চাঁদের আলোয় রাঙা চাঁদমুখগুলো

ভাঙা ঘরে বৈদ্যুতিন আলো ঢোকা বেশ কঠিন। কারণ এত পয়সা খরচ করে বিদ্যুৎতের সংযোগ নেয়া সম্ভব হয় না দরিদ্র গৃহবাসীর। যেমন পারে নি জামালগঞ্জের উজান লালপুর গ্রামের বহু দরিদ্র পরিবার পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিজ ঘর অবধি নিয়ে যেতে টাকার অভাবে। ফলে তাদের ঘরের সামনের উঠোন দিয়ে পল্লী বিদ্যুতের লাইন চলে গেলেও তাদের ঘর যথারীতি অন্ধকার। এ যেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মমতাজের গাওয়া চটুল ঢঙের গান ‘আমার বাড়ির সামনা দিয়া বন্ধুর বাড়ি যায়…’ এর মতো অবস্থা আর কি। দুঃখে বুক ফাইট্যা যায় কিন্তু করার কিছু থাকে না। কিন্তু উদার আকাশের অন্তহীন আশ্রয়ে জ্বলে উঠে যে রূপালী চাঁদ তার বেলায় কোন অসুবিধা নেই। চাঁদরাণী যেন দরিদ্রের ভাঙা ঘর আলোয় উজালা করে দিতেই রাতের আকাশে কোমল আলো ছড়ান। ভাঙা ঘরে যেমন চাঁদের আলো অকৃপন থাকে তেমনি মাঝে মধ্যে এইসব দরিদ্র ঘরে সত্যিকার কিছু চাঁদমুখেরও জন্ম হয়। ঠিক বৃহস্পতিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদভাষ্যের মতো। এই চাঁদ ফুটেছে জেলার ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের বিল্লালপুরের বর্গাচাষী শফিকুল ইসলাম ও খোদেজা বেগম দম্পতির ঘরে। পৃথিবীর আকাশের মতো সেখানে একটি চাঁদ নয়। ছয় ছয়টি চাঁদ ফুলের মতো ফুটে আছে সেই ঘরের আকাশে। তাদের ছয় সন্তান লেখাপড়ায় অসম্ভব মেধাবী। বর্তমান সময়ে যেমন শিক্ষাও পণ্য হয়ে উঠেছে সেখানে এই ছয় সন্তান তার বিপরীতে নিজ প্রতিভাবলে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। এবার তিন ভাই একযোগে দেশের নামকরা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। জাহিদ যেমন মেডিকেলে ভর্তির লোভনীয় সুযোগ করে নিতে সমর্থ হয়েছে তেমনি অন্য দুই ভাই আশরাফুজ্জামান ও মুনসুর আলম সুযোগ পেয়েছে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের ছোট অন্য তিন ভাইবোনও স্কুল পর্যায়ে অধ্যয়নরত এবং তারাও মেধার পরিচয় দিচ্ছে। এই ছয় চন্দ্রকান্ত সন্তান নিয়ে বর্গাচাষী শফিকুল ইসলাম ও গৃহিনী খোদেজা বেগমের ঘরে জাগতিক অভাব অনটনের পাশাপাশি এক ধরনের অপার্থিব আনন্দ বিরাজমান। আমরা এই গর্বিত পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াই। অভিনন্দন জানাই তাঁর সুসন্তানদের।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়া এই তিন ভাইয়ের জীবনে নেমে এসেছিল অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকার। কীভাবে ভর্তির আবেদন করবে, কীভাবে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিবে, এমন অনিশ্চয়তা ছিল তাদের এইচএসসি জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করার পর। এই সংবাদ ছাপা হয় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই অনেক সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিবর্গ দরিদ্র মেধাবীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তাঁদের সম্মিলিত আর্থিক সহায়তায় তিন ভাই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। এতে করে ভাল সবকিছুর প্রতি যে এখনও সমাজের ইতিবাচক মানসিকতা রয়েছে তার প্রমাণ মিলে। বিশেষ করে এই ধরনের মেধাবীদের সহায়তা দিতে অনেকেই আজকাল এগিয়ে আসেন। এই সুযোগে সেই সহৃদয় সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিবৃন্দের প্রতি আমরা অশেষ শ্রদ্ধা জানাই।
মুনসুর, আশরাফুজ্জামান ও মুনসুরের প্রতি আমাদের আহ্বান, তোমরা বড় হয়ে সমাজের এই শুভবোধের কথা মনে রেখো। তোমাদের যে মেধা তোমরা তা ব্যবহার করো আমাদের দুঃখী মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে। যেখানে যত পশ্চাদপদতা সেখানে তোমরা আলো জ্বালিয়ে দাও প্রগতির।