গণতন্ত্রের সহজাত সৌন্দর্যকে বিকশিত করুন

৫ জানুয়ারি  জাতীয় রাজনীতিতে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদযাপিত হয়েছে গতকাল। বিএনপিসহ একটি পক্ষ এই দিনটিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস এবং আওয়ামী লীগসহ অন্য পক্ষটি দিনটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস রূপে পালন করেছে। মূলত ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারি দেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনটি অনেকটা একতরফা ও প্রতিযোগিতাহীনভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ১৫১ সিটে আওয়ামী জোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয় নিশ্চিত করে। যে আসনগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোতেও ভোটার উপস্থিতি ও স্বতস্ফূর্ততা ছিল কম। এর আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল বিএনপি জোট। তাদের দাবি না মানায় তারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে তারা ওই নির্বাচনটিকে একটি প্রহসনের নির্বাচনরূপে আখ্যায়িত করে গণতন্ত্রের হত্যা দিবস হিসেবে দিনটিকে বিবেচনা করে থাকে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য হলো, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোন সুযোগ ছিল না। যদি বিএনপির আন্দোলন ও হিংসাত্মক তৎপরতার কারণে ওই নির্বাচন না হত তাহলে দেশে অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতা গ্রহণের আশঙ্কা ছিল। আওয়ামী লীগ দেশকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় পরিচালিত করতে ওই নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে। তাই তারা ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস রূপে আখ্যায়িত করে থাকেন। উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে কিছু যুক্তি আছে। এটি ঠিক যে, উচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করায় ওখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক পক্ষগুলো একমত থাকলে এর বিকল্প ব্যবস্থা বের করাও কঠিন কিছু ছিল না। তবে শেষ কথা হলো বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশ নিতে পারে নি। এতে ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি সার্বজনিন চরিত্র অর্জন করতে পারে নি। এই দায় দেশের রাজনীতিকদের। এই দায়বোধের বিবেচনায় ইতিহাসের বিচারে কে সঠিক আর কে বেঠিক অবস্থানে ছিল তা সময়ই বলে দিবে। তবে জনগণের প্রত্যাশা হলো সর্বাবস্থায় দেশে একটি স্থিতাবস্থা বজায়ের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আবহ অক্ষুণœ  রেখে উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া। ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারির আগে পরে বিএনপি জোট সারা দেশে যে হিংসাত্মক অবস্থা তৈরি করেছিল সেটিকে কখনও গণতন্ত্র বিকাশের সহায়ক বলা যাবে না।
গণতন্ত্র নিছক কোন তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এর একটি প্রায়োগিক দিক আছে যা যান্ত্রিকতার পরিবর্তে সর্বাবস্থায় সৃজনশীল। গণতন্ত্রের এই সৌন্দর্য বজায় রাখা প্রতিটি মানুষের একান্ত কাম্য। মানুষ গণতন্ত্র বলতে সাধারণভাবে যা বুঝে তা হলো, নিরাপদে জীবন ও জীবিকা অব্যাহত রাখার পরিবেশ। দেশটি অর্থনীতিসহ সবদিকে এগিয়ে যাবে, এটিই গণতন্ত্রের শক্তি। গত চার বছরে মোটামোটি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতায় মানুষের জীবন বিপর্যস্থ হয় নি। অন্যদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দেশ এগিয়ে গেছে। নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন সংঘটিত হয়েছে। বিগত চার বছরের এই অবস্থায় মানুষ স্বস্তিভাব পোষণ করছেন। মানুষের মনের এই যে স্বস্তিভাব সেটিই গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। এই অবস্থা ধরে রাখতে হবে।
আর এক বছরের মাথায় দেশে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক দেশবাসীর অন্তরের আকুতি সেটি। এবং ওই পরিবেশের নিশ্চয়তা সাধনের মাধ্যমে গণতন্ত্র তার সহজাত সৌন্দর্যকে আরও বিকশিত করবে এটিই সকলের প্রত্যাশা।