চন্দ্রাহত শহরের মানুষেরা ভালো নেই

ইকবাল কাগজী
পূর্ব প্রকাশের পর
পাঁচ ॥ আপনি কি ভালো আছেন ?
সম্পদে ব্যক্তিমালিকানার পরিণতিতে সমাজে শ্রেণিবৈরিতার সৃষ্টি এবং এর মর্মে নিহিত অশুভ প্রবণতা থেকে ‘মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণ করা’র সন্ত্রাসী প্রকরণের অনিবার্য প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং সর্বাবস্থায় প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে উঠে। এবংবিধ সন্ত্রাসী সমাজে সাধারণ মানুষ ভালো থাকতে পারে না।
আমাদের সুনামগঞ্জের সমাজটাও তলে তলে সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছে। অতীতে প্রকাশ্য দিবালোকে এই শহরেই প্রধান রাস্তার মোড়ে খুন হয়েছে, কিংবা কোথাও কোনও প্রত্যন্ত হাওরে বিলের খলায় গলা কেটে খুন করা হয়েছে কোনও জেলেকে। হাওররক্ষা বাঁধের বরাদ্দ নিয়ে নয়ছয় করা থেমে নেই, যেমন থেমে নেই নদীতে নৌযান আটকে চাঁদাবাজি। এসব যেমন চলছে তেমনি সমান তালে চলছে মাদকসেবাÑ শহর কিংবা গ্রামে, কোথায় নয় ? এমনসব হাজার হাজার উদাহরণ দিয়ে পাঠককে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। কেবল বলি : এইসব অবৈধ, অসামাজিক ও অমানবিক কর্মকা-ের সমাহার একটি সার্বিক সন্ত্রাসের করাল মূর্তি ধারণ করে সমাজসংসারকে কব্জা করে নিয়েছে, প্রতিনিয়ত শাসিয়ে চলেছে এবং মনে হয়, এই সন্ত্রাস থেকে মুক্তির পথও এই সন্ত্রাসই রুদ্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং এই সর্বাস্তৃত সন্ত্রাসের রাজত্বে আমি ভালো নেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, সেনাধ্যক্ষ, পুঁজিপতি, ব্যবস্থাপক, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে কোনও আর্দালি, রিকসাওয়ালা, কারখানা শ্রমিক, কৃষক, ফেরিওয়ালা কিংবা ফুটপাতে বসে জুতো সেলাই করা মুচি পর্যন্ত কে কোথায় ভালো আছেনÑ আমি জানি না। কিন্তু যিনি প্রকৃতপ্রস্তাবেই ভালো আছেন তিনি কে ? বাইডেন, পুতিন ও জেলেনস্কি কিংবা যিনি সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ারে রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ও শীতে আর্ত হয়েÑ যখন যেমনÑ বসে বসে জুতো সেলাই করছেন, তিনি ?
‘আপনি কি ভালো আছেন ?’ বলেছি প্রশ্নটির উত্তর চাই না। কেন চাই না। তার জবাবে বলা যায়, প্রকৃতপ্রস্তাবে বিষয়টাতে তো সেই ‘কানার মনে মনে জানাই আছে’র মতো সহজ স্বাভাবিক। কিন্তু পুনরায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, ‘কিন্তু কীভাবে ?’ এইভাবে হাজারটা প্রশ্ন করা যায় বা যাবে। আমি কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার ধারেকাছে যাচ্ছি না, কেবল তর্জনী তোলে নির্দেশ করছি সমাজসংস্থিতির দিকে।
নরনারীর জৈবিকতা থেকে উদ্ভূত মানুষের শরীরে মনুষত্বের ¯্রষ্টা সমাজ। মানুষ এই সমাজে মানুষ হয়ে উঠে সামাজিক পরিবেশের পরিসরে চলিতকর্মে সংশিষ্ট থেকে। চলিতকর্ম একক মানুষকে সমাজের অন্যান্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে। অর্থাৎ একটি সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে, প্রগতিশীল চিন্তকেরা যাকে বলেন উৎপাদন সম্পর্ক। এই সামাজিক সম্পর্কই নির্ধারণ করে দেয় মানুষের চৈতন্য, নৈতিকতা, নান্দনিকতার রুচি অর্থাৎ সংস্থিত সামাজিক পরিবেশই মানুষের উক্ত ত্রিবিধ গুণের উৎস, মানুষের মানুষ হয়ে উঠার মূল কারণ। সুতরাং সমাজসংস্থিতিই প্রকৃতপ্রস্তাবে ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিতা কিংবা ব্যক্তিত্বের হোতা।
এই তো কীছু দিন আগে (১১ মে ২০২৩) দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে ৪ সন্তানের জনক কারাগারে’। আপনারা পাঠ করে থাকবেন হয় তো। বাংলাদেশে এমনটি হচ্ছে গ্রামশহরের যত্রতত্র। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোনও স্থানে এমনটি কি হচ্ছে ? পাশ্চাত্যের যারা ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে মানুষ মারার মওকা তৈরি করে নিজেদেরকে বর্বর বলে প্রতিপন্ন করে, এমন উদাহরণ আছে যে, তারা গণমাধ্যমে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে নারীর কুমারিত্বকে নিলামে তোলে বটে কিন্তু উপরোক্ত ৪ সন্তানের জনকের মতো অপ্রাপ্তবয়স্কাকে ধর্ষণ করে বলে শোনা যায় না। এই ক্ষেত্রে অন্তত তাঁরা বাংলাদেশের মতো এতোটা বর্বব নয়। তারপরেও সে-দেশেও ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উদাহরণ উপস্থাপন করাও বোধ করি অসম্ভব হবে না। কিন্তু কথা হলো, তাদের দেশে যা ব্যতিক্রম আমাদের দেশে তা নৈমিত্তিক। পত্রিকার পাতা খেলে দেখুন, নিশ্চয় বোধোদয় হবে। সাংস্কৃতিক উন্নতির কতোটা নি¤œ ধাপে আধঃপতিত হলে কিংবা চিৎপ্রকর্ষের দিক থেকে কতোটা পিছিয়ে থাকলে এমন খতরনাক পশুপ্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়ে মানুষ এবং তখন কোনও মানুষের মানসতা কতোটা পাশবিক হলে সে তার স্বকন্যাসম অপ্রাপ্তবয়স্কাকে ধর্ষণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না, একবার কল্পনা করুন। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদকে সমালোচনা করা হয় স্বকন্যার সহপাঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে তাঁকে বিয়ে করার জন্যে। কিন্তু সেখানে কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্কার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নেই। সমাজধর্মপ্রথানুসারে সেটা স্বীকৃত বিষয়ও বটে। তবু তাঁকে যিনি সমালোচনা করছেন তিনিই ধর্ষক কোনও পরিজনকে বাঁচানোর জন্য প্রকারন্তরে ধর্ষণকে অপারাধ হিসেবে গণ্য না করার অপকর্মে নিমজ্জিত হচ্ছেন। সমাজে অন্তর্নিহিত এবংবিধ লুচ্চামির সংস্কৃতি বহাল থাকলে পুরো সমাজটাই ভ- সমাজে পর্যবসিত হয়। এমন সমাজে কেউ ভালো থাকতে পারে না। কারণ ধর্ষকেরই কেউ কোনও একদিন ধর্ষণের শিকার হয়ে যেতে পারেন, সে-সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রসঙ্গক্রমে একটি নাটকের কথা মনে পড়ছে। সেখানে এক হিরোইন ব্যবসায়ীর গল্প বলা হয়েছে। মাদকব্যবসায়র কল্যাণেই এই ব্যবসায়ী বিরাট ধনী, অঢেল তাঁর সম্পদ। তাঁর একটিই মাত্র মেয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে। মাদকব্যবসায়ী একসময় জানলেন তাঁর কন্যাটি তাঁরই সরবরাহকৃত হিরোইনে আসক্ত এবং মরণাপন্ন অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। ভুলটা শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। ব্যবসায়কে অবশ্যই হতে হবে প্রথমে প্রকৃতিবান্ধব ও পরে জনসেবামূলক, প্রাণসংহারক কীছুতেই নয়। কিন্তু কী আর করা। সর্বনাশ যা হবার তা তো হয়েই গেছ।
আলোচ্য প্রসঙ্গটা ধর্ষণের এবং অবশ্যই অপ্রিয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত, মাদক ব্যসসায়ও তেমনি। এই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করা যায়, কিন্তু আপাতত তা করছি না। কেবল বলি আগেও বলেছি, ধর্ষণ এখন নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। বিবাহবহির্ভূত যৌনতার চর্চা সমাজে আগেও ছিল এখনও আছে ফল্গুধারার মতো প্রবহমান। কিন্তু তাই বলে ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠবে সেটা কারও কাম্য হতে পারে না। অথচ তাই হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ষক সামাজিক প্রশ্রয়ের অধিকারী পর্যন্ত হয়ে পড়তে পারছে, আনুকূল্য দিচ্ছেন তথাকথিত সমাজনিয়ন্ত্রক মাতব্বররা, এমনকি প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কোনও কোনও দুর্নীতিবাজ। অবস্থাদৃষ্টে সত্যি অবাক না হয়ে পারা যায় না। জাতিগতভাবে কতোটা চিৎপ্রকর্ষহীন হয়ে গেলে একটি নির্দিষ্ট সমাজে এমনভাবে ধর্ষণের হার বেড়ে যেতে পারে, অনুধাবন করা যায় না। অথবা ধরুন সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিলেন। দাম নির্ধারণ করা হলো। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেটা কার্যকর হলো না। যথারীতি কৃষক উৎপাদন খরচের কম দামে ধান বিক্রয় করতে বাধ্য হলেন। এভাবে এন্তার উদাহরণ সিন্নিবেশ করা যেতে পারে, যা প্রমাণ করবে সমাজ এইভাবে কোনও না কোনও কারণে ‘প্রতিষ্ঠিত সমাজসংস্থিতিসঞ্জাত আঘাতে’ আহত, সুতরাং প্রতিষ্ঠিত সমাজসংস্থিতির পরিসরে মানুষের ভালো না থাকার পরিসর তৈরি হতেই পারে। তার বৃত্তটা আসলেই বৃহৎ। এতোটাই বৃহৎ যে তার ভেদবিস্তার অসীমতাকে স্পর্শ করে নিয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজসংস্থিতির পরিসরে বসবাসরত মানুষের নিত্যদিনের ভালো না থাকার একটি তালিকা করলে সে-তালিকাটা কতোটা দীর্ঘ হবে তার পরিমাপ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যক্তির এবংবিধ ভালো না থকার একটি মূলগত কারণ তো আছেই, সমাজসংস্থিতির মহাযজ্ঞের তাপচাপের থেকে প্রাদুর্ভূত সে-কারণকে আড়াল করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ প্রয়োগ করে। আইনের বাইরেও আছে বিভিন্ন প্রকরণÑ সমাজিক-রাজনীতিক চাপ, হুমকি, অত্যাচার, নিপীড়ন, সন্ত্রাসী হামলার ভয় ইত্যাদি। ক্ষেত্র বিশেষে সেটা খুন কিংবা গণহত্যা পর্যন্তও গড়ায় বা গাড়াতে পারে। সুতরাং প্রতিষ্ঠিত সমাজসংস্থিতির পরিসরে শ্রেণিবৈরিতাসঞ্জাত সহিংসতা কার্যকর করতে একটি কাঠামোগত সন্ত্রাসীব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে কিংবা করে রাখা হয়েছে, যে-কাঠামোর অভ্যন্তরে সৃষ্ট ক্ষমতাবলয়ের বাইরে বাস করা সাধারণ মানুষেরা ভালো নেই।
গত বুধবারে (২৪ মে ২০২৩) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদপ্রতিবেদন অনুসারে সাম্প্রতিক সমাজপরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা উপজিত হয় যে, আমরা সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দারা দুর্গতি কিংবা একধরণের বিপন্নতার মধ্যেই কালাতিপাত করছি। দেশের অন্যান্য পৌর শহরের কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা নিজেদের গ্রামীণ পরিসরে ভালো আছেন, সেটাও বলা যায় না। গত কয়েক দশকে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো পাঠ করলে সেটা সহজেই অনুমেয়। উল্লেখিত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনামটি চমকে দেবার মতো না হলেও নাগরিক সমাজের জন্যে ভাবনার বিষয় তো বটেই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ‘মাদকাসক্তদের কর্মকা-ে অতিষ্ঠ ওয়ার্ডবাসি’ এবংবিধ সংবাদশিরোনাম প্রকাশের পর ভালো শহর হিসেবে সুনামগঞ্জের সুনাম বিনাশ হয়ে রাতেও উজ্জ্বল চন্দ্রাহত সুনামগঞ্জকে আমাবস্যাহত অন্ধকার সুনামগঞ্জে পর্যবসিত করে।
কেবল শহর নয়, দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল নিয়েও এমন কদাকার সংবাদশিরোনাম যে হচ্ছে না, এমন কিন্তু নয়, বরং প্রতিনিয়ত হচ্ছে, বেশি অথবা কম। কোথাও কোথাও সংবাদ প্রকাশের ব্যবস্থাটিকেই সন্ত্রাসী প্রকরণে প্রতিবন্ধী করে রেখে দেওয়া হয়েছে, মানুষের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার প্রতিকার হবে কি, জানাই যাচ্ছে না এবং প্রকারান্তরে যথারীতি অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগও নেই। এমনকি জনসমক্ষে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার কোনও প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না কিংবা থানায় অভিযোগ করতে যাচ্ছে না ভুক্তভোগিরা এবং প্রকারান্তরে সহজেই হৃদবোধ হয় যে, অভিযোগ করতে অপারগতার পেছনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনের আশ্রয় গ্রহণকারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রশাসনিক অপারগতা বিদ্যমান। এমতাবস্থায় শান্তির চান্দ্রচাদরে অশান্তিকে ঢেকে দিয়ে নির্মম শোষণ-নির্যাতনসঞ্জাত অশান্তি নির্বিঘেœ জাঁকিয়ে বসেছে। এবংবিধ সব কীছুর পেছনেই সেই অর্থস্বার্থ উদ্ধার, ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক সমাজসংস্থিতির পরিসরে টাকার কুমির হয়ে উঠার অর্থনীতি সক্রিয় রাখার যাবতীয় কলাকৌশলের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়। সংবিধানে সমাজতন্ত্র লিখে রেখে যে-সমাজব্যবস্থা পুঁজির পূজায় নিমগ্ন থাকে সে-সমাজে শেষ পর্যন্ত চেরাচালান, সম্পদপাচার, পরস্বাপহরণ, দখলচ্যুতি, দেহব্যবসা, চুরি, জুচ্চুরি, জুয়া, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, দলবাজি, পণ্যেভেজাল মিশ্রণ, ঘুস, দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবংবিধ কার্যক্রম সহকারে এককথায় সর্বাস্তৃত আত্মসাৎ দাপটের সঙ্গে অবশ্য অবশ্যই সক্রিয় থাকবে, এমন পুঁজিপূজক সমাজের এটাই একমাত্র নিয়ম।
মাদকব্যবসায়র প্রসার নিয়ে সুনামগঞ্জ ব্যতিব্যস্ত অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে। প্রয়াত পুরপতি মমিনুল মউজদীন মাদকব্যবস্যায় প্রতিরাধে সবিশেষ সচেষ্ট ছিলেন, তখন তিনি মাদক প্রতিরোধী (উচ্ছেদ কিন্তু নয়) বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। কিন্তু মাদকব্যবসায়র প্রসার থেমে যে থাকে নি তা তো মর্মে মর্মে টের পাচ্ছেন আক্রান্ত মানুষেরা। ‘পুঁজিপূজক সমাজে’ উক্ত কার্যক্রমগুলোর প্রধান একটি হলো মাদকব্যবসায় এবং পুঁজবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্যানুসারে কমবেশি সকল পুঁজিপূজক সমাজসদস্যরা এবংবিধ যতোসব মানবিকতাবিরোধী ব্যবসায়র সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়ে পারেন না, নিয়তিনির্ধারিত প্রকরণে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। যিনি এইসব অপকর্ম করতে পারবেন না, হয় তাঁকে সেটা নীরবে সহ্য করতে হবে, নয় তো আরোপিত ও উটকো জোর-জুলুমের মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে হবে। প্রতিবাদী মোকাবিলায় টিকে থাকতে না পারলে জীবনের পরপারের টিকেট তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে।
শহরের ৫ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর গোলাম সাবেরীন সাবু’র উদ্ধৃতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য লাগামছাড়া পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই প্রতিপন্ন করে। তিনি বলেছেন, ‘ওয়ার্ডের সুনাম আছে শহরজুড়ে। কিন্তু ইদানিং কিছু মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য সেটা নষ্ট হচ্ছে। এলাকাবাসীকে [নিয়ে] বিভিন্ন সময় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি। তাদের বুঝিয়েছি। কিন্তু তারা কোনোভাবেই এসব ছাড়তে রাজি নয়, উল্টো আরও হুমকি দেয় মহল্লাবাসীকে। বাধ্য হয়ে প্রশাসনের কাছে জানিয়েছি।’ এমতাবস্থায় শহরবাসীকে প্রশাসনের মুখ চেয়ে অপেক্ষায় থাকা ব্যতীত কোনও অন্যথা কিংবা বিকল্প নেই। দেখা যাক এরপর কী হয়।
তবে এখানে না-পারতে একটি অপ্রীতিকর কথা বলে রাখি। ভুলে যাবেন না, পূজির পূজকদের হাত অত্যন্ত লম্বা, এই বৈশ্যশ্রেণির নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের আপাদমস্তকজুড়ে সক্রিয় আছে। সংবিধানে লিখে রাখা সমাজতন্ত্রে সত্যিকার অর্থে কার্যকরভাবে ফিরে যেতে না পারলে অথবা তার বিকল্প কোনওÑ ‘অধিপতি শ্রেণি কর্তৃক অধঃস্তন শ্রেণিকে শোষণ-নির্যাতনবিরোধী’Ñ ব্যবস্থায় দেশকে সুস্থিত করতে না পারলে দেশে শান্তি-সুখ-শৃঙ্খলা কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা বলে কীছই অর্জিত হবে না, কখনওই। প্রকৃতপ্রস্তাবে এখানে ‘শান্তি-সুখ-শৃঙ্খলা’র পক্ষ বিপক্ষের কারও পক্ষেই ভালো থাকার কোনও অবকাশ মিলবে না। সুতরাং একটুকুনি কাব্য করে কেউ যদি মুখ ফসকে বলেই ফেলেন, খ্যাতির সৌরভে সুরভিত চন্দ্রাহত সুনামগঞ্জ শহরের মানুষেরা ভালো নেই। তবে কি তাঁকে মিথ্যাচারী তঞ্চক বলে তিরষ্কার করা হবে ?
সমাপ্ত