বৃষ্টিতে ভিজে ফজরের নামাজের পরই ওএমএস’র লাইনে
বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে ওএমএস ডিলারের বিক্রয় কেন্দ্রে ভিড় বাড়ছে। গেল রোববার থেকে প্রত্যেক কেন্দ্রে দুই থেকে আড়াইশ মানুষ চাল না নিয়ে ফেরৎ যাচ্ছেন। বুধবার শহরের কয়েকটি ওএমএস কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোর পাঁচটায় এসে লাইনে দাঁড়িয়ে, বেলা ১১ টায় শূণ্য হাতে বাড়ি ফিরছেন অভাবি মানুষেরা। ডিলার ও সরকারি দেখভাল কর্মকর্তারা (ট্যাগ অফিসার) বলছেন, চাহিদার চেয়ে বরাদ্দ কম হওয়ায়, শূণ্য হাতে ফিরছে মানুষ।
পুরাতন বাসস্টেশনের ওএমএস ডিলারের লাইনে সপ্তাহে একদিন আসেন নতুনপাড়া’র বাসিন্দা কাফিয়া বেগম। প্রায়ই তাকে শূণ্য হাতে ফেরৎ যেতে হয়। বললেন, চাল শেষ হবার আগেই ওএমএস ডিলার উপস্থিত সকলকে আটা দেবার কথা বলে চাল বিক্রয় বন্ধ করে দেয়। পরে কয়েকজনকে আটা দিয়ে ওঠাও বিক্রয় করে না। আরপিন নগরের আফসানা বেগম বললেন, ট্যাগ অফিসার থাকলে একরকম, না থাকলে আরেক অবস্থা। কেবল বকাবকি, ধমকা ধমকি।
কেবল এরা দুজন নয় অসংখ্য অভাবি মানুষ এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে যখন খালি হাতে ফিরতে হয়, তখন কষ্টের শেষ থাকে না।
ফজরের নামজ পড়ে লাইনে না দাঁড়ালে অনেক পিছনে দাঁড়াতে হয়। তাতে চাল না পাবারই ভয় থাকে জানিয়ে দরিদ্র মানুষেরা বললেন, ওএমএস কেন্দ্রে তদারক কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ার রহমত আলী বুধবার সকাল ১০ টায় বৃষ্টিতে ভিজেই পুরাতন বাসস্টেশনের ওএমএস লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, ‘মেঘে ভিইজ্জা (ভিজে) আইয়া (এসে) কালাইঞ্জা কালও (ভোর পাঁচটায়) উবাইছি (দাঁড়িয়েছি), অখন বাজে ১০ টা, চাউল (চাল) পাইমু (পাব) কি-না জানি না। ইলাখান (এভাবে) উবাইয়াও ফিরৎ যাওন লাগে।’
পুরাতন বাসস্টেশনের ডিলারের বিক্রয় কেন্দ্রের সামনে বৃষ্টিতে ভিজে চালের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, আরপিননগরের ফুল বানু ও ইসলামপুরের সুমী আক্তার।
বললেন, ‘ডিলারের মাইনষে চেনা জানা মানুষরে ডাইক্কা ডাইক্কা দেয়, পিছের অনেক মানুষ খালি হাতে যায়।’
শহরের ষোলঘর এলাকার ডিলার নজরুল ইসলাম বললেন, শহরতলির বল্লভপুর, বিরামপুর ও ইব্রাহিমপুর থেকে চাল ও আটা নেবার জন্য আসছেন ওভাবি মানুষেরা। এক টন আটা ও এক টন চালে চাহিদা মিঠছে না। এ কারণে ফেরৎ যাচ্ছে মানুষ।
একই ধরণের মন্তব্য করে শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের ওএমএস বিক্রেতা কেবি মুরশেদ জাহাঙ্গীর বললেন, আমরা ৩০ টাকা কেজিতে পাঁচ কেজি করে ২০০ জনকে চাল এবং ২৪ টাকা কেজি করে ২০০ জনকে পাঁচ কেজি আটা দিতে পারি। কিন্তু মানুষ আসেন ছয় থেকে সাতশ’ জন। এজন্য দুই-আড়াইশ মানুষ শূণ্য হাতে ফেরৎ যান।
পুরাতন বাসস্টেশনের ট্যাগ অফিসার জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলামিন বললেন, চাল-আটা দেওয়া যায় চারশ জনকে, মানুষ আসে ৬০০ জন। এজন্য অনেকে ফেরৎ যায়। প্রতিদিনই তিনি পুরাতন বাসস্টেশনে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করে শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করলেন।
জেলা সিপিবি’র সভাপতি অ্যাড. এনাম আহমদ বললেন, সুনামগঞ্জ এক ফসলি বোরো ধানের জেলা। এখানকার সিংহভাগ কৃষক বৈশাখের নতুন ধানের ভরসায় থাকেন। বৈশাখে ধান ওঠলে সারা বছরের খাবার হয়, এই ধান বিক্রয় করে আনুসাঙ্গিক খরচও মেঠান। চৈত্র মাসে অভাব অনটন থাকে জেলাজুড়ে। এজন্য ওই সময়ে ওএমএস কেন্দ্রে ভিড় বাড়ে। এবার চৈত্র মাসে রমজান হওয়ায় আরও বেশি চিন্তা আছে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। এসময়ে ওএমএস’র বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদারকিও জোরদার রাখতে হবে।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম ভুইয়া বললেন, নিবির তদারকির মাধ্যমে ৩৩ জন ডিলারের মাধ্যমে জেলায় প্রতি খোলার দিনে ১৩ হাজার ২০০ জনকে ওএমএস’র চাল আটা দেওয়া হচ্ছে। রমজান মাসে আরও সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের জন্য আমরা তাগিদ দিয়েছি। অতিরিক্ত চাহিদার বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।


