বাজারে ব্যাপকভাবে চালের দাম বাড়ার একটি উদ্বেগজনক সংবাদ ছাপা হয়েছে গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুসারে জেলার বিভিন্ন বাজারে মানভেদে চালের দাম সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে ৬ থেকে ১০ টাকা করে বেড়ে গিয়েছে। চালের দাম বৃদ্ধির কারণে খেটে-খাওয়া নির্দিষ্ট আয়ের লোকজন চরম বিপাকে পড়েছেন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। বোরো প্রধান সুনামগঞ্জে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বহু আগে নিদান থাকত। সেই নিদানের কাল অতিক্রম করেছি আমরা বহু আগে। এখনকার ফসল উৎপাদনসূচী অনুসারে এখন চালের দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। কেন না মাত্রই দুই মাস আগে দেশের অন্যতম প্রধান ফসল আমন ধান কাটাই মৌশুম শেষ হয়েছে। এবং এবার আমনের ফলন প্রত্যাশার চাইতেও ভাল হয়েছে। সুতরাং দাম বাড়ার পিছনে বাজারে সরবরাহজনিত কারণের চাইতে ব্যবসায়িক দূরভিসন্ধি ও কূটচালই প্রধানত দায়ী বলে আমরা মনে করি। ধান-চালের মজুতদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত অপতৎপরতার ফলে চালের দাম বেড়েছে-এই ধরনের অভিমত সকলের।
এই দেশের দুর্ভাগ্য হলো যখন কৃষকের হাতে ধান থাকে তখন এর দাম হয় সবচাইতে কম। উৎপাদন খরচ উঠাতে কৃষকরা হিমশিম খেয়ে যান। আর কৃষকের গোলা শূন্য হয়ে গেলেই ধানের দামের উর্দ্ধমুখী ঘোড়া ছুটতে থাকে প্রবল বেগে। যে ধান ব্যবসায়ী-মজুদদাররা কিনেছেন ৫০০ টাকা মণ দরে সেই ধান এখন তাঁরা বিক্রি করছেন শতভাগ বা তার চাইতে বেশি মুনাফা সহকারে। অথচ এই কারসাজি রোধে প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রাখতে পারছে না ন্যুনতম ভূমিকা। এবারের চালের দাম বাড়ার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে ভুক্তভোগীরা সরকারি টিআর/কাবিখা কর্মসূচীর অভাব এবং বাজারে ওএমএস কর্মসূচীর আওতায় স্বল্পমূল্যে চাল সরবরাহ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর নামে গ্রামে গ্রামে দরিদ্র পরিবারগুলোতে ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রির জন্য যেসব কার্ড বিতরণ করেছেন সেগুলোর সরবরাহ এখনও চলমান আছে কিনা আমাদের জানা নেই। বাজারে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচীর চাল ও খাদ্যশস্যের সরবরাহ ঘাটতির কারণে সকলকে এখন বাজার থেকেই চাল কিনতে হয়। আর চাহিদা বাড়ার এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী। সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের এই অশুভ ছক্রটিকে খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে দিতে না পারলে সামনের দিনে চালের দাম আরও বাড়বে বলেই আমাদের আশংকা।
আওয়ামী লীগ যেসব বিষয়ে পুরো শাসনকাল সফলতা দেখিয়েছে তার অন্যতম হলো খাদ্যশস্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা। খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ কষ্ট পেয়েছেন এমন অভিযোগ বিগত বছরগুলোতে আমরা শুনিনি। এরকম অবস্থায় এবছর চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে এখনই সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বাজারের সবকিছু লাগামহীনভাবে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিৎ নয়। বিশেষ করে খাদ্যশস্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে এটি ভীষণ জরুরি। দেশে খাদ্যশস্যের বর্তমান বাজার ব্যবস্থাটির সংস্কার ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ব্যবস্থায় কৃষকরা ঠকছেন লাভবান হচ্ছেন গুটিকয়েক ব্যবসায়ী। এমন অন্যায্য বাজার ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম এমন একটি বাজার ব্যবস্থা গঠনে সরকারকে সক্রিয় চিন্তা করতে হবে । নতুবা এক পর্যায়ে অলাভজনক বিবেচনায় কৃষকরা ধান উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন যেমন নিয়েছেন পাঠচাষীরা। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভকে গুটিকয় ব্যবসায়ীর মুনাফার মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করা মোটেই বিজ্ঞজনোচিত কাজ হবে না। বিষয়টি বুঝতে হবে বিজ্ঞ জনদেরই।

