আসাদ মনি
গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জেলার ১১ উপজেলায় এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজের জায়গা সংকোচন, কৃষিতে লোকসান ও নতুন কাজের সুযোগ না থাকার ফলে সবাই শহরের দিকে ছুটছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যয়ের সম্মুখিন হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের সংস্কৃতি।
সুনামগঞ্জ জেলা এক ফসলি কৃষির উপর নির্ভরশীল। বছরের ৬ মাস কৃষিকাজ করার সুযোগ রয়েছে এখানে। বর্ষার ৬ মাস উৎপাদিত ফসলের উপর নির্ভর করে চলে গেরস্থ পরিবারগুলো। তখন গ্রামগুলোর চর্তুরদিকে পানি থৈ থৈ করে। এসময় মানুষ গ্রামের দোকানগুলোতে ভিড় জমায়। আড্ডা- গল্পে প্রাণোছল থাকে গ্রামগুলো। সন্ধ্যায় গ্রামের পর গ্রাম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সকালে শুরু হয় আবারো গান- গল্প ও বাহারী খেলা। এছাড়াও গ্রামের বাজারগুলো সব সময় থাকে সজিব। সপ্তাহের ১ বা ২ দিন থাকে বাজার বার। সে দিন মানুষের ঢল নামে বাজারে। কিন্তু কৃষিতে লোকসান ও বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের সেসব সংস্কৃতি। অর্থের অভাবে মানুষের নীতি-নৈতিকতা কমছে। কাজের খুঁজে প্রতিদিনই শহর-বন্দরমুখি হচ্ছেন হাজারো মানুষ। সেখানে একজন থেকে দুজন হয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন পরিবার।
কৃষকরা বলছেন ২০১৭ সনের বন্যার পর শহরের সুশিল সমাজ তাদের নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এর আগে এতো বছর ধরে তাদেরকে লোকসান দিতে দিতে সর্বহারা হতে হয়েছে। সে বার ফসলহানির মহা-দুর্যোগের পর জেলার ৪ আনা মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন।
জানা যায়, হাওরের কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জমি চাষাবাদ করেন। মহাজনের সাথে শর্ত থাকে বৈশাখ মাসে ধান বা টাকা সুদ সহ ফেরত দেয়ার। তাই কৃষক বৈশাখ মাসে লোকসানে ধান বিক্রি করে মহাজনের ঋণ পরিশোধ করেন। দেখা গেছে ঋণ পরিশোধ করতেই ক্ষেতের উৎপাদিত ধান সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। তাই সারা বছর চলার জন্য শহর- বন্দরে কাজের জন্য আসতে হয় তাদের।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের প্রতিটি গ্রামে ঋণের পরিমাণ অনেক। সে সব ঋণের বেশির ভাগ জমি চাষ করার জন্য নেয়া হয়। ধর্মপাশা উপজেলার নওয়াগাঁও ১৪০ পরিবারের গ্রামের ঋণের পরিমাণ প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা, পাটকৌরা ১৩০ পরিবারের গ্রামের ২ কোটি টাকা ও মজলিসপুরের ৩৩ পরিবারের গ্রামের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৮ লক্ষ টাকা। এতো ঋণের সৃষ্টি হয়েছে সব কৃষিকে কেন্দ্র করে। কোনো গ্রামের মানুষ ঋণ ছাড়া নেই। লোকসান ও ঋণের টাকা পরিশোধ করতে অনেক পরিবার গ্রাম ছাড়া হচ্ছেন।
তাহিরপর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, তাহিরপুরে ৫০ হাজার শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা ছিলো। বড়ছড়া ও কলাগাঁও এ দুটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে কয়লা আসতো বাংলাদেশে। সে কয়লা প্রক্রিয়াজাত করণ করে পাঠানো হতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এতে এলাকার মানুষদের কোনো অভাব ছিলো না। কৃষি ছাড়াও বিকল্প কাজের ব্যবস্থা ছিলো। বর্তমানে সেটি বন্ধ আছে। ফলে মানুষ তো এলাকা ছাড়া হচ্ছেনই সাথে সাথে ব্যবসায়ীরাও লোকসানে আছে। বেচা-কেনা নেই।
ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুর বেড়িরকান্দা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারেক মাস্টার বলেন, এলাকার মানুষ সারাজীবন কৃষির উপর নির্ভর করে চলে আসছে। লোকসান দিতে দিতে এখন নিঃস্ব কৃষক। আর গ্রামে বিকল্প কাজের ব্যবস্থা নেই। তাই সবাই শহরমুখি হয়ে যাচ্ছেন।
মধ্যনগর থানার চামরদানি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক কৃষক কৃষি কাজ ছেড়ে শহরের গার্মেন্টস ফেক্টরিতে কাজ করছেন। আর গ্রামের নিজের জমি যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য বিনা টাকায় আরেক জনকে দিচ্ছেন চাষ করার জন্য।
তাহিরপুর উপজেলার খলিশাজুরী গ্রামের বাসিন্দা মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, খাবার খুরাকের জন্য কিছু জমিতে ধান চাষ করি। আর এলাকায় আগে কয়লার কেরিংয়ের কাজ করা যেতো। সেটি বন্ধ হওয়ায় এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে উপাস থাকতে হয়। তাই ভোলাগঞ্জ, কুমিল্লা, ঢাকাতে যাই কয় দিন পর পর। ১০ দিন আগে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের বালু কেরিং করে এসেছি। এখন বাড়িতে আছি। চারায় (বীজ তলা) ধানের বীজ ফেলবো।
দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আইমা নয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সখিচরণ পুরকায়স্থ বলেন, এলাকায় বিকল্প কাজের ব্যবস্থা না থাকার ফলে সবাই শহরে গিয়ে কাজ খোঁজে। আমাদের এলাকার অনেকে শহরে রিক্সা, সিএনজি চালায়। এজন্য আমরা যারা এখনো অল্প কিছু জমিতে ফসল চাষ করি বৈশাখ মাসে ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটে পড়তে হয়।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু বলেন, কৃষক সার-বীজ ঋণ নিয়ে কিনে ধান চাষ করে। ঋণ তো দিতেই পারে না বরং বৈশাখে মহাজনের চাপে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হয়। এজন্য এবার অনেক কৃষি জমি পতিত থাকবে। অপরদিকে এসব কারণে শহরের উপর চাপ বাড়ছে।
- বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৫ ইউনিয়নে আ.লীগের কমিটি গঠন
- সিলেট বিভাগের উন্নয়নের জন্য আমার হাতে পাঁচশত কোটি টাকা আছে


