শহীদনূর আহমেদ
সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এখন প্রচ- বেহাল দশা বিরাজ করছে। আর্থিক সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রামীণ কোন্দল। ফলে যেকোন সময় প্রায় ২৭ বছরের পুরানো এই বিদ্যালয়টি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ১০০ জন শিক্ষার্থী ও দুই জন শিক্ষক নিয়ে প্রাণহীনভাবে বর্তমানে চলছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা র্কাযক্রম। ১৫ মাস যাবৎ বন্ধ রয়েছে শিক্ষকদের সম্মানী। কার্যকর নেই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি । জরাজীর্ণ অবকাঠামো, নেই সেনিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ও শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় দিন দিন অন্যত্র ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়টির এমন করুণ অবস্থায় যেকোন সময় বন্ধ হতে পারে বলে আশঙ্কা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। গ্রামীণ কোন্দল ও জনপ্রতিনিধি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
শনিবার সকালে সরেজমিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে গ্রামের কিছুসংখ্যক ব্যক্তির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গোবিন্দপুর গ্রামের ২৯ জন ব্যক্তির ্ওয়াকফকৃত সম্পত্তি ও জলমহালের আয় থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্মানি, অবকাঠামোগত ব্যয়, শিক্ষা উপকরণ ব্যয় নির্বাহ করা হত। এতে গোবিন্দপুর, কলাইয়া, কাঠইর, মদনপুর, দেওয়াননগর, তাজপুরের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরা বিনা বেতনে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করার সুযোগ পায়। দীর্য ২৭ বছরের পথ পরিক্রমায় এই বিদ্যাপীঠটি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে বিরামহীন ভাবে। কিন্তু আইনী জটিলতার কারণে ওয়াকঅফকৃত সম্পত্তি ও জলমহালের আয় বন্ধ হওয়ায় বিদ্যালয়ের তহবিল ঘাটতি দেখা দিতে থাকে। এতে করে ১৫ মাস যাবৎ শিক্ষকদের সম্মানী বন্ধ রয়েছে। বছরের শুরুর দিকে ৫ জন শিক্ষক থাকলেও সম্মানী বকেয়া থাকায় অন্যত্র চলে যান ৩ জন শিক্ষক। মোট শিক্ষাথীর মধ্যে ৩৬ জন জেএসসি পরীক্ষার্থী। কেবল মানবিক কারণে বেতন না পাওয়া সত্ত্বেও পাঠকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন দুই জন শিক্ষক। সপ্তাহের প্রায় সময়ই বন্ধ থাকছে শিক্ষা কার্যক্রম। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষাথীরা। এমন অব্যবস্থাপনায় নিরুৎসাহিত হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের অন্যত্র ভর্তি করছেন অভিভাবকরা।
অনেক পুরনো একটি টিন সেডের দুর্বল ঘরে চলে পাঠ্যদান। প্রায় কক্ষের দরজা জানালা নেই, থাকলেও ভাঙ্গা। ঝড় তুফানে ভেঙ্গে গেছে টিনের বেড়া। অবাধে যাতায়াত করছে কুকুর,গরু, ছাগলসহ নানা প্রাণী। বৃষ্টিবাদলের দিনে টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টি পরে শ্রেণীকক্ষে। এতে শিক্ষার্থীর ভোগান্তির শেষ নেই। সেনিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কষ্ট বাড়ে। বিদ্যালয়টির দিনদিন অবনতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র জালল উদ্দিন বলেন, আমি জেএসসি পরিক্ষার্থী। এখানে পড়াশুনার অবস্থা খুবই খারাপ। বেতন না পাওয়ায় গণিতের শিক্ষকসহ তিন জন শিক্ষক অন্যখানে চলে গেছেন। এতে আমাদের পড়াশুনার বড় ক্ষতি হচ্ছে।
গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মোশাহিদ আলম মহিম বলেন, ৭ থেকে ৮টি গ্রামের ছেলে মেয়েরা এখানে পড়াশুনা করতে আসে। আমি নিজে এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। দিন দিন স্কুলের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গোবিন্দপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদুর রহমান পীর বলেন, আমি ৯৭ সালের পর থেকে বিদ্যালয়ের দায়িত্বে আছি। বর্তমান সময়ে বিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা খুবই দুর্বল। ১৫ মাস যাবৎ শিক্ষকদের বেতন ভাতা বন্ধ রয়েছে। কেবল মানবিক কারণে বেতন না পাওয়া সত্ত্বেও আমরা দুইজন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে। স্কুলটি রক্ষায় এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে।
পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। জলমহালের আয় বন্ধ হওয়ায় ব্যয় নির্বাহ করতে বিপাকে আছি। আর গ্রামের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তো আছেই। ২০১০ সালে এমপিওভুক্ত করার জন্য চেষ্টা করেছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। দায়িত্বশীলরা সাড়া দেননি।
জেলা শিক্ষা অফিসার নিজাম উদ্দিন বলেন,এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। সরকার যখন পুনরায় এটি চালু করবেন তখন এই বিদ্যালয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।


