চিকিৎসাবঞ্চিত সুন্দর আলীর মৃত্যু আমাদের অসহায় করে দেয়

ছাতকের হাসপাতালে সুন্দর আলী নামের ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি প্রচ- পেটে ব্যথায় কাতর হয়ে নিজে নিজেই গিয়েছিলেন ছাতর হাসপাতালে। পেশায় রিক্সাচালক শ্রমজীবী সুন্দর আলী ভেবেছিলেন সরকারি ওই চিকিৎসালয়ে গেলে তিনি ভাল হয়ে যাবেন। কিন্তু না, সেখানে তার চিকিৎসা হয়নি। সাথে কোন অভিভাবক নেই, এমন খোড়া অজুহাত দেখিয়ে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয় নি হাসপাতালে। অসহ্য ব্যথায় সুন্দর আলী তখন কাহিল প্রায়। নিজে নিজেই হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে পড়েন। একজন ওয়ার্ডবয় দয়াপরবশ হয়ে তার গায়ে একটি কম্বল বিছিয়ে দেন। ওই বেডেই দুই দিন পড়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু কোন চিকিৎসা তার কপালে জুটেনি। হাসপাতালের অন্য রোগীরা বলছেন, বেডে শুয়ে তিনি ডাক্তার ও নার্সদের কাছে চিকিৎসার জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু কারও হৃদয় এতে টলেনি। অবশেষে মৃত্যু নামক চির উপসমকারী এসে তাকে নিস্তার দিল। বুধবার হাসপাতাল বেডেই সুন্দর আলীর মৃত্যু হয়। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের অধিবাসী এই সুন্দর আলী। পেটের দায়ে রিক্সা চালাতে ছাতকে এসেছিলেন। ছাতকে তার কোন নিকটাত্মীয় না থাকায় সংগত কারণেই এই অসুস্থ লোকটির খোঁজে হাসপাতালে কেউ আসে নি। কোন নিকটাত্মীয় না থাকার অপরাধে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়েই তাকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হল। কত নির্দয় এই পৃথিবী, এই পৃথিবীর কতিপয় চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মী কতোটা নিষ্ঠুর।
প্রশ্ন আসে, পীড়িত কেউ যখন হাসপাতালে যান তখন কি চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার জন্য তার সাথে কোন অভিভাবক থাকা একান্তই আবশ্যকীয়? তাই যদি হয় তাহলে নিজ এলাকার বাইরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হন তাদের চিকিৎসা হয় কোন উপায়ে? ছাতক হাসপাতালে কর্তব্যরত যে চিকিৎসাকর্মীরা তাকে চিকিৎসা দেয়ার পরিবর্তে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন অমানবিক পন্থায় তারা কি সঠিক কর্তব্য করেছেন? আইন, নিয়ম, কানুন ইত্যাদি কি মানুষকে বাঁচানোর জন্য নাকি মারার জন্য? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সত্যিই কঠিন। আরও কঠিন হয়ে যায় রোগীটি যদি গরিব হয়।
সুন্দর আলীর হাসপাতালে যাওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে তার একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিৎ। কেন কোন অবস্থায় কারা তার চিকিৎসা করেন নি তা খোঁজে বের করা হোক, এটি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো যেকোন মানুষের দাবি। একজন মানুষ বাঁচতে গিয়ে মরে যাবেন সেটি কখনও মেনে নেয়ার নয়। যে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা এই গর্হিত অন্যায় কর্মটি করেছেন তারা নিশ্চিতভাবেই চিকিৎসক সমাজের গায়ে কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। অপরাপর চিকিৎসকদের দায়িত্ব হলো এই কলঙ্কচিহ্ন মোচন করা। আমাদের দেশে চিকিৎসক সমাজ সম্পর্কে সাধারণ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা সাংঘাতিকভাবে ক্রিয়াশীল। সুন্দর আলীর মতো গরিব শ্রমজীবী এক ব্যক্তির মৃত্যু ওই ভাবমূর্তিকে আরও কালিমালিপ্ত করছে। সুতরাং এজন্য দায়ীদের অবশ্যই উপযুক্ত সাজা বিধান করা জরুরি।
চিকিৎসাপেশা কিছু মহান নীতিবোধের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সর্বশেষ কথা হলো মানুষকে বাঁচাতে সর্বশেষ চেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখা। সুন্দর আলীর ক্ষেত্রে এই মহান পেশার কোন নীতিবোধই প্রযুক্ত হয়নি। আমাদের দুঃখের জায়গা এইটুকুই।