গ্রামীণ শালিসের নামে অমানবিকতা দূর হোক

সমাজচ্যুতি, একঘরে, পাঁচের বাদ, দশের বাদ ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের গ্রামীণ সমাজে প্রায়শই শোনা যায়। যখন গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থায় শালিশকারকদের প্রভাব—প্রতিপত্তি বেশি ছিলো তখন এসব শব্দ বেশি শোনা যেত। যুগের উন্নয়নের কারণে পরিবর্তিত গ্রামীণ সমাজে আগের সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন অনেক শিথিল। তারপরেও এগুলো একেবারে দূরিভূত হয়নি। তাই আজকের একবিংশ শতাব্দীর চরম আধুনিক সময়েও আমাদের গ্রামীণ সমাজের কোথাও কোথাও গোষ্ঠীপতি বা সমাজপতিরা কোনো ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষকে সমাজচ্যুত করে দিতে পারেন। জগন্নাথপুরের পল্লীতে এরকমই এক ঘটনার সংবাদ পাই গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে গ্রামীণ বিচারের রায় না মানার কারণে নূরুল ইসলাম নামের জনৈক দিনমজুর পরিবারের উপর সালিশকারকরা সমাজচ্যুতির সাজা আরোপ করেন। এ নিয়ে পুনরায় আয়োজিত আরেক বিচারসভায় দিনমজুর নূরুল ইসলামের পক্ষ নিয়ে কথা বলার অপরাধে খলিলুর রহমান নামের আরেক ব্যক্তির উপরও শালিশকারকদের সমাজচ্যুতির খরগ নেমে আসে। এ নিয়ে পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে উঠে। সালিশকারকদের হামলায় তমিজ আলী, লায়েক আলী ও করিমুন্নেছা নামের তিন নারী—পুরুষ আহত হয়েছেন। আহত সকলেই সমাজচ্যুত নূরুল ইসলাম ও খলিলুর রহমানের স্বজন। অর্থাৎ শালিশকারকরা পরিবার দুইটিকে সমাজচ্যুতির নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। এই রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা না মানার অপরাধে তাদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেছে। বুঝা যায় ইসলামপুর গ্রামটি এখনও সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কঠিন জালে আবদ্ধ। প্রশাসন ঘটনাটির উপর অবশ্য নজর রেখেছে। এরকম বেআইনি ঘটনার দুই নায়ককে জগন্নাথপুর পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে যেয়ে তথাকথিত শালিশের নামে সমাজচ্যুতির মতো অন্যায় আদেশ দানের অপরাধে ২ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করায় জগন্নাথপুর থানা পুলিশকে আমাদের অভিনন্দন। আমরা মনে করি শুধু ২ ব্যক্তিকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়েই প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। ভুক্তভোগী সমাজচ্যুত পরিবারগুলোকে যথাযথ সম্মানের সাথে গ্রামে পুনর্বসান ও তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যও পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। নতুবা নূরুল ইসলাম ও খলিলুর রহমানদের ওই গ্রামে থাকা অসাধ্য হয়ে উঠবে।
বিকল্প বিরোধের জায়গায় গ্রামীণ ঐতিহ্যগত শালিশ বৈঠকের গুরুত্ব আমরা অস্বীকার করি না। বহু ছোটখাট বিরোধ এইসব শালিশের মাধ্যমে সহজে নিষ্পত্তি করা যায়। আমাদের গ্রামীণ সমাজ এখনও এরূপ স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব শালিশ বৈঠকও আজকাল কলুষিত হয়ে পড়েছে। যারা মুরব্বি বা শালিশকারক হিসাবে পরিচিত তারা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ন্যায়ের বিপক্ষে যেয়ে অন্যায়কে সমর্থন করার বহু ঘটনা আমরা জানতে পারি। এতে দুর্বল ব্যক্তিদের যথাযথ বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্বলরা কস্মিনকালেও সুবিচার পায় না, তারপরেও ছিটেফোটা যা পাওয়ার জায়গা ছিলো অসৎ গ্রামীণ বিচারকরা সেই জায়গাটিও নষ্ট করে ফেলেছেন। গ্রামীণ শালিশ শুধু বিবদমান দুইপক্ষকে মিলিয়ে দিতে পারেন। এজন্য পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সমঝোতার পন্থা বের করতে হয় যা উভয়পক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য। তা করতে না পারলে বিষয়টিকে প্রচলিত আইনী ব্যবস্থার উপর ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু এসব গ্রামীণ বিচারে ব্যক্তি বিশেষকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেয়ার খবর আমরা আখছারই শোনতে পাই। জরিমানা, অমানবিক শারীরিক লাঞ্ছনা থেকে শুরু করে সমাজচ্যুতির মত অভিনব ও অন্যায় সাজা প্রদান করা হয় এসব গ্রামীণ শালিশ থেকে।
মনে রাখতে হবে আমরা একটি আইনী রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতর বসবাস করি। এখানে দেশের প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় আইনের চোখে সমানাধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়। চূড়ান্ত অর্থে সাজা প্রদানের উপযুক্ত দোষী সাব্যস্ত করার একমাত্র এক্তিয়ার দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে যারা মনগড়া গ্রামীণ শালিশের নামে অমানবিক সাজা আরোপ করেন তারা নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রীয় আইনের বিরোধিতা করছেন যা আরেক বড় অপরাধ।