গত বছরের ১৭ জুনের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন সুনামগঞ্জবাসী

বিশেষ প্রতিনিধি
গেল বছরের ঢলের পানির ভয়াবহতা মনে হলে এখনো আঁতকে ওঠেন সুনামগঞ্জ শহরতলির লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুরের জমিলা খাতুন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, ‘১৬ জুন সারাদিন মেঘ (বৃষ্টি) অইছে (হয়েছে) আর পানি বাড়ছে বেড়েছে)। রাইত (রাত) ১০ টায় ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যায়, চাইতে চাইতে হাঁটু সমান পানি। রাইত একটায় ঘরের চকির উপরে (শুবার কাঠের উপর) উঠি (ওঠে) গেছে পানি, পানি বাড়ন দেইক্কা বাইচ্চা-কাইচ্ছা (ছেলে মেয়ে) লইয়া (নিয়ে) আরেক বাড়িত গেছি, হি-বাড়িতও (ওই বাড়িতেও) ঘরের মাঝে হাঁটু পানি, শেষ রাইতে ই-বাড়ির (ওই বাড়ির) ঘরেও বুক সমান পানি অইগেছে, ১৭ জুন ভোরে একখান ছোট নাও পাইয়া কোন লাখান গিয়া চেকনি খাড়ার পুলও (সেতুতে) ওঠছি (ওঠেছি), ইখানো (ওখানে) শত শত মানুষের কান্দন (কান্না), কেউ হাতরাইয়া (সাঁতার কেটে), কেউ ছোট নৌকা দিয়া, কেউ গরু বাছুর ছাগল মেরা লইয়া, কেউ সবকিছু পালাইয়া-জান লইয়া (জীবন নিয়ে) ওঠছে (ওঠেছে), মেঘ-তুফানের মাঝে ইখানো এক ঘণ্টা থাকছি, শেষে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের গেইট খুইল্লা (খুলে) দেওয়ার পরে কোন লাখান জীবন বাছাইছি (জীবন বাঁচিয়েছি), ই-রাইতের কথা মনে অইলে অখনো (এখনো) জান কাইপ্পা (কেঁপে) ওঠে।
কেবল জমিলা নয়, এই গ্রামের রেহেনা, বানেছা ও ফুয়াদসহ সকলেই শুক্রবার সকালে এই প্রতিবেদককে স্মৃাতচারণ করতে গিয়ে বললেন, গেল বছরের ওই দিনের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন সকলে। তবে এই ভয়াবহ বিপদ মোকাবিলা করেও যে জীবন রক্ষা করা যায়, সেটি ভেবেও আশাবাদী তারা।
মানুষই যে মানুষকে রক্ষা করতে পারে শতাব্দির ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলায় সেটি সকলকে আশাবাদি করেছে। গত বছরের ১৬ জুন বন্যার যে ভয়াবহতা সুনামগঞ্জবাসী দেখেছেন, এরকম কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো ছিল না এই জেলাবাসীর। এদিন বিদ্যুৎহীনতায় সুনামগঞ্জের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে জনজীবনে মহাসংকট তৈরি হয়। একতলার বাসিন্দাদের সকলের ঘরেই চার থেকে আট- দশ ফুট পানি ছিল। এটিকে বন্যা বললেও ভুল হবে, ভয়াবহ ঢলের পানি যেন দেখতে দেখতে ডুবিয়ে দিয়েছিল সবকিছু।
পানি যে এতটা বাড়বে, বন্যা যে এত সর্বব্যাপী হবে, সেটা কারও ধারণায় ছিল না। লোকজন স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্র খাট উঁচু জায়গায় রেখে সকাল হওয়ার অপেক্ষা ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, পানি হু হু করে বাড়তেই থাকে। তবে তাৎক্ষণিক মুহূর্তে বিপদের সময় যার যা সাধ্য আছে, তা নিয়েই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা যুগে যুগে, কালে কালে প্রশংসিত হবেন। দুঃসময়ে সাধারণ মানুষের ঐক্যেই বিপদ মোকাবিলা করে মানুষ। যাদের দুই তলা বাসা ছিল তাদের প্রায় সকলেই মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি ভাড়া বাসায় থেকেও অনেকেই দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের ভরসা দিয়েছেন, খাবার ভাগ করে খেয়েছেন। মানবিক বিপর্যয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ মানুষের প্রতি সহমর্মিতার এই প্রকাশ, স্বপ্ন দেখার সাহস বাড়িয়েছে সকলকেই।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের নতুনপাড়ায় একটি বাসার দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকেন মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের আনোয়ারপুর গ্রামের হীরালাল সরকার। একই পাড়ায় তার একটি ফার্নিচারের দোকানও রয়েছে। বন্যার সময় তিনি ৫৩ জন মানুষকে নিজের বাসায় আশ্রয় দেন। নিজেরা যা খেয়েছেন, তাই ভাগ করে নিয়েছেন বিপদে পড়ে আসা মানুষের সাথে।
তিনি জানালেন, পরিবারের লোকজন ছাড়াও বাসায় ৫৩ জন মানুষ ছিলেন। যাদের বেশিরভাগকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না বা জানতাম না। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বন্যার আগে বাসার জন্য মাসের বাজার করেছিলাম, তাই দিয়ে সকলের সেবা করার চেষ্টা করেছিলাম।
একইভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার সমুজ আলী স্কুল এন্ড কলেজের প্রভাষক বিধান চন্দ্র দাশ। তার বাড়ি দিরাই উপজেলায়। বাসা ভাড়া করে থাকেন দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের মাঝেরগাঁও গ্রামে। তিনি নিজের ভাড়া বাসা এবং পাশের একটি ভবনের কয়েকটি রুম খালি করে তিন গ্রামের ১০ টি পরিবারের ৫৩ জনকে তিনদিন থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
বিধান চন্দ্র দাশ বলেন, হঠাৎ করে পানি বাড়ায় আমিও নিরূপায় হয়ে যাই। রাতে হঠাৎ প্রতিবেশী জলিল ও তার তিন ভাই এসে বললেন আমাদের বাসায় কোমর পানি, দাঁড়াবার কোন জায়গা নেই। তারা পরিবারসহ কোন রকমে ঘর থেকে বের হয়ে আমার বাসায় আসেন। এরপর একে একে মাঝেরগাঁও, মাছিমপুর এবং বড়বন গ্রামের ১০টি পারিবারের প্রায় ৫৩ জন মানুষ এসে উঠেন আমার বাসায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় পাশের আরেকটি ভবনের কয়েকটি রুম খালি করে থাকার ব্যস্থা করে দেই।
তিনি বলেন, ভয়াবহ দুর্যোগের কথা মনে হলে এখনো শরীর কাঁপে। তবে ওই সময়ও কিছু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দামে জিনিসপত্র বিক্রি’র বিষয়টি মনে করে এদেরকে ঘৃণার চোখে দেখেন তিনি।
ওই শিক্ষক জানান, গেল বছরের ১৭ জুনের আগে যে চালের বস্তা বন্যার আগে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেই চালের বস্তা সাড়ে ৩ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। তেরশো টাকার গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে আড়াই চার হাজার টাকায়। এভাবে প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসের দাম বেশি রাখার মানসিকতা ছিল কিছু মুনাফালোভি মানুষের। তবে এদের সংখ্যা একেবারে কম ছিল। এরকম হাজারো মানুষ নিজের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যাঁদের নাম লিখে শেষ করা যাবে না।
১২২ বছরের ইতিহাসে কোন জেলার ৮০-৯০ শতাংশ ডুবে যাওয়ার মতো বন্যা এর আগে বাংলাদেশে হয়নি। এর আগে যত বন্যা হয়েছে, তা মূলত হাওর এলাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ওই বছর গ্রাম, শহর ও উঁচু এলাকাও পানির নিচে চলে যায়। ২০২২ সনের বন্যার ভয়াবহতা কল্পনাতীত। সুনামগঞ্জের লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। সড়ক-রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, মুঠোফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলা কার্যত সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জনজীবনের স্বাভাবিক সব কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। চুলা ধরিয়ে রান্না করাও সম্ভব ছিল না। আবার হাটবাজার, দোকানপাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাজার থেকে চাল, ডাল, তেলের মতো নিত্যপণ্য কেনার মত পরিস্থিতিও ছিল না। টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট তৈরি হয়। চলমান দুর্যোগের প্রভাব ছিল অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক।
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় যখন চারদিকে হাহাকার, করুণ আর্তনাদ, বানভাসি মানুষেরা ঘর বাড়ি, সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য মাথা গুঁজার ঠাই পেতে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছিল, তখনই মানবিক মানুষেরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৭ জুন শুক্রবার সকালেই সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে বুক সমান পানি হেঁটেও মানুষের পাশে যেতে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্তও পানি ঠেলে প্রথম দিনই পৌরবাসীর দরজায় দরজায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের রাতে নিজের ভবনে আশ্রয় দিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তামুক্ত করেছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীন।
অসুস্থতা নিয়ে ঢাকায় উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, তবে তার শান্তিগঞ্জের বাড়ি খুলে দেওয়া হয়েছিল বানবাসী মানুষের জন্য। ফোনের নেটওয়ার্ক চালু হবার পর স্থানীয় প্রশাসনকে দিক নির্দেশনা দেওয়া ছাড়াও অনেকের কাছেই ফোন দিয়ে খবর নিয়েছেন তিনি। সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের নির্বাচনী এলাকা আগে আক্রান্ত হওয়ায় বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা থেকে ফিরেছেন। ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি অসুস্থ থাকলেও এলাকার খোঁজ নিয়েছেন। সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামিমা আক্তার খানম, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানগণসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা খোঁজ খবর নেওয়াসহ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সিনিয়র সহসভাপতি (বর্তমান সভাপতি) জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট অসুস্থতার জন্য ঢাকায় থাকলেও ফোনের নেটওয়ার্ক চালু হবার পর সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা দেওয়াসহ নানাভাবে মানুষের পাশে কর্মীদের দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নোমান বখ্ত পলিন দলের নেতা কর্মীদের নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নুরুল, দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী, জেলা বিএনপির সহসভাপতি আনিসুল হক, জেলা সিপিবি, জাসদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং বামফ্রন্টের নেতারাসহ সাংবাদিক, আইনজীবী সকলেই ছিলেন বিপদে পড়া মানুষের প্রতি সহানুভুতিশীল। পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। জেলা বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুল ইসলামকে শুরু থেকেই বানভাসি মানুষের পাশে দেখা গেছে। সুনামগঞ্জের কৃতি মানুষদের মধ্যে পিএসসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকসহ সুনামগঞ্জের সাবেক ও বর্তমান সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই অর্থ সহায়তা পাঠিয়ে নিরবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষকে উদ্ধার করে সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন আরও অনেকে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একজন বানভাসী মা সন্তান প্রসব করার ঘটনাও স্মরণ করেন অনেকে । প্রধানমন্ত্রী ওই নবজাতকের নাম প্লাবন রেখে জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে প্লাবনের জন্য উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে কষ্ট, দুঃখ ও আনন্দে সঙ্গী হয়েছিলেন।