চিকিৎসা সেবা কবে গণমুখী হবে?

এটি ভালো খবর যে, সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সন্তানসম্ভবা নারীদের ৭০% ভাগ ক্ষেত্রেই সিজার করে ফেলার তথ্য এবং এজন্য বিশ্বফোরামে বিব্রত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে অবস্ট্রেটিক্যাল এন্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক এ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো সভায় গেলেই এত সিজার হওয়ার বিষয়ে তাঁকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী সিজারিয়ান রোগী ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই গর্ভবতী মায়েদের সিজারিয়ান করার পরামর্শ দেয় তার পিছনে কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থ সিদ্ধি ছাড়া আর কোনো কিছুর সংযোগ নেই। বহু বেসরকারি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কেবল গর্ভবতী নারীদের টার্গেট করে। সন্তানসম্ভবা মা এইসব ক্লিনিকে ভর্তি হলেই নানাভাবে ভয়ডর দেখিয়ে তাদের সিজারিয়ানে বাধ্য করা হয়। এই ভয়ডর দেখানোর পিছনে ক্লিনিকের সাথে সম্পর্কিত চিকিৎসক ও মালিকরা বেশি ভূমিকা রাখেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হলে সে নিয়ে কোনো কথা উঠত না। কিন্তু তা তো হয় না। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রেই সিজার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে এসব অর্থলিপ্সু ক্লিনিকগুলো। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বহুবিধ সমস্যার সাথে এটি একটি অন্যতম সমস্যা বটে। দেশের জেলা সদর হাসপাতাল থেকে শুরু করে উপজেলা হাসপাতাল এবং মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে সন্তান প্রসব করানোর ব্যবস্থা আছে। সরকারিভাবে এসব হাসপাতালে সন্তান সম্ভবা মায়েদের বিনামূল্যে এই সেবা প্রদান করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ অগ্রহণযোগ্য পরিবেশের কারণে অনেকেই এসব জায়গায় ভর্তি হওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। তাই যাদের কিছু সংগতি আছে এবং যাদের সংগতি নেই তারা ধার-দেনা করে টাকা সংগ্রহ পূর্বক বেসরকারি ক্লিনিকে চলে আসেন এবং অবধারিতভাবে ‘সিজার শিকারী’ দের হাতে পড়ে বহু টাকা খরচান্ত হন। শুধু টাকার খরচই নয়। অহেতুক সিজার করার ফলে প্রসূতি মায়ের নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয় এবং পরবর্তী সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও এসব অপ্রয়োজনীয় সিজার বিরূপ প্রভাব ফেলে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের চিকিৎসক ও জড়িত অন্যদের আন্তরিকতা সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি হাসপাতালে সেবা দানে যেরকম উৎসাহী থাকেন সরকারি হাসপাতালে তাঁদের উল্টো মনোভাব দেখে আমরা অভ্যস্ত। এই জায়গায় পরিবর্তন সাধন করা আশু প্রয়োজন।
বস্তুত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখনও গণমুখী চরিত্র নিয়ে সকলের সামনে উপস্থিত হতে পারেনি। একটু জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী ও তার আত্মীয় স্বজন চিকিৎসা খরচের জোগান দিতে দিতে নিঃস্ব ও ঋণগ্রস্ত হয়ে এই ব্যবস্থার মর্ম উপলব্ধি করেন হাড়ে হাড়ে। আমাদের আশপাশে একটু চোখ বুলালে এমন অসংখ্য উদাহরণ দেখা যাবে। অথচ চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিকে আমাদের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিডনি বিকল হলে রোগীকে ডায়ালাইসিস করতে মাসে এখন প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ করতে হয়। এই পরিমাণ টাকা খরচ করে বছরের পর বছর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কতজন মানুষের পক্ষে সম্ভব? ক্যান্সার, হৃদরোগ প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।
জনসাধারণের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করণার্থে প্রতিটি নাগরিককে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনার কোনো পদক্ষেপ আমরা এখনও দেখি না। শিশু ও বৃদ্ধ বয়সে সকল ধরনের চিকিৎসা সেবাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব করার বাস্তবতাও অনুপস্থিত। এরকম অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ভিন্ন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের আর কিছু করার আছে কি?