গরীব আছে যেমন তেমন, ধনীরা বিপাকে

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
ধানকুনিয়া ও জয়ধনা হাওরে প্রায় ৪০ একর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছিলেন কৃষক সৈয়দ হোসেন। জমির ফসল ঘরে উঠলে দুই থেকে আড়াই হাজার মণ ধান পেতে পারতেন তিনি। কিন্তু এখন তাঁর গোলা পুরোটাই খালি। পাঁচটি গরুর মধ্যে দুটি গরু ইতোমধ্যে গত হাটে বিক্রি করে দিয়েছেন। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে দুইদিন আগে এক বস্তা চাল কিনেছেন তিনি।
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ হোসেন। শুধু সৈয়দ হোসেন নয়, ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক, সারোয়ার হোসেন, গোলাম জাকারিয়াসহ বড় বড় গৃহস্থদের একই অবস্থা। যাদের এখন ধান চাল বেপারীদের কাছে বিক্রি করার কথা ছিল তারা আজ ক্রেতা হয়ে বাজার থেকে চাল কিনে আনছেন সংসারের প্রয়োজনে।
খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএস’র চাল কেনার জন্য সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র কৃষকেরা প্রতিদিন ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। বরাদ্দ কম থাকায় কেউ কেউ চাল না পেয়ে বাড়ি ফিরছেন হতাশ হয়ে। ধর্মপাশা উপজেলা সদর ইউনিয়নের দেওলা গ্রামের দরিদ্র কৃষক হারুন অর রশিদ মঙ্গলবার সকালে খোলা বাজার থেকে চাল কিনতে ধর্মপাশা বাজারে এসেছিলেন। দীর্ঘ দুই ঘন্টা লাইনে    
দাঁড়িয়ে থেকে চাল না পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে হতাশ হয়ে বলেন, ‘যে টেহা খরচ কইরা চাউল কিনতাম আইছিলাম হেই টেহা দিয়াতো দোহান (দোকান) থাইক্যাই চাউল কিনতা হারতাম। অতো কষ্ট কইরা আইয়া লাভ অইলো কি?’
হারুন অর রশিদের মত শত শত দরিদ্র কৃষকের অবস্থা এমন বেহাল হলেও আরও ভয়াবহ অবস্থায় আছেন উপজেলার কয়েক হাজার সম্ভ্রান্ত কৃষক। যারা ইচ্ছা থাকা সত্বেও চক্ষুলজ্জার ভয়ে ওএমএস’র চাল কিনতে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে না পেরে বেশি দামে বাজার থেকে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনই বাধ্য হওয়া এক কৃষকের নাম সমর বিজয় দাস। তিনি ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের পিঁপড়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘হত্তি (প্রত্যেক) বছর হাজার দেড় হাজার মণ ধান হাই (পাই)। এইবার এক তোলা ধানও হাইছি না। ওএমএস’র চাউল কিনতে লাইনে খারইতে শরম লাগে। তাই নিরূপায় অইয়া বেশি দাম দিয়াই চাউল কিনন লাগতাছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এইবার গরু বেইচ্যা কামলার (কাজের লোক) টেহা (টাকা) দিছি।’
একই অবস্থার কথা জানালেন, মধ্যনগর বাজারের আরেক কৃষক দূর্গা দাস রায়। তিনিও প্রতি বছর হাজার দেড় হাজার মাণ ধান পেতেন। তিনিও চক্ষুলজ্জার ভয়ে খোলা বাজার থেকে চাল কিনতে পারছেননা।
ধর্মপাশার মধ্যনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন বলেন, ‘এবার ধনী গরীব সব সমান। ধনী কৃষকদেরও চাল কিনতে হচ্ছে গরীবদেরও চাল কিনতে হচ্ছে। গরীব কৃষকেরা ওএমএস’র চাল কিনতে লাইনে দাঁড়াতে পারলেও ধনী কৃষকেরা পড়েছেন বিপাকে। তবে মধ্যনগরে খোলাবাজারে চাল কিনতে খুব সকাল থেকে মানুষজন লাইনে দাঁড়ায়। যারা আগে আসে তারা চাল-আটা পায় আর অন্যরা খালি হাতে ফিরে যায়।’
হাওরাঞ্চলের মানুষজনের সহায়তায় ইতোমধ্যে প্রতি উপজেলায় দৈনিক তিন টন চাল ও তিন টন আটা খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু এই তিন টন চাল ও তিন টন আটা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ডিলারদের দোকানে চাল-আটা বিক্রি শুরু হয়। দরিদ্র মানুষেরা সকাল সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যেই লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে বিক্রি শুরু হওয়ার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই প্রতিদিনের বিক্রি শেষ হয়ে যায়। যারা সকাল সকাল লাইনে দাঁড়াতে পারে তারাই চাল-আটা নিয়ে বাড়ি ফেরে। যারা একটু দেরিতে আসে তারাই ফিরে খালি হাতে। লাইনে এমনও দুই একজনকে পাওয়া যায় যাদের নিজের চাল কেনার টাকা না থাকায় ধনী পরিবারের কারও জন্য চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বিনিময়ে পাচ্ছেন কয়েকটি টাকা। বাজারে প্রতি বস্তা চালের দাম এখন দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার দুইশত টাকা। এই দামে ধনী কৃষকেরা ফসল হারিয়ে শূন্য হাতে বাজার থেকে চাল কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।
ধর্মপাশা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ফখরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘দ্রুত উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে খোলা বাজারে চাল-আটা বিক্রির ব্যবস্থা করা উচিত। দূরের ইউনিয়ন থেকে দরিদ্র মানুষজনকে চাল-আটা কিনতে উপজেলা সদরে আসতে অনেক বেগ পোহাতে হয়। এখন চাল কিনতে আসতেই যদি তাদের টাকা ফুরিয়ে যায় তাহলে চাল কিনবে কিভাবে?
ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেব খান বলেন, ‘ওএমএস’র চাল অবশ্যই চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। মহামান্য রাষ্ট্র্রপতি সুনামগঞ্জ পরিদর্শন করেছেন। আমরা এক বুক আশা নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি, উনি হাওরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা করে বিশেষ ব্যবস্থায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করবেন।’
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার বলেন, ‘ওএমএস’র চাল-আটা চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমরা চাই প্রতিটি ইউনিয়নে খোলাবাজারে ওএমএস’র কার্যক্রম চালু করা হউক।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় খাদ্যসংকট নেই। এখন প্রতি উপজেলায় তিন টন চাল ও তিন টন আটা খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এই কর্মসূচি প্রতিটি ইউনিয়নে চালু করার জন্য সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। ন্যায্যমূল্যে ১০ টাকা দরে ত্রিশ কেজি করে চাল বিক্রি চলতি মাস পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল কিন্তু তা আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত বর্ধিত করা হচ্ছে।