গল্প-আগন্তুক এর পদধ্বনি

নাসরীন জাহান
যেমন শামুকের পাঁজরে কেউ ঢুকিয়ে দিল সুঁচ, এমনভাবে কুঁকড়ে ওঠে এই গ্রামে আসা অচিন মানুষ। অ..নে..ক অনেক পথ হেঁটে সে আবিস্কার করে, একদা এই গ্রামেই তার জন্ম হয়েছিল। বহুকাল স্মৃতিভ্রষ্ট সে পড়ে ছিল হাসপাতালে। সেই মানুষের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বয়সের ¯্রােত। প্রাণের অতলে আজ বিষবাষ্পোচ্ছাস। দিনের পর দিন হাসপাতাল চিকিৎসায় ভুলে ছিল আসমানের রঙ, ঘাসের হলুদ সবুজের বিষয়-আশয়। এই তো কিছুদিন আগেই মাথার কোষগুলো যখন যবে কাজ করতে শুরু করেছে, ট্রেন থেকে জলে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্যটি টুসকি দিয়ে স্মরণের মধ্যে ঘা মেরেছে-এখন থেকে সে প্রায় চেতন আধচেতনে স্মরণ করার চেষ্টা করেছে তার উৎসবৃত্তান্ত। এক রাতে প্রায় জাদুর মতোন ভেসে উঠল তার স্ত্রীর ডালিম সুন্দরীর মুখ। সে শাদা চাদর খামচে খামচে ঘুমন্ত রোগীদের মধ্যে শুনতে পেয়েছে সেই স্ত্রীর সাথে তার প্রথম দিককার বাক্যালাপের কখনো খ- শব্দ, দেখতে পেয়েছে এখনো টানা কিছু স্থির দৃশ্য। কেবল সুর…ধ্বনি…শব্দ…রূপ…আহারে পবনের বাতাস স্মরণ করাও কুথায় সেই অঞ্চল…যে-ই অঞ্চলে আমি আমার অতীতেরে হারাইছি। ভোলো ভোলো কইন্যা পিতামাতারে, যারে ছাইড়া আইজ তুমি আমার কুটিরে আইছো, বুকেতে বিচ্ছেদের বেদনা দিয়া আমারে পাওনের আনন্দ নষ্ট কৈরো না। ওই দেহো আসমান, ওই দেহো পবন, খাঁ খাঁ কুয়াশার রাইত পরে। হাঁইট্যা যাও কইন্যা হেই পথ দৈরা। নিজেরে ভাসাও…ডুবাও…ও। কঠিন রাইত আইব, বক্ষের মাংস ছিঁইড়া নিব পরতের পর পরত সময়। হিংসুইট্যা দিনরাইত আজব ভেলকি দেখায়া চুইষ্যা খাইব তুমার যা যা শক্তি। আমি হতশ্রী বাউল এক…শব্দেরে যে সুন্দরীরে সুর বানায়া দিল রোজগার করি। আমার কি সাধ্যি তুমার মতন রূপবতীরে সুতার বাঁধনে বান্দি…অচেনা মানুষ বৃক্ষের নিচে বসে দেখে ফালি ফালি রোদ প্রকৃতিকে কারুকার্যময় করে তুলেছে। মাটি খুঁড়ে কবরের শিশুটিকে বের করার প্রণান্তকর চেষ্টায় অচেনা মানুষ ফের তার বিবাহের রাত্রিটিকে স্মরণ করার রক্তাক্ত খেলায় লিপ্ত হয়।
ডালিম সুন্দরী বউ আমার, তুমার চরণের আলতারে রক্ত বানায়া নিঠুর সময় ছড়ায়া দিব ঘাসের ডগায় ডগায়। তুমার চক্ষু উপড়ায়া নিব ছানির কাগজ। বধূ, তুমি যদি রাজরানী হইতা, তুমার পায়ের কাছে ছড়ায়া থাকত মণিমুক্তো…হীরা জহরত…কিন্তু রানি ও রাজার একরহম উৎকৃষ্ট বাদিনী। রাজার হুকুম ছাড়া তার নড়নচড়ন নাই। হেয় রাজবাদিনীরে হেই রাজা মণিমুক্তার মইধ্যে ফালায়া পইড়া থাকে না বাঈজির ঘরে? অন্তরে যার আন্ধার কান্দন…মণিমুক্তো কি কৈরা তারে উচ্চকিত হাসি দেগয়? এই আমি আইজ রাইতে আমার দোতরা তুমার হাতে তুইল্ল্যা দিলাম, আসমান দিলাম, দারিদ্র্য দিলাম…আর দিলাম একমাত্র পরানপক্ষীরে, তুমি যদি নারী কেবল অর্থে ভোলো আন্দার ডাকিনীরা তুমারে লৈয়া নাচতে নাচতে নিয়া ফেলব গহীন শ্মশানে। বধূÑ এই দেহো দুনিয়ার রঙ, যৌবনের চক্ষে যা রূপকথা হইয়া উটে। কান্দন থামাও কইন্যা, দেহো তুমার সুন্দর তনু,  দর্পণে দেহ আগুন রূপ। ভোলো, পিছনের বিচ্ছেদের ব্যথা, ভেলো অভাগা বাউলের দারিদ্র্যেরে, যে তুমার সিঁথির মইদ্যে সিঁদুর না পড়ায়া আজীবন বুকের রক্ত পড়াইব। ভেলো হেই দারিদ্র্যরে, যে দারিদ্র্য ডহর পিরিতেরে খিরকির পথ দেহায়, হেদো তুমার চক্ষু, যার বাণে দুনিয়া ধ্বংস হয়া যায়। তুমি কোদালের কোপ দিয়া খরা জমিনে স্বর্ণ ফলাও। বধূ, আইজ বাসর রাইতে তুমি খামচা দিয়া উপড়ায়া আনো আসমানের চান্দেরে। তা দিয়া কইন্যা তুমি এই অভাগা বাউলের কুপির সলতায় আগুন তোলো।
আসমান থেকে সারি সারি ওসব কী পড়ছে গো? রোদকুয়াশা? ইা স্বর্ণরেণু? ক্ষুধার্ত অচিন মানুষ জিভ পেতে সেই ভেজা স্বর্ণ অথবা শীতালু বাতাস খায়। হাঁটে।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, কেন কেবল তার কথিত শব্দাবলিই অমন রিনরিন করে কানে আসছে? তার সেই মুহুর্মুহু আবেগ উচ্ছাস বাক্যে তার নতুন বধূর মধ্যে ঠিক কীরকম তরঙ্গ বয়ে গিয়েছিল? ডন:স্বাস আটকেও অচিন মানুষ স্মরণ করতে পারে না। সন্ধ্যা আসরে-অবাধ জমিনে অথবা বোনো ঘাসের ওপর শুয়ে য হাতড়ে বেড়াবে যৌবনকে, শেশবকেÑকিছুতেই কি স্মরণে আসবে না? আসমানের তারা স্বাক্ষী, স্বাক্ষী এই দিনপ্রহর, সাক্ষী দুনিয়ার বৃক্ষরাজি, পক্ষীর কাকলী, সাক্ষী রঙধনু, প্রভাত আর মাগরিবের মতো আলোছায়া, সাক্ষী ক্ষেতের ফসল, নদীর ঢেউ, সাক্ষী শ্মশান, শূন্যতা…সাক্ষী আমার অতীর দোতরা…আমি অচিন কেউ না। এই গেরামেই আমার জন্ম…এই গেরামেই আমার মরণ…তার আগে…আমার কেকিল বধূ…কই..ক..ই? ক্যান আমি ট্রেন থাইক্যা ঝাঁপ দিছিলঅম। গহীন পানির তলায়? ক্যান? কুন সেই অচিন দু:খে?
হাসপাতাল…ইলেকট্রিক শক…আল্লাহ! অচিন মানুষের বুকের রাত্রির রক্তপানি এক হয়ে যায়…সে হাঁটে..হাঁটে।
…হাঁটতে হাঁটতে…ওই তো শষ্যক্ষেত। একজন চাষী…কাজ নিমগ্ন অথবা আত্মনিমগ্ন। তার পাশে গিয়ে বসে। কাজ ফেলে চাষী অবাক চোখে তাকায়, আপনে ক্যাডা ভাই? এই গেরামে নতুন? অচিন মানুষ চাষীর কাদামাখা হাত দেখে উঠে দাঁড়ায়, আপনে কাম করেন। আপনেওে বিরক্ত করন ঠিক হইব না। চাষী পরিশ্রম ঘাম মুছে আলের ওপর এস বসে, আরে কাম তো সারাদিনই করি। কতা কওনের মানুষ পাই না। বেবাকেই কামে ব্যস্ত।
অচিন মানুষ হাসে দইন্যাত আমারই কুন কাম নাই। খালি হাডো আর হাডো।
আপনের কাম নাই? বাঁচেন কী খাইয়া? চাষী অবাক স্বরে বলে, সারাদিন বেকাকেই কাম কইরা গতরের রক্ত ঝরায়া যহন ঘুমাইবার যায় একবারও কি ভাইবা দেহ ভাই, কিসের লাইগ্যা এই কাম? ভবের দুইন্যাত আমার পুতুল। অদো শিকলে বাইন্দা কেডায় যে আমাগোরে এই মরণ নাচন নাচায়। তা আপনে ক্যাডা অচিন মানুষ? আপনের বেত্তান্ত কী?
ওপরে জমতে শুরু করেছে ধলতিথির অথবা রাত তিথিরের ছায়ারা পাখিরা ঘরে ফিরেছে। খড় গোড়ার গন্ধ। রাখালের শেষ বাঁশির টান…। কু^কড়ে ওঠে অচিন মানুষের মুখ-এই মহা দুইন্যাত বেবাক মানুষই তো ভাই এক সময় অচিন থাহে। চলতে চলতে চেনা হয়। যে স্ত্রীর আপনে বিবাহ করেন এক সময় হেয় অচিন থাকে না? মায়ের গভ্য থাইক্যা জন্ম লয় যে সন্তান, জনমের আগে হেয় অচিন থাকে না? চিনা অচিনার তক্কে গিয়া কী লাভ ? সে তক্কী আসমানের লাহান, জমিন পর্যন্ত যার সীমারেখা নাই। তার চাইতে আমরা দুইজনই উপরআলার বনানী মানুষ-হেই পরিচয়েই এক কথা কই।
চাষী বিহ্বল স্বরে বলে, আজিব মানুষ আপনে, আজিব আপনের কথা। নিস্তব্ধ গ্রাম ক্রমশ সরতে শুরু করেছে। দিন আয়োজন শেষে রাত সুখের পদশব্দ। বুয়াশায় কুয়াশায় থোকা থোকা আঁধার। ক্রমশ বিড়বিড় করে অচিন মানুষ বলে…কত গাছের তলায় ঘেরান শুইক্যা…কত মাঠে জমি পার হয়া কতদিন আমি এই গেরামের নদীর কাছের Ñমহুয়া কাঞ্জননের ঘেরান খুঁজতাছি। জন্মের পরে আমি পয়লা হেই ঘেরানের মাডি মাখায়া আমার দোতরা বাজাইছিলাম, এই গন্ধ কেবল আমি পাইতাম। কী কষ্ট ভাই…কী কষ্ট…এক রাইতে খোয়াবে দেহি, এ পরীর লাহান নারী আইস্যা কইতাছে, আমার নাম মহুয়া। কাঞ্চন, আমার কবর হেই গেরামের কুণার বটগাছের তলে, তুমি আমারে বুক থাইক্যা মাডি লৈয়া দোতরায় বসাও…হের পরে তুমিই আমারে এই জীবনে বধূরূপে পাইবা…।
ভাই, এই অঞ্চল আমার যুগের যুগের চিনা। সময়ের দূর বড় মারাত্মক ভায়া। পেডের চিনা শিশু বিশ বচ্ছর পরে যহন অচিন হয়া ফিরে, হের পরে হেই অচিনের মধ্যেই পিতামাতা তার চিনা শিশুডারে জড়ায়া দৈরা কান্দে। এই আসমানের বাতাস কি সুরভী, মদির। আমি আন্ধার হাসপাতালে তলায়া আছিলাম। আইস্যা দেহি, আমার চিনা জীবন অচিন হৈয়া গেছে। আমি গাছের পাতায়, মাডি খামচায়া হেই অচিনের মইদ্যে আমার জীবন চিনারে খুঁইজ্যা মরতাছি। আর কত আন্ধার? আর কত দিন তিমিরে খুঁইজ্যা রেড়ানির খেলা? যে খেলায় ভাই লহুগুলান এমুন করে…এমুন করে মনে লয় দাউ দাউ আগুন পরানডারে না ঝলসাইলে পরানের খাই মিটব না।
সন্ধ্যা আরও ঘনীভূত। সেই আঁধারে মুহ্যমান চাষী বলে, আপনে ক্যাডা ভাই? এই গেরামেই আপনের নিবাস আছিল? আপনের কতা আমি বুঝি না…কতার মাতা  ধরবার পারি না। কিন্তু কি জাদু য্যান আছে এই কতায়, বংশীর সুরের লাহান। সুর না বুজলেও শুইন্যা কি জানি কিরহম আরাম অয়। এই ঘিন্নার জীবনডা কই জানি উড়ায়া লইয়া যায়। আপনে কী খুঁজতাছেন ভাই?
আমার জন্মরে, আমার মাডিরে…আর…আর…অচিন মানুষের মগজের চিলতে ফাঁকে ফাঁকে ফের কুয়াশা…কোনো আদল নেই, আকৃতি নেই…দোতরার সুর নেই…সেই শব্দাবলী…কেবল বাসর শয্যায় উচ্চারিতÑ
তুমি চুপ ক্যান কইন্যা? মহুয়া কাঞ্চন, সোনার ময়না পক্ষী আমার তুমিই আমরার দোতরার মইদ্যে বেহেশতী সুর ছড়াইছো। তুমি চুপ ক্যান? তুমি কি হেই জড় হীরকখ-, যার মইদ্যে পরান নাই। যারে দিয়া অন্যে অস্পরী হয়। তুমি কইন্যা নিজেই স্বর্ণ. নিজেই রৌপ্য, নিজেই হীরক। যে এক দোতরা বাউলের পর্ণ কুটিরে আইস্যা নিজের মূল্য হারাইছে। দেহের ইস্পাতে খানখান কইরা দেও তুমার যা বেদনা। পিতামাতার বিচ্ছেদেরে কষ্টের মালা দিয়া গর্ভে জন্মাও তুমার নতুন সন্তানেরে। হেই বিচ্ছেদের তুমি মিলনের মালা কইরা তুমার বাসররাতিরে জন্মানো পুত্রের কন্ঠে পরাও। স্বপনের বীজ বপন করো েেদহে। ঝলসায়া দেও…আসমান ক্ষেত প্রান্তর। অচিন মানুষ দলামোড়া হয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ায়। আমি এই গেরামের মানুষ। আমি আমার নিবাস খুঁতাছি। চাষী বলে, এই গেরামের মানুষ? না? বাই, আমারও জন্ম এই গেরামেই। এই গেরামের বেবাক পশুপক্ষী, মানুষ বেবাকরে চিনি। আপনে ভুল জাগাত আইছেন ভাই।
ঋুল জগৎ? অচিন মানুষ এইবার টানটান দাঁড়ায়। আসমান, জমিন পবন ভুল হইতে পারে ভাই, কিন্তুক যে গেরামের মাডি খায়া একটা বীজ বিরাট এক গাছ হয়া ওডে, হেয় তার মাডিরে চিনবার ভুল করব? আমার দোতরার বাজন কে হুনে নাই ভাই? প্রভাত সইন্দ্যার ছায়ারা শুনছে। আহারে জুসনার কি বাহারি নাচন। হেই বাতাসের পরতে পরতে ছড়ায়া পড়তো আমার দোতরার কান্দন।
কত্তো মানুষ ভির কইরা হুনতো হেই বাজনা। এই গেরামে আছে না হেই দিঘি, যেই দিঘির মইদ্যে পাল পাড়ে মাছরাঙা? এই গেরামে কি নাই হেই নদী যে নদী তেজস্বী পুরুষের লাহান সদা বহমান…হেই নদীর ধার ঘেঁইস্যা খাড়ায়া নাই কি এক বিরাট …বি..রা..ট..বটগাছ…খালি হারগিলা…খালি শকুন-তার তলায় জিরন দেহের ঘাম শুকায় ক্ষেতের শস্যশিল্পীরা…তার তলায়…তেই গাছের তলায়-অচিন মানুষে আত্মনিমগ্ন হয়ে নিভৃতে উচ্চারণ করে…নাই কি মহুয়া কাঞ্চন…?
অচিন মানুষের শেষ বাক্য কৃষকের কর্ণগোচর হয় না। সে ক্রমশ ঘনায়মান রাত্তিরের দিকে তাকিয়ে এইবার বিরক্ত বোধ করে-ভাই এই বিষয় তো বেবাক গেরামেই আছে। কিছু মনে নিবেন না ভাই, আন্ধার হইছে…অহন হারিকেন জ্বালায় ক্ষেতের শেষ কাম সারন লাগব। আমার মনে হয় আপনের মাতার কিছু গোলমাল হইছে। আপনে আরও খুঁজেন ভাই…বলতে বলতে ছায়া আঁধারে মিশে যায় চাষীর দেহ। ক্রোধে কম্পিত অচিন মানুষের কন্ঠ বিষে যন্ত্রণায় খানখান হয়ে ওঠে, আমি পাগলা? থু!
ঘোর অমাবস্যা।
অচিন মানুষ কখনো হেঁটে…কখনো হোঁচট খেয়ে, কখনো হামাগুঁড়ি দিয়ে খোঁজে পথ। অমাস্যায় এই গ্রাম মৃতা নারীর মতোন। একটি নিদ্রাহীন বাদুড়ও কী জানি কী ভয়ে ছটফট করে ওঠে না। ঠিক রূপকথার কাহিনীর মতো রক্তভেজা পা ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে সে দেখে, আদুরে এক জঙ্গুলে কুটিরে ক্ষীণ বাতি জ্বলছে।
পতঙ্গ প্রায় উন্মাদ অচিন মানুষ সেই আলোর সূত্র ধরেই এগোয়। কসাই বনের বিছে তাকে খামচে ধরলে সে আধমড়ার মতো ছটফট করে পরনের সব কাপড় ফেলে একদম অন্ধকারে আদিম সারা শরীর চুলকাতে চুলকাতে যখন সেই আলোকবার্তিকার সম্মুখে…কিছু একটা আবিস্কারের গন্ধ তাকে উদ্বেলিত করে। প্রাণপণে যন্ত্রণা চেপে গোঙ্গাতে গোঙাতে সে কুটিরের বিশালতা দেখে। কে বলে কুটির? এ তো প্রায় প্রাসাদসম। ঘুরতে ঘুরতে একটি খিড়কির খোলা জানালা পায়। নিজেকে নিজের যন্ত্রণাকে বিস্মৃত হয়ে অচিন মানুষ সেই জানালায় চোখ রেখে বোবা হয়ে যায়। এক সুন্দরী কন্যা খুব রসালো মুখে পান ঠেসে দিচ্ছে। তার সোহাসী স্বামী সেই পান ওষ্ঠে চুম্বন রেখে বলছে…এত বছরেও তুমার রূপের স্বাদ ক্যান ফুরায় না গো…তুমি।
মহুয়া কাঞ্চন! ওই তো তার বধূ। সে এই প্রাসাদে কেন?
ওই তো তার দেহের ভাঁজ। কোখের কটাক্ষ। ওই তো তার হাসি। যে হাসি দেখার তৃষ্ণায় বাসর শয্যায় বুকে রক্ত তুলে ফেলেছিল দিনভিখিরি বাউল।
কাঁপতে কাঁপতে …স্পষ্ট হয় স্মৃতি…তার সেই স্তুতিবাক্যে জর্জরিত মহুয়া দু’কান চেপে চিৎকার করে উঠেছিল। মিছা চিড়া ভিজানি?
এরপর তার সাধের দোতরা পা দিয়ে আছাড় দিয়ে ভেঙে বাউলকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে বলেছিল, আমি তুমারে ঘিন্না করি।
আদিম রাত্রি।
খাড়া শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অচেনা মানুষ টের পায়, তার তৃতীয় চক্ষু খুলে গেছে। আর অন্ধকার নেই। অমবস্যা নেই। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শৈশবের পথ। নিজেকে তার চন্দ্রালোকিত মানুষ মনে হয়। এই তো শীতের কামড়ে ছটফট করছে চামড়া। এই তো সমস্ত প্রকৃতি অপার্থিব সুঘ্রাণ দিয়ে খুলে দিলেন পথের পর পথ। এই তো মগজের সব কোষ একত্রিত হচ্ছে, বিন্যস্ত হচ্ছে সব অতীত।
ওগো নদী কী তুমার নাম? অচিন মানুষ হাসতে হাসতে দেখে, এই পৃথিবীর সেরা নদী ব্রহ্মপুত্রের জলে তার ফেলে যাওয়া দোতরা ভাসছে।
নদীর জল শরীরে মেখে অচিন মানুষ বটবৃক্ষের নিচে বসে মহুয়ার গন্ধ পায়।
সে ফের মাটি তোলে।
অজানা গেরামবাসীর মরণ ঘুম ভেঙে যেতে থাকে দোতরার কান্নার শব্দে।