টানা নয় দিন ছুটি কাটিয়েও ঈদের আনন্দ শেষ হয়নি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের কতিপয় চিকিৎসকের। কষ্ট স্বীকার করে যারা এসেছেন তারাও চেম্বারে রোগী না দেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সময় কাটিয়েছেন। নয় দিন ছুটি শেষে প্রথম কার্যদিবস রবিবারে সদর হাসপাতালে এরকম দৃশ্য দেখা গেছে। দূরদূরান্ত থেকে অনেক রোগী নির্দিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসে বিফল মনোরথে ফিরে গেছেন। অনেকে কোন এক ডাক্তারের নাম ধরে অভিযোগ করেছেন ওই ভদ্রলোককে কখনও চেম্বারে রোগী দেখতে দেখা যায় না। জেলা সদর হাসপাতালের এমন হাল অবস্থা হলে উপজেলা হাসপাতাল কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থকেন্দ্রগুলোর অবস্থা বুঝতে বাকি থাকে না। এমন এক করুণ বাস্তবতা নিয়ে আমাদের চিকিৎসা পরিসেবা জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার মতো একটি কঠিন কাজ কীভাবে বাস্তবায়ন করছে তা আমরা বুঝতে অক্ষম। অনেক সরকারি চাকুরি রয়েছে যেখানে চাকুরীজীবী অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে আসেন শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে। অর্থাৎ অফিসের বাইরে তারা টাকার বিনিময়ে যে কঠোর শ্রম ব্যয় করেন এবং এর ফলে তারা যেটুকু শারীরিক শক্তি হারান তা পুনরুদ্ধারের জন্যই অফিস-সময়টাকে তারা উপযুক্ত মনে করেন। কথাগুলো পরিহাসচ্ছলে হালকাভাবে বলা হলেও বিষয়টি কিন্তু মোটেই হালকা নয়। সরকারি সেবা কাঠামোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে এই নির্মম বাস্তবতা সকলেই প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবেন। আজকাল স্কুল-কলেজে পড়াশোনা হয় না, শিক্ষার্থীদের দৌঁড়াতে হয় প্রাইভেট টিউশনে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, রোগীকে যেতে হয় প্রাইভেট চেম্বার কিংবা ক্লিনিকে। সরকারি অফিসে সেবাগ্রহীতা সাধারণ মানুষ এসে প্রত্যাশিত কাজটি সহজে করাতে পারেন না, গুণতে হয় তাকে উৎকোচের অঢেল টাকা। সুতরাং কর্মক্ষেত্রকে বিশ্রামাগার আর বেতনকে ফাও উপার্জন ভাবার যে বাস্তবতা আমাদের সমাজে তৈরি হয়েছে সেখান থেকে সহজে উদ্ধারের যে পথ নেই তা বুঝাই যাচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালে ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পরও যে কয়জন চিকিৎসক কর্তব্য পালনের জন্য ফিরে আসেননি সেজন্য আমাদের বহু গরীব রোগীর ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকের রোগ জটিল আকার ধারণ করবে। এরা পয়সা দিয়ে চিকিৎসা সেবা কেনার সামর্থ রাখেন না। বিনা পয়সায় পাওয়া ছিটেফোটা স্বাস্থ্য পরামর্শই তাদের সম্বল। কষ্ট করে জোগার করা পয়সা দিয়ে ঔষধ কেনা ও পরীক্ষা-নীরিক্ষায় ব্যয় করতে প্রাণ জেরবার হয় তাদের। এই সাধারণ মানুষের সংখ্যাই বেশি। এদের উপেক্ষা করে রাষ্ট্রযন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। এ জন্যই আমাদের এত হায়-হুতাশ। সরকার অকৃপণভাবে চিকিৎসা খাতে অর্থ খরচ করছেন, প্রচুর চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, বাড়ানো হচ্ছে চিকিৎসা অবকাঠামো সুবিধা। চিকিৎসকদের পোস্টিং দেয়ার ক্ষেত্রে উদারনীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। সরকারের ইচ্ছা চিকিৎসকরা যেন কর্মক্ষেত্রে অবস্থান করে মানুষের ন্যুনতম সেবা প্রদান করেন। কিন্তু জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকায় সরকারি মেডিকেলে পড়ে এবং জনগণেরই করের মাধ্যমে বেতনভাতা গ্রহণ করে যখন কেউ নিজের মূল কর্তব্য ভুলে আত্মকেন্দ্রীকতার গহ্বরে ঢুকে পড়েন তখন কষ্টের শেষ থাকে না। আমরা এই অবস্থার অবসান চাই শুধু। বহু চিকিৎসককে আমরা জানি যারা নিজের ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দিনের ১৮ ঘণ্টাই মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। অনেক সহৃদয় চিকিৎসককে দেখেছি কি সহানুভূতি আর কোমলতা নিয়ে রোগীর যতœ করছেন। এইসব আদর্শবান চিকিৎসকরা ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছেন। আমাদের আফসোস এখানেই। আমরা কামনা করি চিকিৎসাসেবা প্রদানের মানবিক এই গুণটি সকল চিকিৎসকের হৃদয়ে প্রোথিত হোক।
- ৫০ বিচারক বদলি, ৪৭ সাব-রেজিস্ট্রারের পদায়ন
- নতুন কর্মসূচি ১৪ দলের জঙ্গিবাদের নেপথ্যে বিএনপি জামায়াতের প্ররোচণা -নাসিম

