বিশেষ প্রতিনিধি
সেলামীর সঙ্গে ঘুষের টাকা যারা দিতে পারছে, তাদের টাকা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদের টাকা নিচ্ছে না উপজেলা ভূমি অফিস। শাল্লা উপজেলা সদরের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারে সরকারের খাস খতিয়ানে থাকা ১০৫ টি দোকানকোঠার ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সহকারী শামছুদ্দোহা এই টাকা আদায়ের কাজ করছেন। বাজারের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এই নিয়ে সংকটে পড়েছেন। শামছুদ্দোহা এমন অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে সরকারের খাস খতিয়ানে ১০৫ টি দোকানকোঠা আছে। এসব দোকানকোঠার সেলামী বহুবছর ধরে আদায় করছে না উপজেলা ভূমি অফিস। সম্প্রতি দোকানকোঠার সেলামী আদায় শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও সেলামী দিতে রাজি হয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হয়ে অফিস থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০০৪ সালের সার্কুলার অনুযায়ী বছরে প্রতি শতকে ২ হাজার টাকা করে সেলামী দিতে হবে। সেই অনুযায়ী যা আসে তার সঙ্গে আরও ২০ হাজার টাকা যোগ করে টাকা দিলেই সেলামী নেওয়া হবে।
জানা গেছে, ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের সকলেই সালামীর টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। বেকায়দায় পড়েছেন সেলামীর সঙ্গে ঘুষের টাকা দিতে গিয়ে। কারো কারো নিকট সেলামীর সঙ্গে ঘুষের টাকা আরও বেশি চাওয়া হচ্ছে, না দিতে পারলে মামলা হবে, বন্দোবস্ত বাতিল হবে এমন হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
বন্দোবস্ত নেওয়া একাধিক ব্যবসায়ী বললেন, এই বিষয়ে আমাদের নাম ছাপা হলে, আমরা আরও বেকায়দায় পড়বো, কেউ কেউ তথ্য দিয়ে আপাতত সংবাদ না করারও অনুরোধ জানালেন। বললেন, আমরা কোনভাবে সেলামী দেই, পরে সংবাদ করলে ভালো হয়।
একজন ভিট মালিক জানালেন, আমি ওখানে দোকানকোঠা কিনেছি, সেলামী না দিলে রেজিস্ট্রি করতে পারছি না। সেলামী ৮০ হাজার টাকা দিয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে রাজি হয়েছি, একজন মধ্যস্ততাকারীকে দিয়ে এ বিষয়টি চূড়ান্ত করেছি।
বাজারে থাকা আধা শতকের একজন ভিট মালিক বললেন, এক শতকের ভিটে যা সেলামী, আমাদের আধা শতকের ভিটেও তাই দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া বাজার কমিটির সম্পাদক বলছেন, আরও ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে। এই টাকা এখন কিভাবে মিলাই। বিপদে পড়ে এর কাছে ওর কাছে যাচ্ছি।
ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মহিতুষ দাশ বললেন, বছরে প্রতি শতকের সেলামী বাবদ ২ হাজার টাকা এবং আলাদা আরও ২০ হাজার টাকা দেবার জন্য আমাদের সম্পাদক অফিসের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এই টাকা কে নেবে আমি জানি না। সাধারণ সম্পাদকের নম্বর দিচ্ছি তার সঙ্গে কথা বলুন।
সাধারণ সম্পাদক সুবীর সরকার পান্না বললেন, ২৮ বছরের সেলামী বকেয়া পড়েছে, প্রজ্ঞাপন অনুসারে যাদের এক শতকের ভিট তারা বছরে দুই হাজার টাকা এবং আধা শতকের ভিটে এক হাজার টাকা বছরে হিসাব করে যা আসে দিতে হবে। ঘুষের টাকার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী শামছুদ্দোহা বললেন, শাল্লা উপজেলা হবার পর থেকে এখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) খুব কম সময়ই ছিলেন। এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারগণ সেলামী আদায় করার উদ্যোগ নিতে পারেন নি। এখনকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্যার সরকারের রাজস্ব আদায়ে উদ্যোগী থাকায় ১০৫ টি ঘরের ২৮টি থেকে ৪১ বছরের সেলামী আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। ১৫ টি ভিটের এই পর্যন্ত সেলামী আদায় হয়েছে। ২০০৪ সালের সার্কুলার অনুযায়ী প্রতি শতকে বছরে দুই হাজার হিসেবে ৪১ বছর যারা দেন নি, তাদের কাছ থেকে সকলের অনুরোধে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে, কেউ সরকারী টাকার বাইরে কোন টাকা দিয়েছে, এমন প্রমাণ দিতে পারবে না, যারা ঘুষ দেবার কথা বলছে, তারা আসলে সরকারের পাওনা টাকা দিতে চায় না। এজন্য মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর আহমদকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় কথা বলা যায় নি।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, বাজারের সেলামী আদায় নিয়ে কিছু কথা শুনেছি। এ নিয়ে কথা বলতে আজ (শুক্রবার) রাতে বাজার কমিটির সম্পাদককে ডেকেছি। তার সঙ্গে কথা বলার পর এই বিষয়ে বলা যাবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন. বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে। সেলামীর অতিরিক্ত টাকা কেউ নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শাল্লা উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ণ প্রকল্পের প্রায় ১৪ শ’ ঘর নির্মাণে অনিয়মের বিষয় সম্প্রতি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে আলোচিত বিষয় ছিল।


