গণপ্রশাসনে প্রভুত্বসুলভ মানসিকতার অবসান ঘটুক

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিপন কুমার মোদককে প্রত্যাহার করে বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত এবং জগন্নাথপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারি আব্দুল কুদ্দুছকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত পৃথক দুইটি সংবাদ থেকে জানা যায়। ভুয়া গোয়েন্দা সেজে জেলার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে অবৈধ অভিযান চালানোর অভিযোগ ছিলো রিপন কুমার মোদকের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে জনৈক নারী শিক্ষিকাকে কুপ্রস্তাব প্রদানের অভিযোগ ছিলো অফিস সহকারি আব্দুল কুদ্দুছের বিরুদ্ধে। এই দুই ঘটনা থেকে গণপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি যেমন স্পষ্ট হয়ে উঠে তেমনি এমন অনৈতিকতার বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়। সমাজের কোনো সেক্টর থেকেই শতভাগ অপরাধ হয়তো কখনও বিলুপ্ত করা সম্ভব হবে না কিন্তু ন্যূনতম পক্ষে যদি এসব কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া জারি থাকে তাহলে অপরাধকর্ম যে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে তা স্বতঃসিদ্ধ। নিয়ন্ত্রণহীনতা বেপরোয়া কর্মকা-কে আমন্ত্রণ ও প্রশ্রয় প্রদান করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কর্মচারিদের বিরুদ্ধে উত্তাপিত অভিযোগগুলোকে তেমন করে গুরুত্ব না দেয়ার বাস্তবতা আমরা দেখে থাকি। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হলো কর্মচারিদের নৈতিক স্খলন রোধসহ যাবতীয় অপচর্চা রুখতে নেই কোনো নিয়মিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি। ফলে প্রশাসনের নানা স্তরে দুর্নীতি, আত্মসাৎ, অকর্মন্যতা, শ্লীলতা বহির্ভূত কর্মকা-ের বিস্তুৃতি এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানুষের মধ্যে এখন বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রশাসনে কেবল তারাই দুর্নীতি করেন না যাদের প্রকৃত পক্ষে দুর্নীতি করার সুযোগই নেই। অর্থাৎ সুযোগ থাকলেই এখানে দুর্নীতি করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের এমন নৈরাজ্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা সবধরনের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য বিপত্তিকর ও সেবাপ্রত্যাশী জনসাধারণের জন্য অশেষ দুর্ভোগের কারণ।
গণপ্রশাসনের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মূলত জনগণের সেবক হিসাবে কাজ করার কথা। তারা জনগণের করের টাকায় বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রাপ্ত হয়ে নির্দিষ্ট কাজের জন্য নিয়োজিত হয়ে থাকেন। কিন্তু নিয়োগের পর থেকেই এই কর্মচারিরা নিজেদের সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রের সর্বেসর্বা বা জমিদার হিসাবে ভাবতে পছন্দ করেন। ফলে শুরু থেকেই সেবাদানকারী মানসিকতার পরিবর্তে তাদের ভিতর তৈরি হয় প্রভুত্বসুলভ মানসিকতা। পরিতাপের বিষয় হলো, এই কর্মচারিদের জনসেবক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বরং দুর্নীতি ও অন্যান্য অপকর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের একটি অলিখিত প্রথা তৈরি হয়ে গেছে। দুর্নীতির জাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এই জালের বাইরে থাকার উপায় নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ যদি এই অপসংস্কৃতির বাইরে নিজেকে শুদ্ধ রাখতে চান তাহলে তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ এবং কোণঠাসা।
আলোচ্য ঘটনা দুইটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এডিশনাল এসপি’র বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগটি বেশ আগের। তাৎক্ষণিক এই অভিযোগ আমলে নিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের নজির তৈরি হয়নি। পুলিশের আইজি’র নির্দেশনার পর তাঁকে কেবল অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। আদৌ তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তার কোনো বিচার হবে কিনা তা বলার অবস্থা এখনও নেই। অন্যদিকে জগন্নাথপুরের অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে নারী শিক্ষদের উত্যক্ত করার অভিযোগও বেশ পুরনো। শেষ পর্যন্ত জনৈক শিক্ষিকার লিখিত অভিযোগ দাখিল করার পরই কেবল দৃশ্যমান একটি ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়া গেল, তাও কেবল একটি কর্মস্থলের পরিবর্তন মাত্র। কেন আগে থেকেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না? এমন ব্যবস্থা নেয়া হলে অন্যরা প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনৈতিকতা বিরোধী কঠোর অবস্থানের বার্তাটি স্পষ্টভাবেই বুঝতে সক্ষম হত।
সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চলমান ব্যবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই এই কর্মচারিরা প্রভুত্বসুলভ মনোভাব পরিহার করে জনসেবার মানসিকতায় গড়ে উঠুন।