ঘৃণার কাছে ভালবাসা পরাভূত হওয়ার এই সময়ে

শুক্রবার ১৪ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত ‘ভালবাসা দিবস’ -এ দুই গৃহবধূ নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই দিবস পালনের যথার্থতাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিলেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একদিকে শিমুল বাগানের ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত থাকা যুবক-যুবতীদের ছবির সাথে ‘বাসন্তী ভালবাসায় রঙিন পহেলা ফাল্গুন’ শিরোনাম দিয়ে চার কলাম জুরে বসন্তবরণ ও ভালবাসা দিবসের খবর পরিবেশন করা হয়েছে, ঠিক এর নীচেই তিন কলামে প্রকাশিত পৃথক দুই গৃহবধূ নির্যাতনের সংবাদটি উপরের চার কলামকে যেন চোখ তাতিয়ে ব্যঙ্গ করছে। ভাল ও মন্দ একই সময়ে একই সমাজে সহাবস্থান করে আমরা জানি, কিন্তু শুভবোধসম্পন্ন মানুষ সর্বদাই ভালর জন্য ব্যাকুল থাকেন, ফলে মন্দ সংবাদের চাইতে শুভ ও সুন্দর সংবাদটি সমধিক গুরুত্ব পায়। কিন্তু এও ঠিক যে, সময়টা ভাল নাকি মন্দকে বেশি করে ধারণ করছে তার তাৎপর্যটাও অতিশয় প্রাসঙ্গিক। বলাবাহুল্য ভালবাসা ভালবাসা বলে মুখে ফেনা তুলে, হলুদ-লাল পরিধান গায়ে চড়িয়ে, গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল বিলিয়ে যে নান্দনিক মধ্যবিত্ত নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেই সংস্কৃতি কিন্তু সমাজ থেকে মন্দ উপসর্গগুলোকে বিদায় করতে সম্পূর্ণই ব্যর্থ হচ্ছে। এমন অবস্থায় বেশির ভাগ মানুষ এইসব ভালবাসা দিবসের আবেগ মথিত হয়ে খুশির ফোয়ারা ছুটাতে পারে না। বরং প্রতিদিনের মত নির্দিষ্ট ভালবাসার এই দিনটিতেও নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বামীর বাড়ি ছাড়ে, হাসপাতালের শয্যায় শায়িত হয়। ভালবাসার সবচাইতে গ্রহণযোগ্য ব্যঞ্জনা উপলব্ধি করলে ওইসব নির্যাতন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ যদি সমাজে জারি থাকত তাহলে হয়তো দিবসটি সার্থকতা লাভ করত। কিন্তু কোথায় সেই মন্দ তাড়িয়ে ভালকে প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ? নেই, কোথাও নেই।
প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে শহরতলির ওয়েজখালির এক গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে চাবুক ও বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে তার পাষ- স্বামী। ভালবাসার মানুষের হাতে প্রহৃত ভাগ্যহীনা নারীটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য সংবাদ মোতাবেক, জনৈক মদ্যপ চরিত্রহীন যুবকের আক্রমণে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আহত হয়েছেন সদর উপজেলার শাফেলা গ্রামের আরেক গৃহবধূ। তিনিও হাসপাতালে প্রেরিত হয়েছেন। কী জঘন্য সমাজ বাস্তবতা এখনও। গৃহবধূরা নিজ ঘরে নিরাপদ নন। তারা লোভী স্বামী কিংবা মদ্যপ লুচ্চার হুমকির সামনে থাকে। এ তো একদিনের ছোট্ট দুইটি ঘটনা মাত্র। প্রতিদিনের খেরোখাতার হিসেব নিলে যে ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে তাতে প্রতিটি দিনই উন্মত্ত কৃৎসিৎ রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভালবাসা দিবসকে নিছকই ভাঁড়ামি মনে করে যদি কেউ মন্তব্য করেন তাকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই।
ভালবাসা কোনো অবস্তুগত বায়বীয় বোধ কেবল নয়, এর বস্তুগত রূপটি স্পষ্ট হওয়া উচিত সকলের মনে। নিজেকে কিছু সময় আনন্দে বিভোর রাখার নাম ভালবাসা নয়। ভালবাসা হলো সকলকে নিয়ে নিজে ভাল থাকা। সকলের ভালর জন্য মনের মধ্যে তাগিদ অনুভব করা। একে মনুষ্যত্ব বলা যেতে পারে। আজ মনুষ্যত্বের চরম পরাজয়ের সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে। ঘৃণার কাছে ভালবাসা পরাভূত, লোভের কাছে উদারতা পরাস্ত, হিংসার কাছে সহিষ্ণুতা পরাজিত, অসুরের কাছে সুর পদানত, স্বার্থের কাছে মানবতা ভূলুণ্ঠিত, অসুন্দরের সা¤্রাজ্যে সুন্দর প্রহৃত। এমন অবস্থায় যারাই অন্তরে ভালবাসার টান অনুভব করেন তাদের দায়িত্ব সময়ের এই বৈরিতাকে জয় করার লক্ষে নিজেদের নিয়োজিত করা। কেবল তাহলেই তারা ভালবাসার অনিন্দ্যসুন্দর আভায় নিজেদের সুপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবেন।
পুরো বসন্ত কালই নাকি ভালবাসার রঙে রঙিন থাকে। নানা বর্ণের ফুলে পরিবেশ মোহনীয় হয়। ব্যাকুল বাতাস আকুল করে সকলের হৃদয়। এই বসন্তে তাই নিজেদের মনকে পবিত্র করুন। এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হোন যেখানে ভালবাসা অন্তসলিলা নদীর মত প্রবাহিত হয়, যে প্রবহমান জলধারা ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলকে সমান আর্দ্র করে।