই দলের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ’।
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বলেন,‘এই কর্মসূচিতে কেউ ত্রুটি করলে আইনের আওতায় আনা হবে বলে বার বারই দলের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। এরপরও কেউ অনিয়ম করলে, সে যদি দলের হয় সংগঠনের তৃণমূলের কমিটিকে তার বিরুদ্ধে সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে’।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, জেলা পরিষদ প্রশাসক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন,‘১০ টাকার চাল বিতরণ সুষ্ঠুভাবে করার জন্য প্রশাসনের নজরদারী বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযোগ যাচাইও সঠিকভাবে করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী-দলীয় সভানেত্রী দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করার জন্য এই কর্মসূচি শুরু করেছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মী কেউ চালের ডিলারশিপ নিয়ে অনিয়ম করলে, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন,‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দেবার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যারা এই কর্মসূচিতে যারা অসহযোগিতা করবে তারা দলের কর্মী নয়, শত্রু এবং অসহযোগিতাকারী। সুতরাং অবশ্যই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবু নঈম মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,‘জেলায় ৬ জনের ডিলারশিপ বাতিল এবং ৪ জন স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন। ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন। আরো ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ হলেই যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খাদ্যবান্ধব চাল প্রাপ্যদের তালিকা যাচাই-বাছাই কার্যক্রমও চলছে। ইউনিয়ন কমিটিকে তালিকা দ্রুত যাচাই করে সংশোধিত আকারে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।